ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮, ৫ ভাদ্র ১৪২৫


২৬তম বানিজ্য মেলা পূর্বাচল প্রকল্পে-অভিজিৎ চৌধুরী

২০১৮ জানুয়ারি ২৯ ০১:৪৫:৩৯

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার জন্য রাজউকের ‘পূর্বাচল প্রকল্প’ এলাকায় ২০ একর জায়গা জুড়ে স্থায়ী স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। সেই পূর্বাচল প্রকল্পে আগামী ২০২১ সালে ২৬তম বানিজ্য মেলা আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো অব বাংলাদেশ’র (ইপিবি)। এমনটাই জানালেন ইপিবির মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব অভিজিৎ চৌধুরী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতিতে ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ নামে প্যাভিলিয়ন করা হয়েছে বলে তিনি জানান। সম্প্রতি ইপিবির অতিরিক্ত সচিব অভিজিৎ চৌধুরী বিজনেস আওয়ার ২৪.কম’র সঙ্গে এক আলাপচারিতায় এসব বিষয় তুলে ধরেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে মেলার সচিবালয় কার্যালয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান।

এবারের মেলা প্রসঙ্গে অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, ইরান, জাপান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, তুরস্ক, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালোশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর মরিশাস তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেলায় নিজেদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন করছে। দেশি ও বিদেশি পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন, রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বানিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারীরা একদিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, ডিজাইন, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারেন। অন্যদিকে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ লাভ করে।

মেলার ডিজাইন প্রসঙ্গে অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, এবারের ২৩তম বানিজ্য মেলার আয়োজন অন্য বছরের তুলনায় ভিন্ন আমেজের করা হয়েছে। প্রতিবারের মত এবার কার্জন হলের ডিজাইনের আদলে মেলা প্রধান গেইট সাজানো হয়নি। এবার এটি পরিবর্তন করে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মানাধীন বৃহৎতম পদ্মা সেতুর ডিজাইনের আদলে তৈরি করা হয়েছে বানিজ্য মেলার প্রধান গেইট। একইসঙ্গে এ গেইটের দুই পার্শ্বে বসানো আমাদের সংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যে ঢাকা গেইট। যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা একাডেমিতে রয়েছে। পদ্মা সেতু ও ঢাকা গেইট এ দুই ডিজাইনের আদলে ছোঁয়ায় এবারের মেলার প্রধান গেইট সজ্জিত হয়েছে। এবারের মেলার দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য রাস্তাগুলো প্রশস্ত করা হয়েছে। প্রশস্ত করার কারণে এবারে স্টল সংখ্যা কিছুটা কম। মেলা প্রতি প্যাভিলিয়ন আনা হয়েছে রুচিসম্মত আধুনিক ডিজাইন। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য মেলার বিভিন্ন জায়গায় বসার স্থান করা হয়েছে। রয়েছে পযাপ্ত পরিমান টয়লেট ব্যবস্থা। রাখা হয়েছে শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য ২টি শিশু পার্ক। প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে মেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে সুসজ্জিত প্রায় ১২টি বাগান। এর মধ্যে রয়েছে মন ছুয়ে যাওয়ার মত অর্কিডের একটি বাগান। মেলায় ঢুকতেই দর্শনার্থীরা পাবে প্যাভিলিয়ন ও স্টল খোজার ডিজিটাল ম্যাপ। এর মাধ্যমে দর্শনার্থী যেকোন প্যাভিলিয়ন ও স্টল হাতের স্পর্শেই খুজে পাবে। মেলায় রয়েছে স্বাস্থ্য সেবা। সার্বক্ষণিক ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়াও মেলায় যেকোন সমস্যা সমাধানে রয়েছে সবখানেই নিরাপত্তা কর্মী।

মেলার স্টল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবারের বাণিজ্য মেলায় ছোট বড় মিলিয়ে সর্বমোট ৫৮৯টি স্টল ও প্যাভিলিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট প্যাভিলিয়ন রয়েছে ১১২টি। ৭৭টি মিনি প্যাভিলিয়ন ছাড়াও রয়েছে ৪০০টি স্টল। মেলায় ১৭টি দেশের মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের স্টল বা প্যাভিলিয়ন রয়েছে। এছাড়া দর্শনার্থীদের বিনোদনের সুন্দরবনের আদলে একটি ইকোপার্ক। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় মেলায় পুলিশ ও র‌্যাবের ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার সর্বমোট ৬০টি অবকাঠামো ও সেবা কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত আনসার ও ভিডিপি, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বিজিবি এবং র‌্যাব নিয়োজিত রয়েছে। আগত দর্শনার্থীদের যে কোনো অভিযোগ শোনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে মেলা প্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক একজন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া মেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গাড়িসহ বাহিনীর সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রোভার স্কাউটের সদস্যরা নিয়োজিত আছে।

মেলায় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ স্টল প্রসঙ্গে ইপিব’র মহাপরিচালক অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, গত বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ স্বীকৃতি ও বঙ্গবন্ধুর সম্মানে একটি বিশেষ প্যাভিলিয়ন করা হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’। এখানে দেখানো হয়েছে শৈশবের খোকা থেকে কিভাবে জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেছে। এ প্যাভিলিয়নে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের স্বাধীনতা পযর্ন্ত বঙ্গবন্ধুর অসাধারন অবদানের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ প্যাভিলিয়নে মোট ২৬টি আলোক চিত্রের সাহায্যে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও ত্যাগ তুলে ধরা হয়েছে।

২৩তম বাণিজ্য মেলা প্রসঙ্গে অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ২৩তম বানিজ্য মেলার আয়োজন অন্য বছরের তুলনায় ভিন্ন আমেজের। পাশাপাশি বড় পরিসর তো বটেই। বানিজ্য মেলা সরকার আয় কেন্দ্র করে আয়োজন করে না। তাই বানিজ্য মেলার আয়ের কোন লক্ষ্যমাত্রা করা হয়না। এরপরও প্রতিবছর মেলার আয় বাড়ছে। তবে বানিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য দেশীয় পণ্যের গুনগত মান বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। একইসঙ্গে দেশি বিদেশি ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি। পাশাপাশি সবার মধ্যে উৎসবমূখর ও বিনোদন পরিবেশ তৈরি করা।

মেলায় প্যাভিলিয়ন ও স্টল বরাদ্দ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেলায় প্যাভিলিয়ন ও স্টলগুলো খুব সুন্দর ও স্বচ্ছভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ ব্যাপারে ইপিবি খুব সজাগ রয়েছে। স্টল বরাদ্দের অনেক ক্ষেত্রে আমরা স্বশরীরে আবেদনকারীর দোকান বা শো-রুম ভিজিট করেছি। এমন দেখা দেখা গেছে, অনেকে আবেদন করেছেন, কিন্তু তার কোন দোকান নেই মার্কেটে। তাই তাকে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তাই এবারে কারো কোন যৌক্তিক বড় ধরনের অভিযোগ নেই বরাদ্দের বিষয়ে। একথায় এবারের বরাদ্দের বিষয়ে অনিয়মের কোনো সুযোগ ছিল না। বরাদ্দের মাধ্যমে ইপিবির আয় বেড়েছে। গতবার স্টল বরাদ্দ থেকে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা আয় হলেও এবারে ৯৭ কোটি টাকা আয় হয়েছে। এবারের মেলার প্যাভিলিয়ন ওয়াকশনের মাধ্যমে বরাদ্দ আর স্টল লটারির মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যগুলো দেয়া হয়েছে ওপেন টেণ্ডারের মাধ্যমে। সর্বোচ্চ দরদাতাকেই বরাদ্দ দেয়া হয়। এবারে একটি প্যাভিলিয়ন ৬৩ লাখ টাকায় বরাদ্দ পেয়েছে।

বাণিজ্য মেলার উদ্দেশ্যে কতটুকু অর্জন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেলার মূল উদ্দেশ্য দেশি পণ্যের গুনগত মান বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। আবার বিদেশি পণ্যের মানের সঙ্গে নিজেদের পণ্যের তুলনা করতে পারা। পাশাপাশি দেশি পণ্যের সঙ্গে বিদেশিদের পরিচিতি করা। আমি মনে করছি, আমাদের উদ্দেশ্য প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পূরণ হয়েছে। কারন এবারে বিশ্বের ১৭টি দেশ ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন ও স্টলের মাধ্যমে এ মেলায় অংশ নিয়েছেন। যা গতবারের চেয়ে বেশি। দিন দিন বিদেশিদের অংশগ্রহন বাড়ছে। এবার মেলায় মরিশাস নতুন দেশ যুক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে সৌদি আরব অংশগ্রহন করার লক্ষে মেলা প্রাঙ্গন ঘুরে গেছে। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি দেশ বানিজ্য মেলায় অংশগ্রহন করার এমন আগ্রহ জানিয়েছেন।

মেলায় ঢাকার ঐতিয্যবাহী হাজী বিরিয়ানির স্টল নেই এরপরও একাধিক হাজী বিরিয়ানি দেখা যাচ্ছে। এতে ক্রেতারা বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। এ বিষয়ে অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, মেলাতে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হাজী বিরিয়ানির স্টল নেই, এটা সত্যি। তবে এখানে দুই জেলার হাজী বিরিয়ানি স্টল রয়েছে। তারা হাজী বিরিয়ানি নামে আলাদা আলাদাভাবে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। তাই এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে দশনার্থীদের বলছি, স্টলগুলোর ব্যানারে হাজী বিরিয়ানি নিচে লেখা রয়েছে কোন জেলার বিরিয়ানি। যাতে ভোক্তারা প্রতারিত না হয়। এছাড়াও আমরা হাজী বিরিয়ানির সঙ্গে আলাদা আলাদা শব্দ যোগ করেছি, যেন মানুষ বুঝতে পারেন আসল হাজীর বিরিয়ানি কোনটি। অপরদিকে খাবারের মান নিয়ে যেন ক্রেতারা হয়রানির শিকার যেন না হয়, সে জন্য আমরা শক্ত মনিটরিং করছি। আমরা আশাবাদী এবার খাবার নিয়ে আগের মতো হয়রানির শিকার হবে না কেউ।

ভোক্তার অধিকার ক্ষুন্ন হলে আপনাদের করনীয় কী? এ ব্যাপারে অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় আমাদের আলাদা টিম রয়েছে। আইনের আলোকেই তারা কাজ করছেন। মেলার খাবার রেস্তোরাঁগুলোতে ওই টিম নজরদারি করছে। নিয়মিত মনিটরিং হচ্ছে। তারপর ভোক্তা অধিকার রক্ষার্থে আরো প্রচারের দরকার। মানুষকে ভোক্তা অধিকারের বিষয়ে জানানোর কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষে ভোক্তা অধিকার সেলের পক্ষ থেকে পোস্টার ও বোর্ড বসানো হয়েছে। পাশাপাশি মাইকেও প্রচারণা চলছে। বিক্রেতা ক্রেতার সচেতন বাড়াতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


বিজনেস আওয়ার/১২ জানুয়ারি, ২০১৮/এমএজেড/এন

উপরে