ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫


রাজীবরা অভিমানে নিরবে চলে যায়

২০১৮ এপ্রিল ২৩ ০৯:৩৭:২৪

সব দুর্ঘটনাই কষ্টের। সব দুর্ঘটনাই বেদনার। দুর্ঘটনা কেবল কেড়েই নেয়। অপ্রত্যাশিতভাবে হওয়া এই দুর্ঘটনা শব্দটাকেই আমার এখন ভয় হয়। কিছুদিন যাবত সংবাদ মাধ্যমে কাজ করার সুবাদে প্রতিদিনই কোন না কোন দুর্ঘটনার খবর চোখের সামনে চলেই আসে। এসব সংবাদে খুব আহত হই ব্যাথিত হই। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ দেখা মাত্রই মনে হয় এই বুঝি আবার কার হাত পায়ের সাথে কতগুলো স্বপ্নওপঙ্গু হয়ে গেল। এই বুঝি কারো জীবন থমকে গেল!

সড়ক দুর্ঘটনায় স্বপ্ন হারানো হতভাগা তরুণ রাজীবের মত বাপ মা মরা ছেলেরা শুধুমাত্র স্বপ্নকে পুঁজি করেই ধাঁধার শহর ঢাকায় আসে। রাজীবও তেমনি খালার বাসায় থেকে টিউশনি করে লেখাপড়া করছিল। হয়তো দিনগুলো ভালোই চলছিলো। হয়তো স্বপ্ন ছিলো নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছোটভাই দুটোর দায়িত্ব নিবে।

বাবা মা’র দায়িত্ব বা অভাব কিছুটা হলেও ঘোঁচাবে। বেঁচে থাকলে আর কয়টা বছর পরেই রাজীব হয়তো জীবনের পাওনা রংগুলোকেও উপভোগ করা শুরু করতে পারতো। দ্বিতীয় বর্ষেরছাত্র ছিল রাজীব, লেখাপড়াটা শেষ হলেই হয়তো জীবনের ছন্দে ফিরতে পারত।

হঠাৎ যেন একধাক্কায় সবকিছু স্তব্ধ গেল রাজীবের। এতিম ছোট ভাই দুটো আপন আশ্রয় হারালো। কোনকিছুর বিনিময়েই তো ওর ছোট ছোট ভাই দুটোর মমতার আশ্রয়স্থল হারানোর এই ক্ষতি পোষানো যাবে না। এদিন ঘাতক বাসগুলো যেন পন করেই বের হয়েছিল রাজীবের স্বপ্ন ভেঙে দিতে।

নিষ্ঠুর ড্রাইভাররা আর বাড়তে দিলো না রাজীবের স্বপ্নগুলোকে। মৃত্যুর আগে সে নাকি অভিমানে কারো সাথে কথা বলতে চাইতো না, এমনকি ডাক্তারের সাথেও না। কিছু খেতেও চাইতো না। পরে শুনেছি ডাক্তারদের অনুরোধের কারণে তাদের সহায়তা করেছে মাত্র! হাত ছিঁড়ে যাওয়ার পরে সেও হয়তো আর বাঁচতে চায়নি। ওর মত অবস্থায় থেকে সে ইচ্ছে আর থাকতে পারেই বা কয়জন রাজীবের?

রাজীবের মৃত্যু আর দশটা সাধারণ মৃত্যু না ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। কে মারলো ওকে? এই সমাজের কিছু অর্থলোভীদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার বলি হয়েছে রাজীব। প্রতিদিন সড়কে প্রাণ যাচ্ছে, শতশত রাজীব রাস্তায় মারা যাচ্ছে। রাস্তার নাজেহাল অবস্থা যেনতেন গাড়ী, অদক্ষ, অশিক্ষিত ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চলছে। আলু পটল পণ্যের মত এরা মানুষও পরিবহণ করে। ওরা জানে একজন মানুষ মরলেও জরিমানার টাকা দিলেই হয়তো কেস খতম! ওদের টনকও তাই নড়ে না।

সড়কে নিরাপত্তার অধিকার আদায় সংক্রান্ত সংগঠনগুলোও কেমন যেন লোক দেখানো দায়সারা প্রতিবাদ বিবৃতি আর মানববন্ধনের মধ্যদিয়ে দায়সারে। এদের শক্ত কোন আওয়াজ নেই। এরা সড়কে কোন ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলেও সাদরে পদক-টদক পায়! মাঝে মাঝে মনে হয় এরা আসলে ওই কাঠের টুকরোটা পাবার জন্যই এসব সংগঠন খোলে!

অল্পকিছুকাল এই শহরে থাকার অভিজ্ঞতায় রাজীবের হাত ছিঁড়ে নেয়ারমত দুর্ঘটনা ঘটানো বাস ড্রাইভারদের এমন পারাপারি আর রেষারেষির প্রতিযোগিতা আমি অনেক দেখেছি। পাঠকও নিশ্চয় দেখে থাকবেন। ওরা রাস্তায় বের হয় শুধু টাকা কামানোর জন্যই।

তাতে কে মরলো কি মরলো ওসবে তাদের কিছু আসে যায় বলে মনে হয় না। কার আগে কে যাবে, কে যাত্রী নিবে এসবই ওদের একমাত্র ভাবনার বিষয়! হয়তো বাস মালিকেরা বলেই দেয় সব সমস্যা আমি দেখবো! নইলে ওরা এত সাহস পায় কোথায়?

কেন বারবার ঘটে রাজীবদের স্বপ্ন ভাঙ্গার দুর্ঘটনা? গাড়িঘোড়া না থাকলে অন্তত সড়কপথে কোন দুর্ঘটনা ঘটতো না। গাড়িঘোড়া আবিস্কার হয়ে কি তাহলে ভুল হয়েছে? গাড়িঘোড়া তো আর বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। সড়কে মৃত্যুও কি বন্ধ করা যাবে না? আমাদের দেশে রাজীবদের অকাল মৃত্যু কি তবে হতেই থাকবে? এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ি কে? দায়ি কি?

এই শহরে পরিবহন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নৈরাজ্য তো নতুন কিছু না, বহুকাল ধরেই চলছে। বহুকাল ধরেই এদের কাছে নানাভাবে, কারণে বিরক্ত নগরবাসী, জিম্মিও। সবার যেন হাত পা ছেড়ে দিয়ে এক অসহায় উত্তর কি করার আছে । যখন ইচ্ছে ভাড়া বাড়াচ্ছে। সিটিংয় সার্ভিস নাম দিয়ে রমরমা চিটিং নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দেখছে কে? সরকারও মনে হয় তাদের কাছে অসহায়!

ওদের নৈরাজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে রাজীবরা মারা যায়। এই দেশ রাজীবদের না এই দেশতো ওদের মত অর্থলোভি শকুনদের। ভুল করে রাজীবদের এই দেশে জন্মাবার দায় মেটাতে হয় হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। না রাজীবরা যাবার আগে কাউকে অভিশাপ দেয় না। ওরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে সাবধান করে যায়। যেন সড়কে আর কোন রাজীবের মৃত্যু না হয়।

রহিম রুমন
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

উপরে