মাস যায় দিন কাটে না

62

কিরিট চাকমা (ছদ্মনাম) ধসের রাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে যখন মনোঘর স্কুলের ভাবনাকেন্দ্রে আশ্রয় নেন, তখন ভেবেছিলেন দু-এক রাত পরই ফিরে যাবেন নিজেদের ডেরায়। সেই দুই রাত দুই মাসেও শেষ হলো না। প্রশাসনও ভেবেছিল বড়জোর দুই সপ্তাহ, তাদের দুই সপ্তাহ আর শেষ হচ্ছে না।

১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র ছেঁটেছুটে ছয়টা করা হয়েছে। অনেকে ঠেসেঠুসে থাকতে না পেরে সরে গেছেন চেনা-অচেনা মানুষের আশ্রয়ে। কিন্তু থিতু হতে পারেননি কেউই। জীবিকা আর মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের মধ্যে বিরোধ থাকলে জীবন চলবে কীভাবে। যেখানে জীবিকার সম্ভাবনা আছে, বিকাশের সুযোগ আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই সেখানেই হতে হবে।

প্রশাসন জায়গা খোঁজার কমিটি করেছে। ফায়ার সার্ভিসের লোক, ভূমি অফিসের লোক, পেশাজীবীদের নিয়ে। জবরদস্ত সে কমিটি পাতিপাতি করে ‘উপযুক্ত’ জায়গা-জমি খুঁজছে। তালিকা বানাচ্ছে। তালিকা আরও হচ্ছে, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দল করে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘প্রকৃত’ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আদি অকৃত্রিম খাঁটি তালিকা তৈরি করার জন্য। তারা সরেজমিনে খোঁজ করে একটি খসড়া তালিকা জমা দিয়েছে প্রশাসনের কাছে। জমি বরাদ্দেরও একটা কমিটি করা হয়েছে। নানাজন আছে সে কমিটিতে। একদিন হয়তো সে কমিটির কাজও শেষ হবে। প্রশাসনও তার কাজ শেষ করবে। মন চলে যাবে অন্য কাজে। পুরোনো নথি আর রেফারেন্সে ঠাঁই পাবে উদ্ধার করা মৃতদেহের সংখ্যা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা ক্রমেই ধূসর থেকে ধূসর হবে। কিন্তু বেয়াড়া বৃষ্টি তো থামে না। এ লেখা যখন লিখছি (১১ আগস্ট বিকেল), তখন রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ নেই। অঝোর ধারায় শেষ শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ আবার বন্ধ হয়েছে। ঘাঘড় কলাবাগান এলাকায় রাস্তার ওপর আবার পাহাড়ের একাংশ এসে পড়েছে। কে জানে কোন সর্বনাশ কোথায় অপেক্ষা করে আছে।

বৃষ্টিতে দফারফা হয়ে যাওয়া পাহাড়কে আবার ধোপদুরস্ত করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর সুপারিশ পেশ করেছে। তাদের দফাওয়ারি সুপারিশ সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিটি এখন এই দফাগুলো উল্টেপাল্টে দেখবে। তারপর কী হবে? নির্বাচনের ডামাডোলে কোনো রকম রফা ছাড়াই দফাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে না তো? পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটি পরিবেশ অধিদপ্তরকে দফাগুলো সংশ্লিষ্ট নানা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। পরিষ্কার নীতিমালা ও পরিপত্র ছাড়া এসব দফা নিয়ে কারও কোনো পেরেশানি হবে না। টেবিলে টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এগুলো বিবর্ণ কাগজে পরিণত হবে।

সংসদীয় কমিটি পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও একটা নির্দেশ দিয়েছে (এটা কি নির্দেশ না পরামর্শ)। বলেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি পাহাড় রক্ষা সমন্বয় পরিষদ গঠন করে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পাহাড় রক্ষার পদক্ষেপগুলো (১২ দফা) বাস্তবায়ন করতে হবে।

সংসদীয় কমিটি নিশ্চয়ই জানে, বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার কাঠামো আর পার্বত্য জেলা পরিষদের কাঠামো এক কিসিমের নয়। পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান বা চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের। পাহাড়ের লুটিয়ে পড়া বন্ধ করতে হলে স্থানীয় সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যেটা করতে হবে—সঙ্গে নিয়ে না বলে বলা উচিত, স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বেই পাহাড় ও পাহাড়ি এবং পাহাড়ে বসবাসকারী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা পর্যায়ে গঠিত তিন পর্যায়ের কোনোটিতেই আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারের নেতৃত্ব নেই। যে দেশের সংবিধান প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, সেখানে আগাপাছতলা আমলানির্ভর কমিটি গঠন আমাদের চিন্তাচেতনার ক্রমবর্ধমান ধসকে আরও বেশি করে চিনিয়ে দেয়। চিন্তা আর বিবেকের ধস না ঠেকিয়ে পাহাড়ের ধস বা পতন ঠেকানো যাবে না। যে পার্বত্য জেলাগুলোতে সমতলের মতো খাসজমির কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে কার জমি কে খুঁজে দেবে?

পরিবেশ অধিদপ্তরের ১২ দফা নিয়ে পাহাড়ে সব হিস্যার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা হওয়া উচিত। পাহাড়ে বনায়ন আগেও হয়েছে, ১২ দফায় কি সেই একই আকাশমনি, রাবার আর পাখি না-বসা গাছের বন তৈরি করা হবে—টেকসই কৃষিটাই বা কী? দূর পাহাড়ে সমতলের আমবাগিচা তৈরি? পানি সংরক্ষণ মানে কি হালদার রাবার ড্যাম না থানচি নদীর পানি আটকে নৌচলাচলের বারোটা বাজানো, নাকি স্রেফ বৃষ্টির পানি ধরে রাখা? ১২ দফায় জঙ্গল পোড়ানো বন্ধের কথাও বলা হয়েছে। এটা কি জুমচাষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত? খাড়াভাবে পাহাড় না কাটলেই কি পাহাড় কাটা জায়েজ—এসব প্রশ্ন বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ের লুটিয়ে পড়া বন্ধ করতে হলে আমাদের দাম্ভিকতাকে লুটিয়ে দিতে হবে।

গওহার নঈম ওয়ারা,দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকর্মী এবং শিক্ষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here