ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮, ৪ ভাদ্র ১৪২৫


বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দিতে শেয়ারবাজারে আসছি: এহসানুল হাবীব

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ০৫ ১১:৩০:০৭

দেশের ব্যাংক লোনের সুদহার খুব বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেডের লাভ ব্যাংক লোনের সুদহার সমান হয়ে থাকে। সেই ক্ষেত্রে এসকোয়্যার নিট কম্পোজিটের লাভের পুরো অংশটাই ব্যাংকের লোনের সুদ হিসেবে চলে যায়। শেয়ারবাজারে আসার মাধ্যমে কোম্পানির লাভের অংশ ব্যাংকে নয় বিনিয়োগকারীদের দিতে চাই বলে জানিয়েছেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসানুল হাবীব।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিবিএ সম্পন্ন এই এমডি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের একজন। দেশে ফিরে বাবার হাতে তৈরি এসকোয়্যার গ্রুপে যোগ দেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যে সফল উদ্যোক্তাদের তালিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নিজে এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিটের ইন্টারন্যাশন্যাল মার্কেটিং দেখাশোনা করেন। উন্নত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা, বিপণন ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এস্কোয়্যার গ্রুপ ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

ইতিমধ্যে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারনের লক্ষে এসকোয়্যারনিট কম্পোজিটের বিডিং অনুমোদন দিয়েছে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের ৬২৫তম নিয়মিত সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করবে। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিডে। আর রেজিস্ট্রার টু দ্য ইস্যুর দায়িত্বে রয়েছে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।

কোম্পানির নানাদিক নিয়ে সম্প্রতি বিজনেস আওয়ার ২৪.কমের মুখোমুখি হয়েছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসানুল হাবীব। সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিজনেস আওয়ার ২৪.কমের স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট কেন শেয়ারবাজারে আসছে?

এহসানুল হাবীব:এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লাভের মুখ দেখে আসছে। দিন দিন কোম্পানিটি বিদেশে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে লাভের বৃত্ত বড় করছে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ হচ্ছে। এ ব্যবসাকে আরো বড় করতে চাই। আমাদের এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট শতভাগ রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। বাজারে শক্ত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এই ব্যবসায় আরও প্রচুর পরিমান মূলধন দরকার। এতো বড় অঙ্কের মূলধন ব্যাংক থেকে লোন হিসেবে পাওয়া অনেক সময় কষ্টকর। আবার যদিও ব্যাংক থেকে লোন হিসেবে যা পাই তার সুদের হার খুব বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সুদহার আমাদের লাভের সমান। সেই ক্ষেত্রে ওই অর্থের লাভের পুরো অংশটাই ব্যাংকের সুদ হিসেবে চলে যায়। এছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিভিন্ন প্রনোদনা, কর কমসহ অন্য অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। তাই আমরা চাচ্ছি, শেয়ারবাজার থেকে কোম্পানির প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলন করতে। বিনিময়ে এই কোম্পানির ওই অর্থের লাভের অংশ ব্যাংকে নয় বিনিয়োগকারীদের মাঝে বন্টন করবে।

শুনেছি ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে শেয়ারবাজারে আসা?

এহসানুল হাবীব: সত্যি শুনেছেন। বাজারে সুনাম ধরে রেখে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসার করতে চায় এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট। এজন্য ব্যবসা আরো সম্প্রসারণের প্রয়োজন পড়েছে। এ লক্ষে কোম্পানি ময়মনসিংহের ভালুকায় পরিবেশ বান্ধব আধুনিক কারখানা করার পরিকল্পনা করেছে। এই নতুন ইউনিটে বিনিয়োগ করা হবে ৫৭৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা । এর মধ্যে শেয়ারবাজার থেকে সংগ্রহ করা হবে ১৫০ কোটি টাকা। আর বিদেশিদের কাছ থেকে নেয়া হবে ৩৪৬ কোটি টাকা। এছাড়া কোম্পানির নিজস্ব তহবিল ও পরিচালকদের কাছ থেকে আসবে ৮৬ কোটি টাকা।

এসকোয়্যার নিট কম্পোজিটের যাত্রা শুরু কিভাবে?

এহসানুল হাবীব: এসকোয়্যার গ্রুপের যাত্রা ১৯৭৪ সালে। এ গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট। যা ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এটি ২০১৫ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। এছাড়া আমরা নতুন একটি ইউনিটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এজন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে যাচ্ছি। শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটি সফলতার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদাও রয়েছে।

আপনার পণ্যের ক্রেতা তালিকায় রয়েছে কোন কোন দেশ?

এহসানুল হাবীব: আমরা মূলত ইউরোপিয়ান বাজারেই বেশি রফতানি করছি। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনে বেশ কিছু ক্রেতা আছে। চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। আমাদের নর্থ আমেরিকান মার্কেটে উপস্থিতি কম। এর বাইরে আমাদের কিছু নন ট্রেডিশনাল বাজার আছে। যেমন চায়না ও রাশিয়া। আমরা অস্ট্রেলিয়ার বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছি। যেসব ব্র্যান্ড আমাদের ক্রেতা তালিকায় রয়েছে, তার মধ্যে সি অ্যান্ড এ, বেস্ট সেলার, অস্টিন, এসপিরিট, মাসকট, সেলিও, নেক্সট, টি জেইস, পুল অ্যান্ড বিয়ার প্রভৃতি অন্যতম।

নিট পণ্যের চাহিদা ও বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?

এহসানুল হাবীব: বিশ্ববাজার লক্ষ করলে দেখা যায় নিট পণ্য রফতানিতে প্রথম স্থানে চীন, এরপরই রয়েছে বাংলাদেশ। দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এ খাত। আমাদের দেশের ভিশন ২০২১-এ রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সে অনুযায়ী তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। এতদিন আমরা বাংলাদেশ থেকে যে পণ্য রফতানি করতাম, সেগুলো মিড রেঞ্জের’ পণ্য। এখন ‘মিড অ্যান্ড আপার’ রেঞ্জের দিকে যাচ্ছে। আগে আমরা শুধু গেঞ্জি বা শার্ট রফতানি করতাম। বর্তমানে এর সঙ্গে এখন ফ্যাশন ওয়ার্কও করা হয়। এতদিন বিদেশ থেকে ক্রেতারা নিজস্ব ডিজাইন নিয়ে আসতেন। আমরা ওই ডিজাইন কপি করে পণ্য তৈরি করে রফতানি করতাম। এখন আমরা নিজেরাই ডিজাইন করে ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরছি। ভালো সাড়া পাচ্ছি।

এসকোয়্যার নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলুন?

এহসানুল হাবীব: কীভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেই নতুন প্লান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেখানে দেশের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। যা আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে দেশের জন্যও ভালো কিছু বয়ে আনবে। তাছাড়া কীভাবে আরও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি, কীভাবে বিশ্বে আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যায়- সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। দেশের শেয়ারবাজারে এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট তালিকাভুক্ত হবে একটা ব্রান্ড যুক্ত হওয়া।


চ্যালেঞ্জ হিসেবে কি দেখছেন?

এহসানুল হাবীব: চ্যালেঞ্জ তো প্রতিনিয়তই থাকে। বিশ্ববাজারে দাম পড়ে যাচ্ছে। ব্রেক্সিট হওয়ায় ইউরোপে মূল্যের দরপতন হয়েছে। আর তাদের ওই বিষয়টা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যেমন আগে একটা টি-শার্ট তিন পাউন্ডে কিনতে পারতো; কিন্তু এখন আড়াই পাউন্ডে কিনতে চায়। ওই চাপটা আছে। আর অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। যেমন ক্রেতারা চান খুব কম সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে। আগে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারের পর পণ্য তৈরির সময় পাওয়া যেত ১২০ থেকে ১৮০ দিন। কিন্তু এখন ৬০ দিনে চলে এসেছে। চ্যালেঞ্জ হলো, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। এছাড়া অবকাঠামোগত কিছু সমস্যাও আছে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাসের ঊচ্চমূল্য। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হচ্ছে, তাদের সরকার অনেক এগিয়ে এসেছে। আমাদের এ প্রতিষ্ঠানে প্রচুর জনবল রয়েছে। সরকারের এখানে এগিয়ে আসা দরকার। তাছাড়া ব্যাংক ইন্টারেস্টও অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

বিজনেস আওয়ার/এন/৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮.

উপরে