আমার দায়িত্বটা যেন কি?

53

এ বছর বইমেলার এক সন্ধ্যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্মারক মঞ্চের কাছে শ্রদ্ধাভাজন দুই লেখক বন্ধুর সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা করছি। কেউ একজন পানি খেয়ে ৫০০ মিলির মামের বোতল ছুঁড়ে ফেলে গেল। সবাই আসতে যেতে বোতলটায় হোঁচট খাচ্ছে, খেয়ে পড়ে যেতে যেতে সামলাচ্ছে ; কিন্তু কেউ বোতলটা সরাচ্ছেনা। আলোচনা থেকে আমার মনোযোগ ছুটে গেল। বোতলটাকে মাড়িয়ে দু`একজন রাগও ঝাড়ছিল।

নিজের বিরক্তির সহজতর উপশমে নিজেই এগিয়ে বোতলটা তুলে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখলাম। খারাপ লাগছিল, জাপানে যেমন হাতে রাখা কোন ব্যাগে বোতল ফেলার বিন পাওয়া অবধি রেখে দেই, তেমন করা গেল না। আলোচনার জায়গায় ফিরে আসতে গিয়ে দেখলাম উপস্থিত অনেকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। আলাপ সেড়ে বাড়ি ফেরার সময় হিসাব মেলালাম, এই আমি কি আজ জাপানের জীবনের অভ্যস্ত না হলে এই ঘটনায় আদৌ বিরক্ত বা এতটুকু ভাবিত হতাম ?

বসবাসের অযোগ্য নগর হিসেবে ঢাকাকে নিয়ে খুব থটফুল একটা আলোচনা বা সংলাপ দেখেছিলাম। একজন আলোচিত নগর পরিকল্পক বলছিলেন, যে,এই যত্রতত্র ময়লা ফেলে নিজের আবাসকে নিজেই বাসের অযোগ্য করা বাঙালিই কিন্তু জাপানে গেলে ময়লা পকেটে নিয়ে হাঁটে। পয়েন্ট এক: কেন ? দুই : কেন না? দুটোরই উত্তর: শিক্ষা , গ্রুমিং , কালচার। বাইরের অনেকেই জানেন , জাপানিরা পকেটে ময়লা নিয়ে হাঁটে। এটা কজন জানেন ময়লা নিয়ে হেঁটে বিন পেলেই ফেলা যাবেনা, উপযুক্ত জিনিসের উপযুক্ত বিনেই ফেলতে হবে? অদাহ্য বস্তু এক বিনে, দাহ্য ও কিচেন ময়লা অন্য বিনে, পেট বোতল ,ক্যান আরেকটায়। শুধু পেট বোতলেই সীমাবদ্ধ না, পেট বোতলের ক্যাপ, গায়ের প্লাস্টিক লেবেল যাবে দাহ্য বস্তুর বিনে, পেট বোতল অন্য বিনে।

ঘরেও ময়লা এভাবে লাল, নীল , হলুদ রঙের ভিন্ন ভিন্ন ৩০/৪৫ লিটারের বিন ব্যাগে রেখে পাড়ার বা কলোনির মূল ডাস্টবিনে উপযুক্ত দিনে এবং সময়ে ফেলে আসতে হবে। লোহার খাঁচা মত সেইসব বিন নির্দিষ্ট সময়েই তালা খোলা হবে। তবে খোলা সামান্য বাউন্ডারির ডাস্টবিনও আছে, কিন্তু এদের নিয়মে ভুল হয় না। উদাহরণ দেই ব্যত্যয় হলে কি হবে।

এক থাই পরিবার কিউশ্যু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কলোনিতে নবাগত। শুধু জানেন ময়লা ওমুক দিন ফেলে আসতে হয়। গিন্নি দুপুর নাগাদ ময়লা নিয়ে গেলেন। পথে আরেক বিদেশি তাকে বোঝালেন যে এখন না, সন্ধ্যার পর ফেলতে পারবে। বেচারী থাই ভাষা ছাড়া কোন ভাষাই বোঝেনা। তাই অন্য বিদেশি চলে যেতেই ময়লার প্যাকেট সে বিনে ফেলেই গেল। অতঃপর নিয়মমাফিক মুখ বাঁধা ৪৫ লিটারের সেই প্লাস্টিক প্যাকই পাড়ার ভ্যাগাবন্ড হুলোবেড়াল আর দাঁড়কাক ফুটো করে খাবারের সন্ধানে ময়লা ছানামাখা করলো।

কলোনির এডমিন দেখলেন , ছবি তুলে পোস্টার বানালেন, প্রতি বিল্ডিং সিড়িঘরে নোটিশ বোর্ডে সেঁটে দিলেন। প্রতি বিল্ডিংএ সাঁটার কারণ আমাদের সেই কলোনিতে অনেক বড় অংশই বিদেশি ছিলেন। জাপানিরা জানেন, একজন জাপানি মানসিক ভারসাম্য হারালেও অভ্যাসের বসেই এই কাজ করবেনা। তবু একচোটে সবার জন্য সতর্কতা। বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল আমার সামান্য রুমাল। অশীতিপর বুড়ি কতদূর হেঁটে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ পথে কোন খড়কুটোও পড়ে নেই, রুমাল অতি সহজেই দৃশ্যমান। তাই ময়লা সরাও, সম্ভাব্য মালিককে বুঝিয়ে দাও।

এখন এই শিক্ষা বা গ্রুমিং শুরু হয় শিশুর বাড়িতে, কিন্ডারগার্টেনে। আমাদের মধ্যে যেসব বাঙালি পরিবারে কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া শিশু আছে তাদের প্রথম সপ্তাহেই বাচ্চার কাছে লজ্জা পাবার অবস্থা দাঁড়ায়। প্রথম প্রথম সকাল বেলা যেই বাচ্চা গলা সাতমাত্রায় চড়িয়ে কাঁদতে থাকে, কিচ্ছু মুখে দেয় না, সেই বাচ্চা বাসায় ফিরে নিজেরসহ সবার জুতা দরজায় রাখা জুতার সেল্ফে ঠিকমতো সোজা করে রেখে ঘরের স্যান্ডেল পরে ঘরে ঢুকে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে জামা পাল্টে ঘরের জামা পরে নিজে হাতে শেষ করা খালি লাঞ্চবক্স ব্যাগ থেকে বের করে রেখে ময়লা কিছু পাওয়া মাত্রই দৌড়ে নিজে বিনে ফেলে দেয়। খেলার ছলে এই শেখা প্রাইমারি স্কুলেরও অনেকটাই পার করে।

আগে শেখো আদব কেতা , আচার ব্যবহার। কাঁচা বাঁশ নোয়ানো হলে তাতে সুন্দর জিনিস গড়া যাবে। এই নিয়ম শিশুবেলা থেকে রোজ রপ্ত করা জাপানিরা তাই বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে গিয়ে হেরেও মাঠ থেকে ফেরার সময় দর্শকদের ছুঁড়ে দেয়া ক্যান, বোতল, কাগজ কুড়িয়ে ফকফকা করেই মাঠ ত্যাগ করে। এদের পক্ষে ময়লা কিছু পরে আছে দেখে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভবই না। আমার এক বান্ধবীর জাপানিজ মা এই বয়সেও মেয়ে অফিসের লাঞ্চ বক্সের ব্যাগে এতটুকু দাগ লাগালে ভ্রু কুচকে বকতে থাকেন কেন সবসময় বক্স সোজা করে ধরে রাখতে পারেনি!

আসি আমাদের কথায়। সাম্প্রতিক তুমুল আলোচিত ভেনিসরূপী রাজধানী ঢাকা। বৃষ্টিবন্দী ট্রলে সামাজিক মাধ্যমে হাসির বন্যা । গরমে জান ওষ্ঠাগত, তবুও বৃষ্টি দেখলেই কলিজায় কামড়! এই গেল সাধের গাড়ি ডুবে, এই লেগে গেল ২ ঘণ্টার এক্সট্রা জ্যাম। পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কলাপ্স করেছে। মিডিয়া এক দিকে আশীর্বাদ অন্যদিকে অভিশাপ। মনে পড়লো ২০০৬ সনেও অফিসের ভীষণ জরুরি কর্পোরেট মিটিং ধরতে গিয়ে বৃষ্টির জলবন্দি ক্রিসেন্ট লেকের মুখ গাড়ি ডুবে বিকল ইঞ্জিন। সিটের ওপর পা তুলে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে সিএনজি ধরেছিলাম। গাড়ি পথশিশুদের দিয়ে ঠেলে ড্রাইভার গ্যারেজে নিয়েছিল। এবং সেই পানি ম্যালা সময় লেগেছিল নামতে যা এখন লাগেনা। ভুক্তভূগীদেরই জবান, ঘ্ণ্টাখানেকেই পানি নেমে যায়।

প্রতিবেদনে পড়লাম, বন্ধ ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখে ১০ ফুটের নালায় ৭ ফুট ময়লায় বন্ধ, যার ভেতরে সোফাও আছে! “ ময়লা যেখানে সেখানে তো ফেলিনা ! রাস্তায় ফেলছি, পানিতে ফেলছি ”!! ময়লার জায়গা যদি রাস্তা আর পানি হয়- তাহলে তো ডাস্টবিনের ভাসা ময়লাতেই গাড়ি চালাতে হবে, ময়লায় পানিবন্দি হয়ে নৌকা চালাতে হবে। ” এ তো নগর পিতাদের কাজ!!” ভাই, আপনার অফিস আওয়ার আছে, মিউনিসিপাল্টির কর্মীদের নাই? আপনি সারাদিন সিগারেটের বাট, চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা ফেলবেন আর ১৭ কোটি জনতার পাশে পাশে একেকজন করে পরিচ্ছন্নতা কর্মী সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? নাগরিক দায়িত্বের সর্বোচ্চ নিদর্শন দেখবো কোরবানী ঈদেই, কারণ গেলবারও খুব কমই বেঁধে দেওয়া নিয়মে ছিলেন।

বিশ্বের ৩য় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপানে এই ময়লার একেকটা ৩০/৪৫ লিটার প্যাকের দাম ৩০ টাকা । এই প্যাকেটগুলির দাম যারা এই ময়লা অব্যবহার্য হলে পুড়িয়ে ফেলে, রিসাইকেল উপযোগী হলে পরিষ্কার করে রিসাইলে দেয় সেই সংস্থার কাছে যায়, কাজ বাবদ। দোকানে জিনিস কিনলে ব্যাগ বাড়ি থেকে না নিয়ে গেলে ২ ইয়েন এক্সট্রা যেই চার্জ করে সেটা হয়তো কিছুইনা , কিন্তু সেই ২ ইয়েনের প্লাস্টিক প্যাকে ঘর উজাড়ের ভয়েই ক্যাপসুল সাইজের বাসা-বাড়ির বাসিন্দারা ব্যাগ নিয়েই যায়। মজার বিষয় হলো, এরা এভাবেই নিজেদের অবস্থানে থেকে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করে। অফিসে ঘাড় গুজে কাজ করে, কোন পার্সোনাল কল চলবেনা । অথচ যদি জিজ্ঞেস করি, সরকার কেমন দেশ চালাচ্ছে, খুব অবাক হয়ে বলে, “ সেটা ভাবা আমার দায়িত্ব না। ওটা সরকারের কাজ।” আর আমাদের সব দেশপ্রেম সরকারকে গালি দিয়েই শুরু, গালিতেই শেষ। হাজার হোক, ‘বাঙালি’ তো!
লেখক : কলামিস্ট; প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়; বিভাগীয় প্রধান, বিজনেস প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট, স্মার্ট সার্ভিস টেকনোলজিস কো. লিমিটেড, ফুকুওকা, জাপান।

[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here