রাষ্ট্র আজ বিভক্ত ধর্ষক ও ধর্ষিতায়

29

নারীর নিরাপত্তাকে আমি কোনোদিনই আলাদা করে দেখার পক্ষপাতি নই, কারণ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তার প্রশ্নে নারী এবং পুরুষে কোনো ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুধু নাগরিক শব্দ ব্যবহার যথেষ্ট নয়, নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি একেবারে আলাদা ভাবেই তুলতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাষ্ট্রের পুরুষ নাগরিক দ্বারা নারী নাগরিকের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি এখন এতোটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে, নারী ও পুরুষের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যতো কথাই বলা হোক না কেন, কোনো কথাই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিন্ম, সকল স্তরেই নারী এখন নিরাপত্তাহীন, নারীজন্মই তার জন্য এখন এক চরম বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ নারী নিগ্রহের খবর থাকে, কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা যে দ্বিগুণেরও বেশি সে কথা বলাই বাহুল্য। ব্র্যাক-এর এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন দু’টি মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, সে অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর যতোগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার মধ্যে ২০% সংঘটিত হয় শিশুদের ক্ষেত্রে।

এমন নয় যে, বাংলাদেশে নারী নির্যাতন-বিরোধী কঠোর কোনো আইন নেই। বরং বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে এ কারণে যে, এদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা নিরোধে শক্তিশালী আইন রয়েছে, যে কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত হয়েছে বা হচ্ছে। তাহলে সমস্যাটি আসলে কোথায়? এর উত্তর আমরা কিছুটা পেতে পারি বগুড়ায় ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাটি দিয়ে। ধর্ষণের পর মা ও মেয়েকে বিচার করে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে এবং এই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। আমি কখনোই মনে করি না যে, এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল দায়ী। কারণ ক্ষমতায় যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ক্ষমতাকে ব্যবহার করা রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকগোষ্ঠীর প্রাথমিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এবং সে ক্ষমতা সবার আগে প্রয়োগ করা হয় নারীর বিরুদ্ধেই।

‘স্বাভাবিক ভাবেই বগুড়ার ঘটনায় বর্তমান আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগ নেতার নাম ওঠে এসেছে, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকলে হয়তো শ্রমিক দলের কেউ এই একই কাজ করতো।’

আমরা প্রায়শঃই শুনে থাকি যে, অমুক রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কিংবা অন্য যে কোনো অঙ্গ সংগঠনের নেতার হাতে স্থানীয় কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদে ধর্ষণকারীর রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই বগুড়ার ঘটনায় বর্তমান আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগ নেতার নাম উঠে এসেছে, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকলে হয়তো শ্রমিক দলের কেউ এই একই কাজ করতো। আমাদের হয়তো খুশি হওয়া উচিত যে, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে, এমনকি নির্যাতিতা ও তার মাকে মাথা ন্যাড়া করার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই একটি ঘটনাতেই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে কতো বড় ক্ষতি হলো সে কথা বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোটের আগে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে নারী ভোটারদের রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাহীন করে তুলবে। শ্রমিক লীগ নেতা তুফানের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনও তুফানের গতিতে কমবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টিকে আমি সামগ্রিক ভাবে দেখতে চাই।

আমি দেখতে পাচ্ছি যে, ক্ষমতাধর হোক বা ক্ষমতাহীন হোক, পুরুষ মাত্রেই নিজেকে ক্ষমতাবান মনে করে থাকে এবং সেটা কখন? সেটা একজন নারীর সামনে। যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচালক নারী (যদিও অনেকেই বিতর্ক করতে পারেন যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান ও সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা নারী, একদল নারী মন্ত্রী, এমপি, থাকার পরও কেন এরকমটি হচ্ছে?) সেহেতু এই রাষ্ট্রে আসলে নাগরিক হিসেবে নারী সত্যিকার অর্থেই নিন্মস্তরের নাগরিক, কারণ এই রাষ্ট্রে নারীর আসল শত্রু আসলে পুরুষ। একপক্ষ ধর্ষক, আরেকপক্ষ ধর্ষিতা, একপক্ষ পুরুষ আরেকপক্ষ নারী।

তর্ক করতে চাইলে যে কেউ বলতে পারেন যে, কেন ধর্ষণ কি বিদেশে হয় না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে হয়তো কেউ বলতেই পারেন যে, দেশটিতে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তাহলে আমি কেন শুধু বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি? বাংলাদেশের কথা এ কারণে বলছি যে, আমরা কথায় কথায় উন্নত বিশ্বের ভালো জিনিসগুলি কেন বাংলাদেশে হচ্ছে না তা নিয়ে আলোচনা করি, বিতর্ক করি, যেহেতু ধর্ষণ কোনো ভালো উদাহরণ নয় সেহেতু উন্নত বিশ্বের ধর্ষণের সঙ্গে আমি বাংলাদেশের ধর্ষণকে তুলনা করবো না। আমি বলবো যে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে জঘন্য একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, অন্ততঃ ধর্ষণের কারণেতো বটেই।

এখানে কেবল রাষ্ট্রকে দুষলে চলবে না, বরং রাষ্ট্র তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালাচ্ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড বন্ধে। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর কাণ্ড বন্ধে কেবল রাষ্ট্রকে যথাসাধ্য কঠোর হলে যে চলবে না সেটাও বাংলাদেশই প্রমাণ করছে। হ্যাঁ, আগেই বলেছি যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করেও নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে এবং ঘটছে কিন্তু এখন এই প্রশ্ন প্রতিটি নাগরিকেরই তোলাটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, দেশের পুরুষ নাগরিকের কাছে কেন কোনো নারী নাগরিক নিরাপদ নয়? কেন নারী হিসেবে জন্ম নেয়া চার বছরের শিশুটিও রাষ্ট্রের পুরুষ নাগরিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করবে?

Bisk Club
এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই চার বছরের মেয়ে শিশুটি যদি আপনার হয়, তাহলে আপনি কাকে প্রথমে দায়ী করবেন? ধরে নিচ্ছি, প্রথমেই দায়ী করবেন রাষ্ট্রকে। কারণ রাষ্ট্র আইন তৈরি করে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সে আইনের প্রয়োগও রাষ্ট্রই করে। তারপর দায় রাজনৈতিক দলগুলোর কারণ তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতাকে পরিচালিত করে। তারাই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। অতঃপর? সমাজকে? যে সমাজ একের পর এক ধর্ষণকারীকে জন্ম দিয়ে চলেছে। কিন্তু তারপর? তারপর পরিবারকে? কারণ একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে নারিটির পরিবারই, পরিবারের কোনো না কোনো পুরুষ সদস্যের হাতে নারীটি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তার মানে কী দাঁড়ালো? এটি একটি চেইন বা ধারাবাহিক ব্যাপার, যার কোনো জায়গাতেই নাগরিক হিসেবে নারীটি নিরাপদ নয়।

আজকে না হয় আমরা সরকারের উদ্দেশ্যে জোর গলায় বলতে পারবো, দয়া করে রাজনৈতিক তুফানদের থামান, নাহলে আগামী নির্বাচনে ভরাডুবি হবে। কালকে আরেক সরকারকেও কিন্তু আমাদের একই কথা বলতে হবে, ঘটনা একই থাকবে শুধু ঘটনা ঘটানো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বদলাবে। আমার মতো কলমজীবীকে বার বার এইসব দুর্বিষহ ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে কলাম লিখতে হবে নিন্দা জানিয়ে, নারী সংগঠনগুলি প্রতিবাদী বক্তব্য দেবে, মিটিং হবে, সেমিনার হবে কোনো কোনো ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়তো হবে কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটতেই থাকবে, কোনো ভাবেই এটা বন্ধ করা যাবে না- আসলেই কি তাই? রাষ্ট্রের নাগরিকদের পুরুষ অংশ নারী অংশকে ধর্ষণ করেই যাবে, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধই কাজে আসবে না? আইন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে, হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে কঠোর প্রয়োগের ঘটনাও ঘটবে কিন্তু ধর্ষণ বন্ধ হবে না, তাই কি? নাকি ধর্ষণও সম্পূর্ণভাবে না হোক অন্ততঃ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব? এই প্রশ্নটি আসলে পুরুষের কাছেই, এবং কেবলমাত্র একজন পুরুষই পারেন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে, তার ধর্ষকামী ইচ্ছেটাকে দমন করার মধ্য দিয়ে।

লেখার জন্য বিষয় হিসেবে ধর্ষণ কেনো বার বার আলোচনায় আসবে সে প্রশ্ন এখন আর তুলে লাভ নেই। কারণ এই কলামেই অন্ততঃ একাধিকবার আমাকে এই বিষয়টি নিয়ে লিখতে হচ্ছে। হয়তো অনেকেই মনে করছেন যে, একজন নারী হিসেবেই এই বিষয়টি নিয়ে আমার বেশি দুঃশ্চিন্তা, যে কোনো পাঠকই এই অভিযোগ আনতে পারেন আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু একটু দম নিয়ে ভেবে দেখুনতো, দেশে যে ভাবে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে তাতে আপনার পরিবারের নারী সদস্যটি, সে আপনার মা হোক, স্ত্রী হোক, বোন হোক বা কন্যা হোক, কেউই কি তাতে নিরাপদ বোধ করছেন? দয়াকরে একবার তাদের কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন।

আমি নিশ্চিত যে, কোনো পরিবারেই এই প্র্যাকটিস নেই, কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই বলছি, আপনার পরিবারের স্কুলগামী মেয়েটি কিংবা সবচেয়ে বয়স্কা নারীটিকেও যদি এ প্রশ্ন করেন যে, তিনি এদেশে নিরাপদ বোধ করেন কিনা, তাহলে তিনি এই উত্তরটিই দেবেন যে, চারদেয়াল ঘেরা এই ঘরেও তিনি নিরাপদ বোধ করেন না। কারণ, যে কোনো পুরুষের দ্বারাই তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, এমনকি পরিবারের দায়িত্বশীল পুরুষের কাছেও তিনি নিরাপদ নন, নয় পরিবারের একেবারে কনিষ্ঠ মেয়ে শিশুটিও নিরাপদ- তার মানে হচ্ছে পরিবারের ভেতরেই দু’টি পক্ষ আছে এবং এক পক্ষ (নারী) আরেক পক্ষকে (পুরুষ) কোনো ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। আমার মনে হয় এই বিশ্বাস প্রতিস্থাপনই সবচেয়ে জরুরি বিষয়। সেটা পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বত্রই। তবে পরিবার দিয়েই শুরু হোক, আপনি আপনার পরিবারের নারীদেরকেই অভয় দিয়ে আগামী দিনটি শুরু করুন, দয়া করে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here