পার্কে যেতে ভয় পান নারীরা!

24

সুরাইয়া বেগমের (ছদ্মনাম) বাসা শাহজাদপুর সুবাস্তু টাওয়ারে। এই বছরের শুরুতে তিনি বারিধারা লেকসাইড রাজউক পার্কে হাঁটতে শুরু করেন। হাঁটার তৃতীয় দিনেই এক লোক তাঁর পিছু নিয়ে বাজে ইঙ্গিত ও অশ্লীল মন্তব্য করেন। ভয়ে তখনই তিনি বাসায় ফিরে আসেন। আর পার্কে যাননি।

নাজমা আক্তারের (৫১) বাসা মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে। গত মে মাসে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক তাঁকে হাঁটার পরামর্শ দেন। কিন্তু নিকটস্থ মোহাম্মদপুর টাউন হল শহীদ পার্কটিতে হাঁটতে যেতে তিনি ভয় পান। কয়েক দিন ধানমন্ডি লেকে হেঁটে যাতায়াতের ঝক্কির কারণে এখন তিনি বাসাতেই এ-ঘর ও-ঘর করে হাঁটার কাজ সারেন।

সুরাইয়া বেগম বা নাজমা আক্তার নন রাজধানীর নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পার্ক বা উদ্যানগুলোকে অনিরাপদ মনে করে। এ কারণে প্রয়োজনেও তারা পার্কে যেতে ভয় পায়।

পাশাপাশি হাঁটার দূরত্বে পার্ক না থাকাও নারীদের পার্ক বা উদ্যানে যাওয়ার অনীহার বড় কারণ। রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতার সমস্যাসহ পার্ককে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের স্থান মনে করেন অনেক নারী।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ‘নারী সংবেদনশীল নগর-পরিকল্পনা’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্যগুলো উঠে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, রাজধানীর ৪২ শতাংশ নারী পার্ক বা উদ্যানকে অনিরাপদ ভাবেন। এক-পঞ্চমাংশ নারী পার্কে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা বলেছেন। আর ৭০ শতাংশের বেশি নারী বলছেন, বাসা থেকে হাঁটার দূরত্বে কোনো পার্ক নেই।

২০১৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে ঢাকা শহরের রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, মার্কেট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বয়সী ও পেশার ২০০ জন নারীর মধ্যে গবেষণাটি চালানো হয়।

কয়েকটি পার্ক-উদ্যান ঘুরে এবং নারীদের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, নগরের পার্কগুলোকে তাঁরা নারীবান্ধব মনে করেন না। সেখানে হরহামেশাই উত্ত্যক্ত হতে হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আনাগোনা থাকে। সবচেয়ে বেশি হয় মুঠোফোন ছিনতাই। নিরাপত্তাজনিত ভয়ে নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও পার্কে যেতে দিতে চান না তাঁরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সোমা ইসলাম (ছদ্মনাম) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মধ্যে দিয়ে শর্টকাটে বাসায় ফিরতেন। বেশ কয়েক দিন উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে তিনি আর ওই পথ মাড়াননি। এমনকি এখন তাঁর ছেলেমেয়েকেও পার্কে নিয়ে যান না। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের খেলার জন্য পার্ক উপযুক্ত জায়গা। কিন্তু পরিবেশগত কারণে যাওয়া সম্ভব হয় না।’

গত ৩০ জুলাই দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রমনা পার্কে অবস্থানকালে উল্লেখসংখ্যক পুরুষকে হাঁটতে দেখা যায়। কথা বলে জানা যায়, তাঁদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী। তবে পুরুষের তুলনায় খুব কমসংখ্যক নারীকে চোখে পড়ে।

এখানে হাঁটতে আসা অধিকাংশ নারীই স্বামীর সঙ্গে এসেছেন। এমন এক দম্পতি আরশাদ হোসেন ও রাজিয়া সুলতানা। আরশাদ বলেন, ‘খুব দরকার না হলে মেয়েদের পার্কে না আসাই ভালো। পার্কে খারাপ লোকদের আনাগোনা থাকে। আবার আজেবাজে কথা শুনতে হয়।’

কয়েকজন নারী আবার দল বেঁধে এসেছেন। তাঁরা হলেন হাসনা বেগম, রত্না আক্তার, রওশন আরা। সন্তানদের কোচিংয়ে দিয়ে তাঁরা হাঁটার কাজটি সারেন। তাঁরা জানান, নারীরা ঘুরতে বা সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে পার্কে আসেন না বলেই চলে। তবে সকালে হাঁটতে বেশ কিছু নারী আসেন রমনায়।

পার্কটিতে নারীদের ব্যায়াম করার আলাদা ব্যবস্থা আছে জানিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার মো. সালাম বলেন, ভোরে অনেক নারী নিয়মিত হাঁটতে এবং ব্যায়াম করতে আসেন। তাঁরা সবাই উচ্চবিত্তের।

এখানে অল্পবয়সী কয়েকজন তরুণীকে বসে গল্প করতে বা ঘুরতে দেখা যায়। তাঁদের একজন নিনা আক্তার (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে আসেন। পার্ক নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সন্তোষজনক নয়। একবার তাঁর মুঠোফোন ছিনতাই হয়েছিল।

আবার পান্থপথে পান্থকুঞ্জ, ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যানে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ময়লা-আবর্জনা। অনেকে বসে সিগারেট টানছেন। গাঁজা সেবন এবং বিক্রি করতেও দেখা যায়। উল্লেখসংখ্যক ছিন্নমূল, টোকাই ও অপ্রকৃতিস্থ মানুষও চোখে পড়ে।

পার্ক বা উদ্যানে নিরাপত্তার অভাব এবং পরিবেশগত সমস্যার বিষয়ে অবগত আছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজধানীর বেশ কিছু পার্ক রাজউক বা গৃহায়ণ এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে; সেগুলোর কয়েকটি সিটি করপোরেশন নিয়েছে, কিছু হস্তান্তর-প্রক্রিয়া চলছে।

নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পার্কের উন্নয়ন করা হবে জানিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, পার্ককে নারীবান্ধব করতে সীমাবদ্ধতা আছে। সচেতনতাও জরুরি। সে রকম চাহিদা থাকলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here