ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫

শেয়ারবাজারের উন্নয়নে আইপিও বাড়ানো উচিত

‘আইপিও জটিলতা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে নিরুৎসাহিত করছে’

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১২ ১২:১০:৩৭

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা উদ্যোক্তাদেরকে শেয়ারবাজারে আসার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া আইপিও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। এক্ষেত্রে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে সময়ক্ষেপনের চেয়ে অনেকের কাছেই ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজসাধ্য। এ কারণে অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে অনাগ্রহী হয়ে উঠে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পদ্ধতি পর্যালোচনা করে আইপিও প্রক্রিয়া সহজে ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা গেলে বিভিন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।

সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ফারস হোটেলে অনলাইন বিজনেস পোর্টাল বিজনেসআওয়ার২৪.কম আয়োজিত ‘শিল্পায়নে আইপিও’র গুরুত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধে জিটিভি’র প্রধান প্রতিবেদক রাজু আহমেদ এসব কথা বলেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, বিএসইসির কমিশনার স্বপন কুমার বালা ও ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি হাসান ঈমাম রুবেলউপস্থিত ছিলেন।

রাজু আহমেদ বলেন, একটি কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া শুরুর পর অনুমোদন নিয়ে মূলধন সংগ্রহে যথেষ্ট সময় লেগে যায়। আইপিও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) তৈরি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপেই এই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। নির্ধারিত মূল্য (ফিক্সড প্রাইস) এবং বুকবিল্ডিং দুই পদ্ধতির ক্ষেত্রেই এই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। তবে নানা পথ পাড়ি দিয়ে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে তুলনামূলক সময় লাগে বেশি। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই বছর সময় ব্যয় হওয়ার নজিরও দেখা গেছে। অথচ প্রতিবেশি দেশ ভারতে আইপিওর পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ। এমতাবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পদ্ধতি পর্যালোচনা করে আইপিও প্রক্রিয়া সহজে ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা গেলে বিভিন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।

তিনি শিল্প খাতে মূলধনের উৎস পুঁজিবাজার বিষয়ে বলেন, জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিল্প খাতের মূলধনের প্রধান উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীল খাতে নতুন নতুন কোম্পানি গড়ে তোলা বা বিদ্যমান ভাল কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের মাত্রা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেটের অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বাজার থেকে মূলধন স্থানান্তরের মাত্রা বাড়ছে না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো কোনো বছর আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন উত্তোলন বাড়লেও বৃদ্ধির এই প্রবণতা স্থিতিশীল হচ্ছে না।

নিম্নে টেবিলের মাধ্যমে বিগত ৯ বছরের আইপিও’র সংখ্যা ও সংগৃহিত টাকার পরিমাণ তুলে ধরা হল-

সাল

আইপিও সংখ্যা

সংগৃহিত অর্থের পরিমাণ (কোটি টাকা)

২০০৯

১৭

১২৭২.১১

২০১০

১৭

১১৮৬.০৮

২০১১

১৩

১৬৭৭.৭১

২০১২

১৭

১২০৮.১১

২০১৩

১২

৮৩০.৫০

২০১৪

২০

১২৬৩.৬২

২০১৫

১২

৮৩০.৭২

২০১৬

১১

৮৪৯.৩০

২০১৭

২১৯.২৫

প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে বাংলাদেশ যোজন যোজন পিছিয়ে আছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল- এই পাঁচ বছরে ভারতে শুধু মূলধারার আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলারের সমপরিমান মূলধন সংগৃহিত হয়েছে। একই সময়ে আইপিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। শুধু ২০১৭ সালে ভারতে আইপিও’র মাধ্যমে ৭৫ হাজার ৫০০ কোটি রূপি সংগৃহিত হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ ও অগ্রিমের পরিমান ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ কোটি রূপি। অর্থাৎ, গত বছর ভারতে মূলধন যোগানে পুঁজিবাজারের অংশীদারিত্ব ছিল ২৫ শতাংশ।

শেয়ারবাজারে আইপিও : ভারত ও বাংলাদেশের তুলনা

সাল

ভারত

বাংলাদেশ

আইপিও সংখ্যা

সংগৃহিত অর্থ (কোটি ডলার)

আইপিও সংখ্যা

সংগৃহিত অর্থ (কোটি ডলার)

২০১৩

৩৮

২৯.৫

১২

১০.৩৮

২০১৪

৪৩

২৬.৩

২০

১৫.৭৯

২০১৫

২১

২০০

১২

১০.৩৮

২০১৬

৮৩

৩৮০

১১

১০.৬২

২০১৭

১৫৩

১১৬০

২.৭৪

মোট

৩৩৮

১৭৯৫.৮

৬২

৪৯.৯১

চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল। পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। ওই অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে উঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো ছিল সবচেয়ে জরুরি কাজ।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও পুঁজিবাজার :

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা। গত এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১ শতাংশ। ওই অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৬০ কোটি টাকা। জাতীয় অর্থনীতির এই ধারাবাহিক অগ্রগতি পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু জিডিপির আকারের সঙ্গে বাজার মূলধনের তুলনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পিছিয়ে আছে। অনেক দেশে বাজার মূলধন জিডিপির আকারের চেয়ে বেশি হলেও বাংলাদেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন এখনো জিডিপির ১৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়ে গেছে। তুলনামূলক এই পরিসংখ্যান থেকে প্রমাণিত হয়, দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নেয়ার অফুরন্ত সুযোগ রয়ে গেছে।

টেবিল : কয়েকটি দেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত (জুন ২০১৬)

দেশ

বাজার মূলধন

(বিলিয়ন ডলার)

জিডিপির আকার

(বিলিয়ন ডলার)

বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত

বাংলাদেশ

৪০.৬৩

২২০.৬১

১৮.৪২%

ভারত

১৫২১.০৪

২০৯০.৭১

৭২.৭৫%

পাকিস্তান

৭৩.২৩

২৬৯.৯৭

২৭.১৩%

শ্রীলঙ্কা

১৮.৫৬

৮২.১০

২২.৬১%

ইন্দোনেশিয়া

৪০৯.৯৫

৮৫৮.৯৫

৪৭.৭৩%

মালয়েশিয়া

৪১২.০৬

২৯৬.২২

১৩৯.১১%

থাইল্যান্ড

৪০০.৫২

৩৯৫.২৯

১০১.৩২%

তাইওয়ান

৭৯০.০৫

৫২৩.৫৮

১৫০.৮৯%

ফিলিপাইন

২৮১.৮৪

৩০৮.০৩

৯১.৫০%

জাপান

৪৬৮৬.৪৫

৪১২৩.২৬

১১৩.৬৬%

হংকং

২৯৭২.৫৬

৩০৯.৯৩

৯৫৯.১০%

সিঙ্গাপুর

৬৬৫.৭৫

২৯২.৭৩

২২৭.৪২%

দীর্ঘমেয়াদী পুঁজির উৎস পুঁজিবাজার :

বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাংক ঋণ নিয়ে শিল্প বা ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ সব দিক থেকেই লাভজনক। কারণ ব্যাংক ঋণ হয় স্বল্প মেয়াদী। এতে নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে। লাভ বা লোকসান- যাই হোক না কেনো, ব্যাংকের নির্দিষ্ট সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহ করা যায়। বার্ষিক মুনাফার উপর ভিত্তি করে লভ্যাংশ ঘোষণার সুযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের গড় হার ৯.৮৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে মেয়াদী শিল্প ঋণের সুদের হার সর্বনিম্ন ৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ। এরসঙ্গে যোগ করতে হয় নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ। ফলে সম্প্রতি ঘোষিত সুদ যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকার পরও ব্যাংক ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন।

জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা :

গত কয়েক বছরে জাতীয় সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। কাঙ্খিত মাত্রার তুলনায় কম হলেও বেড়েছে বিনিয়োগ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল জিডিপির ৩০.৩০ শতাংশ। যা আগের (২০০৯-১০) অর্থবছরে ছিল ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে সার্বিক বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ৩০.২৭ শতাংশ। এরমধ্যে বেসরকারী বিনিয়োগ ২৩.০১ শতাংশ এবং সরকারী বিনিয়োগ ৬.৬৬ শতাংশ। গত এক দশকে জাতীয় বিনিয়োগে বেসরকারী খাতের অবদান বেড়েছে।

তবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে মোট দেশজ বিনিয়োগ ৩৪.৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল জিডিপির ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রকৃত বিনিয়োগের হার লক্ষ্যমাত্রায় চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। জিডিপির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অতিরিক্ত বিনিয়োগের অধিকাংশ প্রবৃদ্ধি বেসরকারী খাত থেকে আসবে বলে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রক্ষেপন করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারী খাতের জন্য মূলধন যোগানের বড় ক্ষেত্র হতে পারে পুঁজিবাজার।

শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়নে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা :

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জিডিপিতে ধারাবাহিকভাবে কৃষিনির্ভরতা কমছে। বাড়ছে শিল্প ও সেবা খাতের ভূমিকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩১.৫৪ শতাংশ। যা ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ৩০.৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে সেবা খাতের অবদান ছিল ৫৩.১২ শতাংশ। যা ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ৪৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে কৃষির অবদান ১৯.৯৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৭ শতাংশে। অর্থাৎ, জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে। শিল্পের এই গতিকে আরো অগ্রসর ও টেকসই করতে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। একইভাবে সেবা খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজার রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে আসার বাধ্যবাধকতা

আমাদের দেশে বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিাবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিধান করেছে, কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে ওই কোম্পানিকে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে। আর ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের নতুন কোম্পানির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যে তালিকাভুক্তির বিধান রয়েছে। অবশ্য সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিকে এ শর্ত থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা এনে কর ফাঁকি বন্ধের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোসহ বিভিন্ন কারণে বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপের নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছিল। তবে এই শর্ত পরিপালনে সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ কোম্পানিরই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বাধ্যবাধকতা আরোপের পর এক যুগ পার হলেও বেশিরভাগ কোম্পানিই তা মানেনি। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের (আরজেএসসি) তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এরমধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি মূলধনের কোম্পানির সংখ্যা প্রায় এক হাজার। অথচ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা এখনো মাত্র ৩০২টি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে নিয়মিতভাবে মূলধন বাড়ানোর অনুমতি দিচ্ছে বিএসইসি। ফলে আইন থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে বৃহৎ পুঁজির কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত না হয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানির অনিহা কেন?

পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে যে কোনো কোম্পানি তাদের কার্যক্রম আরো সুসংহত করতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য সরকার আয়কর রেয়াত সুবিধা দিয়েছে। এরপরও অধিকাংশ কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে অনিহা প্রকাশ করে আসছে। এর মূলে রয়েছে কোম্পানির উপর ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীগত মালিকানা ধরে রাখার গতানুগতিক চিন্তা। অনেক বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পরিচালনা ও বিপুল মুনাফা করলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভয়ে পুঁজিবাজারে না আসার অন্যতম কারণ। এ ধরনের প্রবণতার সঙ্গে কর ফাঁকির প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। স্বচ্ছতা এড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি এবং নিজেদের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত তথ্য গোপণ করার জন্যই কোম্পানিগুলো না অজুহাত দেখিয়ে বাজারের বাইরে থাকতে চায়।

কারসাজির প্রবণতা কমিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়তে হলে বাজারে মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে বাজারের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে কোম্পানিগুলো মূলধন সংগ্রহের মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারবে, অন্যদিকে বাজারে ভাল শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে।

ক্ষেত্র প্রস্তুত : প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা বজায় রেখে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করতে হলে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক মাত্রায় বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। বর্তমান ব্যাংকনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে কার্যকরভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য উন্নত দেশগুলোর মতো শেয়ারবাজারকে পুঁজি যোগানের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কোম্পানির শেয়ার ছেড়ে মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বাড়াতে হবে। বন্ড ও ডিবেঞ্চারের জন্য পুঁজিবাজারে সহায়ক নীতি ও পরিবেশ জরুরি।

মূলধন যোগানে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ইতিবাচক সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের খেলাপী ঋণের সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধে বাধ্য করা গেলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি কমে আসবে। বাড়বে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের প্রবণতা।

বিজনেস আওয়ার/১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮/আরএ

উপরে