ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫


’শিল্পায়নে আইপিওর গুরুত্ব’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১২ ১৭:১০:৫৮

রাজু আহমেদ : পুঁজিবাজার নিয়ে আমাদের দেশে সাধারণ ধারণা হলো, এটি বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা বা হাতবদলের জায়গা। সাধারণ মানুষ তো বটেই অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন বা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন এমন অনেকেও সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার লেনদেনকেই পুঁজিাবাজারের মূল কাজ মনে করেন। এ কারণে অনেকেই পুঁজিবাজারকে অনুৎপাদনশীল খাত কিংবা জাতীয় অর্থনীতির একটি অগুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। শিল্পায়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে এ খাতটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সেদিকটি খুব কমই আলোচিত হয়। অথচ বৃহৎ পুঁজি গঠনের মাধ্যমে শিল্প খাতের অর্থায়নে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে, তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে।

পুঁজিবাজারের প্রাথমিক উদ্দেশ্যই হলো উদ্যোক্তাদের মূলধন জোগান দেয়া। কিন্তু সেই মূল বিষয়টির চেয়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার বেচা-কেনাই আমাদের দেশে বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। যদিও শক্তিশালী সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে না উঠলে পুঁজিবাজার কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
এই বাজারকে দেশের উৎপাদনশীল খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সরকারের দিক থেকে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। কারণ পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির মূলধারা থেকে বিছিন্ন কোনো জায়গা নয়। অর্থনীতি ভালো অবস্থায় থাকলে শেয়ারবাজারেও এর প্রতিফলন ঘটবে। আবার এখান থেকে মূলধন সংগ্রহ করে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো গতিশীল করা সম্ভব।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও পুঁজিবাজার

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা। গত এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১ শতাংশ। ওই অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৬০ কোটি টাকা।
কয়েকটি দেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত (জুন ২০১৬)

দেশ বাজার মূলধন (বিলিয়ন ডলার) জিডিপির আকার (বিলিয়ন ডলার) বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত

বাংলাদেশ ৪০.৬৩ ২২০.৬১ ১৮.৪২
ভারত ১৫২১.০৪ ২০৯০.৭১ ৭২.৭৫
পাকিস্তান ৭৩.২৩ ২৬৯.৯৭ ২৭.১৩
শ্রীলঙ্কা ১৮.৫৬ ৮২.১০ ২২.৬১
ইন্দোনেশিয়া ৪০৯.৯৫ ৮৫৮.৯৫ ৪৭.৭৩
মালয়েশিয়া ৪১২.০৬ ২৯৬.২২ ১৩৯.১১
থাইল্যান্ড ৪০০.৫২ ৩৯৫.২৯ ১০১.৩২
তাইওয়ান ৭৯০.০৫ ৫২৩.৫৮ ১৫০.৮৯
ফিলিপাইন ২৮১.৮৪ ৩০৮.০৩ ৯১.৫০
জাপান ৪৬৮৬.৪৫ ৪১২৩.২৬ ১১৩.৬৬
হংকং ২৯৭২.৫৬ ৩০৯.৯৩ ৯৫৯.১০
সিঙ্গাপুর ৬৬৫.৭৫ ২৯২.৭৩ ২২৭.৪২

জাতীয় অর্থনীতির এই ধারাবাহিক অগ্রগতি পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু জিডিপির আকারের সঙ্গে বাজার মূলধনের তুলনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পিছিয়ে আছে। অনেক দেশে বাজার মূলধন জিডিপির আকারের চেয়ে বেশি হলেও বাংলাদেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন এখনো জিডিপির ১৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়ে গেছে। তুলনামূলক এই পরিসংখ্যান থেকে প্রমাণিত হয়, দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নেয়ার অফুরন্ত সুযোগ রয়ে গেছে।

জিডিপির তুলনায় ডিএসইর বাজার মূলধন

সাল জিডিপির অনুপাত (%)
২০১০ ৫০.৭০
২০১১ ৩৩.২০
২০১২ ২৬.৩০
২০১৩ ২৫.৫০
২০১৪ ২৪.১০
২০১৫ ২০.৬০
২০১৬ ১৯.৭০
২০১৭ ২১.৬২

জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা

গত কয়েক বছরে জাতীয় সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। কাক্সিক্ষত মাত্রার তুলনায় কম হলেও বেড়েছে বিনিয়োগ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল জিডিপির ৩০.৩০ শতাংশ যা আগের (২০০৯-১০) অর্থবছরে ছিল ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে সার্বিক বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ৩০.২৭ শতাংশ। এরমধ্যে বেসরকারী বিনিয়োগ ২৩.০১ শতাংশ এবং সরকারী বিনিয়োগ ৬.৬৬ শতাংশ। গত এক দশকে জাতীয় বিনিয়োগে বেসরকারী খাতের অবদান বেড়েছে।

তবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে মোট দেশজ বিনিয়োগ ৩৪.৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল জিডিপির ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত বিনিয়োগের হার লক্ষ্যমাত্রায় চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। জিডিপির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অতিরিক্ত বিনিয়োগের অধিকাংশ প্রবৃদ্ধি বেসরকারী খাত থেকে আসবে বলে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রক্ষেপন করা হয়েছে। এই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারী খাতের জন্য মূলধন যোগানের বড় ক্ষেত্র হতে পারে পুঁজিবাজার।

শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়নে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জিডিপিতে ধারাবাহিকভাবে কমছে কৃষিনির্ভরতা। বাড়ছে শিল্প ও সেবা খাতের ভূমিকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩১.৫৪ শতাংশ যা ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ৩০.৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে সেবা খাতের অবদান ছিল ৫৩.১২ শতাংশ যা ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ৪৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে কৃষির অবদান ১৯.৯৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৭ শতাংশে। অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে। শিল্পের এই গতিকে আরো অগ্রসর ও টেকসই করতে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। একইভাবে সেবা খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজার রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

শিল্প খাতে মূলধনের উৎস পুঁজিবাজার

জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিল্প খাতের মূলধনের প্রধান উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীল খাতে নতুন নতুন কোম্পানি গড়ে তোলা বা বিদ্যমান ভাল কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের মাত্রা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। কিš‘ সেকেন্ডারি মার্কেটের অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বাজার থেকে মূলধন ¯’ানান্তরের মাত্রা বাড়ছে না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো কোনো বছর আইপিও বা রাইট শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন উত্তোলন বাড়লেও, এই প্রবণতা ¯ি’তিশীল হ”েছ না।

আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ
সাল আইপিও সংখ্যা সংগৃহিত অর্থের পরিমান (কোটি টাকা)
২০০৯ ১৭ ১২৭২.১১
২০১০ ১৭ ১১৮৬.০৮
২০১১ ১৩ ১৬৭৭.৭১
২০১২ ১৭ ১২০৮.১১
২০১৩ ১২ ৮৩০.৫০
২০১৪ ২০ ১২৬৩.৬২
২০১৫ ১২ ৮৩০.৭২
২০১৬ ১১ ৮৪৯.৩০
২০১৭ ৭ ২১৯.২৫

কারণ বাংলাদেশে এখনো পুঁজির উৎস হিসেবে উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারের চেয়ে ব্যাংক ঋণের উপর বেশি নির্ভরশীল। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি। গত কয়েক বছরে পুঁজিাবাজারের অব¯’া আগের তুলনায় শক্তিশালী হলেও এখান থেকে মৌলিক খাতে মূলধন স্থানান্তরের প্রবণতা অনেক কম।

২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে প্রাথমিক শেয়ার, রাইট শেয়ার ও বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি ৪ হাজার ১৪০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা সংগৃহিত করেছে। এরমধ্যে আইপিও’র মাধ্যমে সাধারণ শেয়ার ইস্যু করে একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ ৭টি প্রতিষ্ঠান ২১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ৪টি কোম্পানি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১ হাজার ১১৪ কোটি ২ লাখ টাকা এবং ১৪২টি কোম্পানি বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২ হাজার ৮০৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে।

অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে আইপিও এবং রাইট শেয়ারের মাধ্যমে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা মূলধন সংগৃহিত হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে শিল্প খাতে মেয়াদী ঋণ ও অগ্রিম হিসেবে নেয়া হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।

আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৬ সময়কালে বিভিন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে প্রাথমিক শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিম হিসেবে ব্যাংক থেকে সংগৃহিত হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূলধন যোগানে পুঁজিবাজারের অংশীদারিত্ব ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে বাংলাদেশ যোজন যোজন পিছিয়ে আছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল এই পাঁচ বছরে ভারতে শুধু মূলধারার আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলারের সমপরিমান মূলধন সংগৃহিত হয়েছে। একই সময়ে আইপিও’র মাধ্যমে বাংলাদেশে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার। শুধু ২০১৭ সালে ভারতে আইপিও’র মাধ্যমে ৭৫ হাজার ৫০০ কোটি রূপি সংগৃহিত হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ ও অগ্রিমের পরিমান ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ কোটি রূপি। অর্থাৎ গত বছর ভারতে মূলধন যোগানে পুঁজিবাজারের অংশীদারিত্ব ছিল ২৫ শতাংশ।

পুঁজিবাজারে আইপিও : ভারত ও বাংলাদেশের তুলনা

সেকেন্ডারি মার্কেট শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারে জমে উঠা পুঁজি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে তা বাজার বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিপর্যয়েরও অন্যতম কারণ ছিল এটি। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণে ওই সময় পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। ওই অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে উঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো ছিল সবচেয়ে জরুরি। শক্তিশালী পুঁজিবাজারকে দেশের উৎপাদনমুখী খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সরকারের দিক থেকে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত ছিল। কিন্তু সময় মতো সে ধরনের পদক্ষেপ নিতে না পারায় বাজার বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়। এতেই প্রমাণিত হয়, পুঁজিবাজারে জমে উঠা মূলধন সময় মতো উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে এক পর্যায়ে তা পুঁজিাবাজারকেই বিপর্যস্ত করে তোলে।

দীর্ঘমেয়াদী পুঁজির উৎস পুঁজিবাজার

বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাংক ঋণ নিয়ে শিল্প বা ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ সব দিক থেকেই লাভজনক। কারণ ব্যাংক ঋণ হয় স্বল্প মেয়াদী। এতে নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে। লাভ বা লোকসান- যাই হোক না কেনো, ব্যাংকের নির্দিষ্ট সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহ করা যায়। বার্ষিক মুনাফার উপর ভিত্তি করে লভ্যাংশ ঘোষণার সুযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ কম থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের গড় হার ৯.৮৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে মেয়াদী শিল্প ঋণের সুদের হার সর্বনিন্ম ৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ। এরসঙ্গে যোগ করতে হয় নানা ধরনের সার্ভিস চার্জ। ফলে সম্প্রতি ঘোষিত সুদ যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বনিন্ম পর্যায়ে থাকার পরও ব্যাংক ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন।

এরপরও আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাংক ঋণের প্রতি আকর্ষণ বেশি। এতে একদিকে বিনিয়োগে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বৃহৎ পুঁজি যোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প পরিচালনা করতে গিয়ে লোকসানে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। সময় মতো শোধ না করায় বিপুল পরিমান ঋণ খেলাপী হয়ে যাচ্ছে।

এ কারণে খোদ বাংলদেশ ব্যাংকই মেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে ঋণের চেয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মেয়াদী ঋণের ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে,‘দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এখন ব্যাংক থেকে না নিয়ে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। কারণ এটা ব্যাংক ঋণের চেয়ে ইতিবাচক।’

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ইক্যুয়িটি ইস্যু বা তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের প্রবণতা বাড়াতে হবে।

বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে আসার বাধ্যবাধকতা

আমাদের দেশে বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিধান করেছে, কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে ওই কোম্পানিকে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে। আর কোনো কোম্পানি ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করলে, বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যে তালিকাভুক্তির বিধান রয়েছে। অবশ্য সরকারের নির্দেশনায় বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিকে এ শর্ত থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা এনে কর ফাঁকি বন্ধের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোসহ বিভিন্ন কারণে বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপের নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছিল। তবে এই শর্ত পরিপালনে সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ কোম্পানিরই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বাধ্যবাধকতা আরোপের পর এক যুগ পার হলেও বেশিরভাগ কোম্পানিই তা মানেনি। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের (আরজেএসসি) তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এরমধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি মূলধনের কোম্পানির সংখ্যা প্রায় এক হাজার। অথচ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩০২টি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে নিয়মিতভাবে মূলধন বাড়ানোর অনুমতি দিচ্ছে বিএসইসি। ফলে আইন থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতার কারণে বৃহৎ পুঁজির কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত না হয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানির অনিহা কেন?

পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে যে কোনো কোম্পানি তাদের কার্যক্রম আরো সুসংহত করতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য সরকার উল্লেখযোগ্য হারে আয়কর রেয়াত সুবিধা দিয়েছে।

এরপরও অধিকাংশ কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে অনিহা প্রকাশ করে আসছে। এর মূলে রয়েছে কোম্পানির উপর ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীগত মালিকানা ধরে রাখার গতানুগতিক চিন্তা। অনেক বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক কর্মকা- পরিচালনা ও বিপুল মুনাফা করলেও স্ব”ছতা ও জবাবদিহিতার ভয়ে পুঁজিবাজারে আসতে চায় না।

এ ধরনের প্রবণতার সঙ্গে জড়িত আছে কর ফাঁকির চিন্তা। স্বচ্ছতা এড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি এবং নিজেদের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত তথ্য গোপন করার জন্যই কোম্পানিগুলো না অজুহাতে বাজারের বাইরে থাকতে চায়। এ থেকে ধারণা করা যায়, তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পাওয়া আয়কর রেয়াতের চেয়ে কর ফাঁকিতে সুবিধা বেশি পাওয়া যায়। অনেক কোম্পানি একাধিক হিসাব সংরক্ষণের মাধ্যমে কর ফাঁকির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলধন জোগানের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের চেয়ে তারা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার আশ্রয় নিয়ে ব্যাংকঋণ নেয়াকেই উপযুক্ত বলে মনে করে। তাই সামর্থ্য ও সম্ভাবনা থাকলেও অসংখ্য কোম্পানি বাজারে আসছে না।

কারসাজির প্রবণতা কমিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়তে হলে বাজারে মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে বাজারের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে কোম্পানিগুলো অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারবে, অন্যদিকে বাজারে ভাল শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে।

তালিকাভুক্ত হচ্ছে দূর্বল কোম্পানি

আর্থিক মৌলভিত্তির কোম্পানির অনিহার সুযোগ নিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে অনেক দূর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়াতে নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের পর কোনো কোনো কোম্পানির প্রকৃত মৌলভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। আইপিও অনুমোদনের জন্য জমা দেয়া হিসাব বিবরণীতে ধারাবাহিক মুনাফা দেখানো হলেও, বাজারে আসার পর অনেক কোম্পানি লোকসানী তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে মুনাফা তো হচ্ছেই না, উল্টো বিনিয়োগকারীদের পুঁজি আটকে যাচ্ছে। এছাড়া স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির সুযোগও বেশি।

প্রচলিত বিধিমালা মেনে ভাল কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রবণতা বাড়লে দূর্বল কোম্পানির আসার সুযোগ কমে যাবে। আইপিও প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ইস্যু ব্যবস্থাপক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো তখন নিজেদের টিকিয়ে রাখতে দূর্বল কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টায় লিপ্ত হবে না। তাছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও ভাল-মন্দের বাছ-বিচার করার ক্ষেত্রে প্রসারিত হবে।

তালিকাভুক্তি নিয়ে জটিলতা

শুধু উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ নয়, প্রাথমিক গণ প্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতাও অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করছে। আইপিও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা অনেক কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের জন্য সময়ক্ষেপনের চেয়ে অনেকের কাছেই ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজসাধ্য। এ কারণে অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে অনাগ্রহী হয়ে উঠে।

একটি কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া শুরুর পর অনুমোদন নিয়ে মূলধন সংগ্রহে যথেষ্ট সময় লেগে যায়। আইপিও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) তৈরি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদক্ষেপেই এই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। নির্ধারিত মূল্য (ফিক্সড প্রাইস) এবং বুকবিল্ডিং দুই পদ্ধতির ক্ষেত্রেই এই দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যায়। তবে নানা পথ পাড়ি দিয়ে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে তুলনামূলক সময় লাগে বেশি। অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই বছর সময় ব্যয় হওয়ার নজিরও দেখা গেছে। অথচ প্রতিবেশি দেশ ভারতে আইপিও’র পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ ।

‘রোড শো’, বিডিং, মূল্য নির্ধারণ ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় হলে এরমধ্যে কোম্পানির আর্থিক হিসাব-নিকাশ পরিবর্তিত হয়ে যায়ে। হিসাব বিবরণী হালনাগাদ করতে গিয়ে রোড শোতে উপস্থাপিত অনেক তথ্যই বদলে যায়। আবার ধাপে ধাপে অনুমোদন পেতে পেতে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। কোনো কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূলধন প্রয়োজন হয়। ওই সময়ের মধ্যে মূলধন সংগ্রহ সম্ভব না হলে কোম্পানিটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কোম্পানিগুলো শুরুতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতো এবং পরে আইপিও’র মাধ্যমে সংগৃহিত অর্থ থেকে ওই ঋণ পরিশোধ করতো। বর্তমানে আইপিও’র অর্থে ঋণ পরিশোধে বিধি-নিষেধ আরোপ করায় তাও সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে ২০১০ সালে পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর মাত্র পাঁচটি কোম্পানি বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরমধ্যেই কোনো কোনো কোম্পানির বিডিং প্রক্রিয়া ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

আইপিও প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ বিএসইসি’র সীমিত জনবল। বর্তমানে কমিশনের ক্যাপিটাল ইস্যু বিভাগে ১০ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। আইপিও’র পাশাপাশি এই কর্মকর্তাদের এক কোটি টাকার বেশি মূলধনের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ও ১০ কোটি টাকার বেশি মূলধনের প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদনের জন্য কাজ করতে হয়। ফলে একেকটি আইপিও’র জন্য তারা যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দিতে পারেন না। এরমধ্যে কোনো কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের জন্য বাইরে থাকলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পদ্ধতি পর্যালোচনা করে আইপিও প্রক্রিয়া সহজে ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা গেলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।

মূল্য নির্ধারণ বিতর্ক

পুঁজিবাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের শ্রমে উদ্যোক্তারা কোম্পানি পরিচালনা করে আইপিওতে এসে শেয়ারের যে মূল্য পাচ্ছেন, সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন শুরুর প্রথম দিনেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি মুনাফা করছেন। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বাজারে আসা ৩৪টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের প্রথম দিনে আইপিও মূল্যের চেয়ে শতভাগের বেশি দামে লেনদেন হয়েছে।

নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের মূল্য পরিস্থিতি

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লটারির মাধ্যমে প্রাথমিক শেয়ার পেয়ে স্টক একচেঞ্জে তালিকাভুক্তির পর সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের প্রথম দিনেই শেয়ারের কয়েক গুণ বেশি দাম পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীর। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে মূল্য পান না কোম্পানির উদ্যোক্তারা। প্রাথমিক শেয়ারের কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক উদ্যোক্তা শেয়ারবাজারে আসতে চান না।

আবার লেনদেন শুরুর পর প্রথমদিকে বাজারে শেয়ারের দর বেশি থাকলেও অধিকাংশ শেয়ারের ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে সেই হারে মূল্য পাওয়া যায় না। ফলে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বিদ্যমান প্রক্রিয়া কতোটা কার্যকর তা বিবেচনার দাবি রাখে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে উদ্যোক্তাদের জন্য শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে তালিকাভুক্তিতে তাদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

ক্ষেত্র প্রস্তুত : প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা বজায় রেখে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করতে হলে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক মাত্রায় বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। বর্তমান ব্যাংকনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে কার্যকরভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য উন্নত দেশগুলোর মতো শেয়ারবাজারকে পুঁজি যোগানের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কোম্পানির শেয়ার ছেড়ে মূলধন বাড়ানোর পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহে পুঁজিবাজারে সহায়ক নীতি ও পরিবেশ জরুরি।

মূলধন যোগানে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ইতিবাচক সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের খেলাপী সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা কঠোর করা গেলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি কমে আসবে। বাড়বে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের প্রবণতা।

ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করে কোম্পানির আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরসি) কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। এই আইনের আওতায় গঠিত ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে রাখতে হবে কঠোর ভূমিকা। এই কাউন্সিল আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে বিদ্যমান দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারলে বৃহৎ কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারমুখী হবে বলে আশা করা যায়।

বর্তমানে ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ দেখায়। এই ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। বড় কোম্পানির জন্য ঋণ সহজলভ্য না করে ব্যাংকিং খাতকে সম্ভাবনাময় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এতে দেশে শিল্প বিকাশের পথ তৈরি হবে। এসব উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ নিয়ে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ধীরে ধীরে বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এ পর্যায়ে তাদের মূলধনের যোগান দেবে পুঁজিবাজার। এভাবে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের পরিকল্পিত ও সমন্বিত অবদানে বিকশিত হবে শিল্প খাত।

রাজু আহমেদ
পুঁজিবাজার বিষয়ক সাংবাদিক
চিফ রিপোর্টার, জিটিভি
(১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিজনেস আওয়ার২৪.কম আয়োজিত সেমিনারের মূল প্রস্তাবনা)

উপরে