ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


আর্থিক খাতের মন্দার বছরে গ্রাহকদের কি হলো.......

২০১৮ জানুয়ারি ১৬ ২১:৪৮:০৮

সৈয়দ শামসুর রহমান বিপ্লব: দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে কম সুদের হার ছিল গেল ২০১৭-তে। তিন-সাড়েতিন শতাংশ সুদে লাভ নিয়ে কিভাবে নিশ্চিন্ত থাকবে সাধারণ গ্রাহক। এ সমস্যায় অনেকে চোখে মুখে অন্ধকার দেখেছেন। নিরাপত্তার বিষয়ে চিন্তা করে টাকা জামানত রাখতো ব্যাংকে। সেখানে এমন ধস লাগলে গ্রাহকদের হিতাহিত জ্ঞান হারানো বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। যেমন হঠাৎ করেই ব্যাংক সুদের হার কমার খবর শুনলো।

অর্থমন্ত্রীর এক কথাতেই সব ব্যাংকার সুদের হার কমিয়ে দিতে বাধ্য হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কিš‘ যারা সঞ্চিত টাকায় নিজের অবসর জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। কেন এমন হলো তা বুঝলেও তাদের হাতে জীবিকার বোঝা বয়ে বেড়ানোর আর কোন পথ ছিলনা।

যে ভাবে বলা হয়েছিল তার পুরোপুরি সমন্ময় করতে সময় লেগেছে। যে বিষয়ে নির্দেশনা ছিল যে গ্যাপ কমিয়ে ৫ শতাংশে ¯স্থির করতে হবে, তা হয়ে উঠেনি। এর ফাকেও অনেক অনিয়ম ছিল। বিশেজ্ঞদের বিশ্লেষনে তা উঠে এসেছে বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে। করনীয় কি তা নির্ধারণ করতে সময় লেগেছে পুরও একটা বছর।

আর এমন সমস্যার মাঝে আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গেল বছর জুড়ে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। নিদৃষ্ট করে বললে বলা যায়, ২০১৭ সালে ব্যাংক খাতে কী কী হয়েছে তার বিবরনী তুলে ধরেছেন, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকে অপরিশোধিত ঋণ বেড়েছে, সঞ্চিতির ঘাটতি বেড়েছে, অপরিশোধিত ঋণে গুটিকয়েকের প্রাধান্য তৈরি হয়েছে, জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তি খাতের ব্যাংকে প্রশাসনিক ব্যব¯’ার মাধ্যমে মালিকানার বদল হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি এবং এখন দেখা যা”েছ ব্যক্তি খাতের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটছে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এগুলোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষেধক ব্যব¯’া না নিয়ে সরকার উল্টো ব্যাংকিং আইন সংশোধন করে ব্যাংকে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াল।

দেশে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে ২০১৭ সাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সং¯’া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, চলতি বছরও ব্যাংক খাতের ঘটনাগুলোর কোনো নিরসন হবে বলে মনে হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দিয়ে বোঝা যায়, সংস্কারের বিষয়ে সরকারের মনোভাব কী রকম ছিল।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। সিপিডি বছরে দুই-তিনবার দেশের অর্থনীতি নিয়ে পর্যালোচনা করে। এবারের পর্যালোচনায় তা তুলে ধরা হয়।

সম্প্রতিক পর্যালোচনা ছিল চলতি অর্থবছরের জন্য প্রথম। এতে ব্যাংক খাত, রোহিঙ্গা ও বন্যার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আলোচনা করা হয়। সিপিডির পক্ষে পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। প্রসঙ্গত আর্থিক খাতের যে ভগ্নদশার আগাম পূর্বাভাস মিলেছে তাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারা বেশ কঠিন।

সিপিডি’র দেয়া নির্দেশনা থেকে বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। চাপের মুখে পড়েছে। এটা সামাল দিতে আমরা যে সংস্কারের কথা বলেছিলাম, তা সামনের দিকে এগোয়নি, বরং পেছনের দিকে গেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্যাংকিং খাত।’

সামগ্রিক এই পরিস্থিতির জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব মূলক ভূমিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি তিন জায়গায় সংস্কারের উদ্যমের অভাব, সমন্বয় করতে না পারা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় দুর্বলতা। সম্স্যার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তির পরিবর্তনের কথা তিনি বলেননি। এটা সমাধানও নয়। ব্যব¯’াপনা ও নীতি উদ্যোগের মনোভঙ্গি এবং সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া পরিবর্তন না হলে ব্যক্তির পরিবর্তন বড় বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের এমন মত প্রকাশে শুধু এটাই অনুভব করা যায় আমাদের দেশের আর্থিক খাত সম্বন্ময় হীনতার শিকার। সাধারণ মানুষ যে সুফল আশা করে, সরকার যা দিতে চান তার কোনটাই পুরোপুরি উপলব্ধ হয়না কেননা এর সুফলের মুল অন্তরায় হলো সিদ্ধান্তহীনতা। সরকারের পক্ষথেকে বার বার বলা হলেও জনগন সুফল ঘরে তুলতে পারেনি।

লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উপরে