ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫


খোটার কোটা আর যতকথা...

২০১৮ এপ্রিল ২৪ ১২:৪২:৫৮

সরকারী চাকরীতে সবধরনের কোটা বাতিল ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষনের প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুকে এক বন্ধু লিখেছে। যা মোটামুটি এমন যে, ট্যুরে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে টাকা চাইলাম মা বিরক্ত হয়ে আলমারির চাবিটাই মুখে ছুড়ে দিয়ে বললো যা আছে তুই সব নিয়ে যা!

বাধ্য কোন ছেলের তো ওই টাকা নেয়া উচিৎ হবেই না। বরং মায়ের কাছে বেহায়া হয়ে হলেও ছেলের বলা উচিৎ, না মা তুমি এভাবে বললে আমি কোন টাকাই নিতে পারবো না।

ক্ষুব্ধ হয়ে অথবা অভিমানে, যেভাবেই হোক প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষনার পর ঠিক তেমনি কোটার সংস্কার চাওয়া আন্দোলনকারীদেও বলা উচিৎ ছিলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমারাতো বাতিল চাইনি সংস্কার চেয়েছি আপনি খুশি মনে সংস্কার করে দিন।

কিন্তু আফসোস প্রায় আস্ত একদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর ভাষন বিশ্লেষণ করে বিবৃতি দিতে গিয়ে অবাধ্য ছেলেটা যেন পুরো আলমারি ধরেই নিয়ে যেতে চায়! এমন ঘটনা শুনে পাড়ার লোকে হয়তো বলবে এ কেমন ছেলে রে বাবা!

আশা করেছিলাম আন্দোলনকারীরাও এমন কিছুই বিবৃতি দেবে। বিবৃতিতে অবশ্যই বলবে আমরা বাতিল চাইনি। দেশের জন্য যে কিছু কোটা আজীবন দরকার হয় সেটা আমরা জানি, বুঝি। তবেই না বলা যেত এরা আসলেই মেধাবী। তৈলমর্দনে মেধাবীগিরী না দেখালেও চলতো।

চাকরীতে কোটা কমানোতে অসুবিধে দেখি না কারণ কোন মুক্তিযোদ্ধাই তাঁর ছেলেমেয়ে বা নাতিনাতনির চাকরীর জন্য নিশ্চই দেশ স্বাধীন করতে যাননি। বরং বলা উচিৎ তারাতো এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন, বৈষম্য কমানোর জন্যই যুদ্ধ করেছেন।

একজন সাধারন ছাত্র ও একজন চাকরীপ্রার্থী হিসেবে আমিও কোটা সংস্কারের পক্ষে এবং শুধু সংস্কার না ব্যাপক সংস্কার চাই। তবে কোনভাবেই বাতিল নয়। মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম, নারী, প্রতিবন্দি, উপজাতি এসব ক্ষেত্রে কোটা আজীবন থাকুক সেটাও চাই তবে সেটা অবশ্যই মোট মিলে বিশ পার্সেন্টের বেশি না।

নইলে আমার মত যারা কোন ধরনের কোটার আওতায় পড়েনা এসব শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? কোন ধরনের কোটা আর মামা খালুর সংকটে থাকা আমার মত হাজার হাজার শিক্ষার্থী সরকারী চাকরীতে আবেদনই তো করার সাহস করে না। দয়া করে দায়সারা সমালোচনা করতে গিয়ে রাজাকার ডাকবেন না আমায়। সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি করতে এসেছি আমরা।

সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত দশজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা তাদের নাতি নাতনির সাথে কথা বলেছি, তাদের কেউ কেউ বলছে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে গিয়ে কেউ যেন তাদের করুনা করার দুঃসাহস না করেন। আসলেও তো তাই চাকরী দেওয়া ছাড়াওতো তাদের নানা ভাবেই সম্মানিত করা যায়। দয়া করে সেগুলো করুন।

প্রয়োজনে তাদের ভাতা বাড়িয়ে দিন। অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দিন। ভালো মানের চিকিৎসা সেবা দিন। কোন মুক্তিযোদ্ধাকে যেন আশ্রমে থাকতে না হয় সেদিকে নজর ফেরান। দয়া করে একটা চাকরী দেওয়ার নামে করুনা করে আর অসম্মান করবেন না।

কয়দিন আগে নিউজে পড়লাম একজন সাবেক মেজরের স্ত্রী যে কিনা ছয় শহীদ সন্তানের জননীও, তিনি রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি করছে! তাকে থাকতে হচ্ছে আশ্রমে! সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়া ওই নিউজে একজন মন্তব্য করে বলেছেন মেহেরজান বিবি (ছয় শহীদ সন্তানের জননী) হয়তো আওয়ামীলীগকে পছন্দ করতেন না! এই মন্তব্যকারীর কাছে আমার প্রশ্ন ছিল আওয়ামীলীগ কি স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল? আশানুরূপ উত্তর পাইনি।

একজন ছয় সন্তানের শহীদ জননী যাকে আমি রত্নগর্ভা বলি সে কাকে পছন্দ করবে আর কাকে করবে না সেটার ওপর নির্ভর করে কি তাদের সম্মান করতে হবে? নাকি ওইসব আত্মত্যাগীর পরামর্শ মেনে চলাই আপনার উচিৎ?

বলি কাদেরকে আপনারা সম্মানিত করছেন? বিরোধী বা অন্যকোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক মুক্তিযোদ্ধা হলে কি এদের রক্তের কোন দাম থাকবে না!? এদের কথা ভাববেন না!?

শুনেছি অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তারা হয়তো এসবের লোভ করতে পারেন কারণ তাদের উদ্যেশই তো চুরি করে সম্মানিত সাজা। যদিও সে সম্মানের জৌলুশ থাকে না। যারা টাকা দিয়ে মহান মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিতে এবং নিতে পারে তাদের দ্বারা তো দেশ বিক্রির চেয়ে আরও বহুকিছুই করা সম্ভব।

গর্বের সাথে বলতে চাই একটা চাকরী বা সরকারী কোন সুযোগ সুবিধে পাবার জন্য কোন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা চেয়ে থাকেন না। তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাঁরা মহান তাঁরাই এই জাতির শ্রেষ্ট সন্তান। কোনকিছুর বিনিময়ে তাঁদের ঋন শোধ করার চেষ্টাকে তাই দুঃসাহসই মনে হয়।

সবকিছুতে তো রাজনীতি খোঁজা বা সবকিছু নিয়ে রাজনীতি করার অধিকারই বা আপনাকে কে দিয়েছে? একজন মুক্তিযোদ্ধা আপনার সরকারকে সমর্থন না-ই করতে পারেন। আপনার মতের সাথে তার নাও মিলতে পারে। রাষ্ট্রের যেকোন বেপারে নাক গলানোর অধীকার একজন মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে আর কার বেশী থাকতে পারে?

একজন মুক্তিযোদ্ধা সে যেই রাজনৈতিকদলকে সমর্থন করুক বা না করুক আমার আপনার উচিৎ তাঁদের সামনে মাথাটা নিচুই রাখা।

সবশেষে বলতে চাই, আমার স্বশিক্ষিত মা মাঝে মাঝে একটা কথা বলেন “থালার সাথে রাগ করে মাটিতে ভাত খেতে নেই” অবাধ্য ছেলেটা যখন আলমারির পুরোটাই নিতে চায় বুদ্ধিমান মা হিসেবে সব দিয়ে দিলে হয়তো ওরা গোল্লায় যেতে পারে। মা হিসেবে তাই চাবি না দিয়ে বরং আলমারি থেকে কিছু টাকাই বের করে দিন ছেলেরা আনন্দে ঘুরে আসুক।

পুরো দেশের নাগরিক সমাজের কথা শুনুন। শিক্ষক সমাজের কথা শুনুন তারা সবাই আজ কোটার সংস্কার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সকল নাগরিকের অভিভাবক হিসেবে, সকল চাকরীপ্রার্থীদের অভিভাবক হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের অনুরোধ আপনি মা সুলভ আচরন ও মায়ের মত আদুরে টেকনিকের মধ্য দিয়েই কোটা বাতিল না করে সংস্কারে উদ্যোগ নিন।

রহিম রুমন
শিক্ষার্থী,সাংবাদিকতা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

উপরে