বিদেশে আমি কেন এলাম, আপনি কেন আসবেন

27

পঞ্চম শ্রেণীর পরে আর তার খবর নেই। এর মাঝে অন্য স্কুলে হাইস্কুল পর্যন্ত গেছে। কিন্তু এতে পড়ে কি হবে! স্কুল শেষ করার আগেই সে গাড়ি চড়া শুরু করেছে। আর আমাদের তখন গাড়ির ছবি দেখেই দিন কাটে। পড়ালেখা করে আরো বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলেও আমাদের সেই ‘গাড়ি চড়া’ হয়নি। বলছিলাম বন্ধু সুমনের কথা।লেখাপড়া না করে বা কম করেও যে গাড়ি চড়া যায় আর বাড়ি হয়, বিয়ে-সন্তান হয়ে ভালো ‘ধনী’ হওয়া যায় সে তার জলন্ত প্রমাণ। কলেজে পড়ার সময়ই শুনেছি ব্যবসা বড় হয়েছে।এরপর মাঝে একবার দেখেছিলাম বন্ধুর চেহারা। অতিশয় ব্যস্ত এক ব্যবসায়ী। বন্ধুর এখন অনেক টাকাও আছে বটে।অবস্থা হলো- আমার ‘সফল’ বন্ধুর মতো আমার টাকা নেই।

এ রকম বন্ধু আমার আরো অনেক আছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা এখন অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং তারা একদিকে ‘টাকাওয়ালা’ অথবা ‘ক্ষমতাবান’। দিন রাত বই মুখস্থ করে অনেকে বিসিএস পাশ দিয়ে বড় কর্মকর্তাও হয়েছে।এতসব না পড়েও অবশ্য অনেকে বড় কর্মকর্তা হয়েছে। আমি বাবার দেয়া বিসিএস ফরম কেনার টাকায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি। নিজে কখনোই ‘ভালো’ ছাত্র ছিলাম না। রেজাল্ট সন্তোষজনক হলেও, তা অনেক বন্ধুর চেয়ে নিচেই ছিলো। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করার পর ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের বলে শিক্ষকদের কাছে অপাত্র হয়ে থাকা আমার অনেক বন্ধুই সবার আগে ভালো চাকরিতে ঢুকেছে।
বন্ধুদের অনেকে আজ বড় ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী/নেতা, ব্যাংকার, সরকারি, বেসরকারি সংস্থার বড় কর্মকর্তা, শিক্ষকও হয়েছে অনেকে। খবরের কাগজে বেশ কিছু বছর কাজ করেও, কিছু করি এটা কারো কাছে বিশ্বাসযোগ্য করাতে পারিনি। ছেলে পত্রিকায় কাজ করে বলার পর সম্পূরক প্রশ্ন শুনতেই হয়েছে। ও আচ্ছা, তা চাকরি বাকরি কিছু করার চেষ্টা করে নাকি! মানুষের কাছে কি করি তা বলাই যেন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সাংবাদিকের চাকরি ‘স্বেচ্ছাসেবী’ চাকরি নয়, এটা বুঝানো ছিল আরো মুশকিল।

এ অবস্থায় দেশ ছেড়ে বিদেশে আবার পড়তে এসে চাকরির ভবিষ্যতই বা কি হবে, তা নিয়ে আমার বাবাও চিন্তিত ছিলেন। ছেলের বিদেশ যাত্রায় তার অনীহা ছিল বরাবরই। আমিও চিন্তা করছিলাম, বিদেশ এসে হবে কি! এত এত বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তা বন্ধুর সাথে নিজের পরিচয় দেয়ার কি থাকলো। দেশে অবশ্য সাংবাদিকদের অনেক ক্ষমতা- বাস্তবে তা যেমনই হোক অধিকাংশ মানুষ তাই মনে করে। আবার ব্যাংকে গেলে সাংবাদিকের জণ্য ঋণ নাই, বিয়ের জন্য কনে খুঁজে পাওয়া মুশকিল, বাড়ির লোকজন মনে করে চাকরিতে কবে ঢুকবে, আত্মীয় স্বজন বলাবলি করে- ‘এখনো একটা চাকরি নাই, কবে কি করবে।’

দেশ ছেড়ে বিদেশে আসার আগে এতকিছু না ভাবলেও, প্রতিনিয়ত এসব প্রশ্ন সাথেই লেগে ছিলো। আসার আগে ভেবে দেখলাম- দেশের বাইরে সরকারি চাকরি করাও তো যায়। এটা অনেক কঠিন আর শুনতে কেমন শুনালেও, নিজে যেমন করে ৫ বছর দেখেছিলাম চোখের সামনে এখন আমি সে অবস্থানেই আছি। হাস্যকর হলেও সত্য হলো, এখন থেকে আগামী সামনের ৫ বছর কি হবে তার কোনে ধারণা নাই। হতে পারে দেশ থেকে সে সময় পড়ার জন্য, চাকরি ছেড়ে, নতুন একটা জায়গায় তাও আবার বিদেশ-ইউরোপ বলে কথা। ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষ, চাল চলন সবই অন্যরকম। কে চায় এতকিছু নতুন করে আবার জানা, বুঝা, শেখার পর নিজের ভবিষ্যত নিয়া চিন্তার কথা।

ঘুরাঘুরির নেশাও আমার বিদেশে আসার একটা বড় কারণ। একই সাথে যদি নানা দেশ ঘুরা যায় আর সাথে অন্য কিছু থাকে সেটা তো ভালোই! আমার অনেক বন্ধুর মতো আমি বড় ব্যবসায়ী, বড় ব্যাংক কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি বড় কর্মকর্তা হতে পারিনি বটে। তবে আমি একজন সরকারি চাকরিজীবি। বাংলাদেশ না হয়ে জায়গাটাই শুধু ভিন্ন। ফিনল্যান্ডের প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা এতুটুকুই সম্বল। এটুকুর জন্য নিজেকে সফল মনে করার মতো কিছু হয়নি, এটা আমি জানি। তবে, নিজের জন্য এটা একু সান্ত্বনার বলা তো যায়ই।

দেশের বাইরে এসে নতুন ভাষা, সংস্কৃতির নানা বাধা পেরিয়ে, নিজের আয় নিজে করেবা না করে মাস্টার্স শেষ করার পর এটা ‘একটা কিছু’ সে অন্তত বলা যায়। অবশ্য অনেক শুভাকাঙ্খীরা বলেন, ‘কি করলাম এত দিন বিদেশ থেকে। কত টাকা আয় করলাম?’ উত্তর হচ্ছে- ‘কিছুই করতে পারিনি, অনেকের মতো টাকাওয়ালা হতে পারিনি। হতে পারবো কি না তাও জানি না।’ এসব কথা শুনে আমি ক্লান্ত হই না। তবে, তারা কোন বিষয়টাকে ‘কিছু করা’ মনে করে আমি শুধু সেটাই ভাবি।

আমার অনেক বন্ধু, পরিচিতজন প্রায়ই বিদেশ আসার কথা বলেন। আমি তাদের বলি, তারা আসলে কেন আসতে চান বা তাদের চিন্তা কি। ফিনল্যান্ড আসার পরও অনেকের সাথেই কথা বলার সময় পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রেও আমি একই প্রশ্ন করতাম। আমি দেখেছি অনেকের কোনে পরিষ্কার গন্তব্য নেই। বেশিরভাগের ইচ্ছা বা চাওয়া হলো- চাকরি করা, টাকা পয়সা ইনকাম করা। এটা অবশ্য দরকারিও বটে। তবে কে কোন পথ অবলম্বন করে সেটা করবে সেটাই প্রশ্ন। ফিনল্যান্ডে আমার অনেক পরিচিত বন্ধুই বেশ ভালো টাকা আয় করেন। তাদের ব্যাংকে টাকা আছে আবার দেশে নতুন বাড়িঘরও হয়েছে। কিন্তু নিজের অবস্থা বলার মতো তেমন কিছুই হয়নি। তার মানে এই না যে, আমি সরকারি এক চাকরি করি মানে খুব বড় কিছু হয়ে গেছি। কথা হলো- এখানকার সামাজিক, পারিপার্শ্বিক অবস্থায় আমাদের নিজেদের অবস্থান কি! টাকা পয়সা আমার প্রাইমারী স্কুলের বন্ধু সুমনেরও আছে। আর এমন যদি পড়ালেখা করে বিদেশে এসেও একই থাকে তাহলে আর পার্থক্য কোথায়!

অনেকে অনুপ্রেরণা খুঁজেন। আমার অনেক বন্ধু, যারা বিদেশ এসে কিছু করতে চায় তাদেরকে নিজের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে শুধু এটুকু বলতে চাই- লক্ষ্য একটু পরিষ্কার থাকা জরুরি। নিজে যদি বড় করে স্বপ্ন না দেখা যায়, তাহলে পথ আগে থেকেই ছোট হয়ে যায়। স্বপ্নটা বড় হলে ছুটতে ছুটতে বড় কোনে গন্তব্যে নিশ্চয়ই যাওয়া যায়।এখন প্রশ্ন হতে পারে ছোটার দরকারটাই বা কি! আসলেই। আপনার যদি রাস্তায় হকারের মতো ঘুরে ঘুরেই লাখ টাকা আয় করা যায় আর কি লাগে। পিজা, রেস্টুরেন্টে দিন রাত কাজ করে অনেক টাকা আয় করে বাড়ি ঘর করা গেলে আর কি দরকার! আমিও তাই বলি। ব্যক্তিগত পছন্দ বা ভালোলাগা অবশ্যই যার যার নিজের বিষয়। কিন্তু যখন আপনি নিজে সামাজিক অবস্থান নিয়ে ভাববেন, কেন আপনাকে অন্যদের তুলনায় সমানভাবে দেখা হবে না, কেন আপনি বিদেশে স্থানীয় লোকদের কাছে ‘অপাত্র’ বা দৃশ্য বা অদৃশ্য ‘অচ্ছুত’ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন। সহজে কিছু পেতেও চাইবেন আবার সে জন্য কিছু করার জন্য মন চাইবে না- এমন যে কেউ হোক তার জন্য কি কেউ করুণার পাত্র নিয়ে বসেই থাকতে হবে।

বাংলাদেশে যদি অন্য কোনে দেশের লোক গিয়ে এমন একই অবস্থায় থাকতে চাইতো, টাকা আয় করে দেশে পাঠাতো, হোটেল-রেস্তোরায় কাজ করতো, ঠেলাগাড়ি ঠেলতো বা পরিষ্কারের কাজ করে জীবন চালাতো, আপনি তাকে কিভাবে বিবেচনা করতেন! তাকে কি সালাম দিতেন বা বলতেন, কেমন আছেন। নাকি বলতেন, দেশে মানুষের কাজ নাই, ওরা কাজ পায় কেমনে! তারা এত টাকা কিভাবে পায়। এদের ভালোভাবে থাকার দরকার কি!- আমাদের যে চিন্তাভাবনা এগুলা আমরা করতাম, অন্য দেশের লোকজনের সাথে তা আমরা করিও।পত্র পত্রিকায় নানা সময় বাংলাদেশে অবস্থানরত আফ্রিকা বা অন্য দেশের লোকদের সাথে আচরণের খবর পড়ে এগুলোর বাস্তবতা দেখা যায়।

এখন ইউরোপের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের নিজেদের মতো খারাপ না হলেও, অন্য দেশের সামাজিক, পারিপার্শ্বিক অবস্থায় চিন্তাগুলো একইরকম। এজন্য দরকার যা তা হলো যোগ্যতা অনুযায়ী নিজের অবস্থান তুলে ধরতে নিজেই কাজ করা। আমার চেয়ে অনেক ভালো, বড় অভিজ্ঞতা আরো অনেকেরই আছে। তাদের তুলনায় আমার এই অবস্থা খুবই নগন্য। অপ্রকাশিত নগন্য এসব ছোট গল্প অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যই লিখে রাখলাম। ভাবি দেখতে দেখতে কত দিন চলে গেছে, যাচ্ছে। এখন যা মনে হচ্ছে- তুচ্ছ বা অনেক বড় কিছু কিছুদিন পরেই হয়তো তা অনেক বড় বা ক্ষুদ্র বলে দেখা দেবে। তাতে কি! জীবন তো এই! আত্মকথা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here