ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫


আইপিওতে সবচেয়ে বড় বাধা সময়ক্ষেপন

২০১৮ মে ০৮ ১০:৫৫:৩৮

১২ বছর বিভিন্ন ব্যাংক ও অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবনের পরে ২০১৩ সালে এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে যোগদান করেন মো: ওবায়দুর রহমান। বর্তমান কর্মস্থলের আগে তিনি ইস্টার্ন ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, লঙ্কাবাংলা ফাইনান্স, জিএসপি ফাইনান্সসহ বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১২ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। যিনি আইসিএসবি থেকে চাটার্ড সেক্রেটারী সনদ অর্জনের আগে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে কর্পোরেট ল ডিগ্রী নিয়েছেন। তিনি শেয়ারবাজার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সু-শাসন এবং অভ্যন্তরীন নিরীক্ষার ওপরে দেশে-বিদেশে নানা গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। তারই নেতৃত্বে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্দেশ্যে চাঁদা গ্রহণ করছে কাগজ খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানি বসুন্ধরা পেপার মিলস। সম্প্রতি বসুন্ধরা পেপার মিলস এবং শেয়ারবাজারের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বিজনেস আওয়ারের স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদ।

বিজনেস আওয়ার : ইস্যু ম্যানেজারদের সহযোগিতায় দূর্বল কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসছে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একজন ইস্যু ম্যানেজার হিসাবে এ অভিযোগকে কিভাবে দেখেন?

ওবায়দুর রহমান : আসলে অভিযোগটা ঠিক না। প্রত্যেক ইস্যু ম্যানেজার সব কমপ্লায়েন্স পূরণ করে একটি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনে। যাতে কোন দূর্বল কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ থাকে না। তবে তালিকাভুক্তির পরে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের অসৎ উদ্দেশের কারনে কিছু কোম্পানি দূর্বল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যদি কোন উদ্যোক্তা/পরিচালক আইপিও ফান্ডের অপব্যবহার করে, টাকা অন্যত্র সরিয়ে ফেলে তার দায়ভার ইস্যু ম্যানেজারের না। কারন কোন উদ্যোক্তা/পরিচালক ভবিষ্যতে এমনটি করবে, তাদের মনের সেই খবর বোঝা কারও পক্ষে সম্ভব না।

বিজনেস আওয়ার : ২০১৭ সালে গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন আইপিও অনুমোদন পেয়েছে। এক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজাররা ফাইল কম জমা দেওয়ায় এমনটি হয়েছে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি। আপনি কি মনে করেন?

ওবায়দুর রহমান : ২০১৭ সালে সুদ হার একক সংখ্যার ঘরে ছিল। আর একটি কোম্পানিকে ‘এ’ ক্যাটাগরি ধরে রাখতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হয়। এদিক দিয়ে শেয়ারবাজারে আসার চেয়ে ঋণ সুবিধাজনক ছিল। এ কারনে কম আইপিও জমা পড়েছে। তবে ২০১৭ সালে যত ফাইল জমা ছিল, তাতেও আইপিওর সংখ্যা ৭টির বেশি হওয়া সম্ভব ছিল।

বিজনেস আওয়ার : সিটি গ্রুপ, আকিজ গ্রপ, বাংলালিংকের মতো বড় কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসছে না। এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে করণীয় কি বলে মনে করেন?

ওবায়দুর রহমান : এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শেয়ারবাজারে আসার সুবিধাগুলো ওইসব কোম্পানিগুলোকে বোঝাতে হবে। এক্ষেত্রে কর রেয়াত সুবিধা, ঋণের মতো সুদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, পরিচিতি বাড়ে ইত্যাদি তুলে ধরতে হবে। যাতে কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হয়।

বিজনেস আওয়ার : বড় কোম্পানিগুলো কি শেয়ারবাজার আসার সুবিধা সর্ম্পক্যে জানে না বলেই আসছে না?

ওবায়দুর রহমান : আসলে কোম্পানির উদ্যোক্তারা ব্যবসায় বুঝে, কমপ্লায়েন্স বুঝে না। অনেক কোম্পানি আছে, যেখানে পেশাজীবী প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নেই, অ্যাকাউন্টস ঠিক নেই ইত্যাদি সমস্যা আছে। কিন্তু শেয়ারবাজারে আসলে অনেক রুলস-রেগুলেশনস, কমপ্লায়েন্স মানতে হয়। যা অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তা মানতে চায় না। যে কারনে তারা শেয়ারবাজারে আসতে অনাগ্রহী।

বিজনেস আওয়ার : এজিএম পার্টির দ্ধারা নাজেহালের ভয়েও অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে চায় না এমন অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?

ওবায়দুর রহমান : এজিএম পার্টির ভয়ে উদ্যোক্তারা তাদের কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে চায় না, এটা ঠিক না। এজিএমে শেয়ারহোল্ডারদের কথা বলার অধিকার আছে। তারা কথা বলবে। কিন্তু কেউ অনিয়ম করলে, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি দেখতে পারে।

বিজনেস আওয়ার : শেয়ারবাজারে ইস্যু আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কি?

ওবায়দুর রহমান : সময়ক্ষেপন সবচেয়ে বড় বাধা। একটি ইস্যু আনতে দেড় থেকে ২ বছর লেগে যায়। এক্ষেত্রে একটি কোম্পানির মোটিভ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ২ বছর পরে কোম্পানির ফান্ডের দরকার নাও লাগতে পারে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো ফাইল জমা দেওয়ার ৩ মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিজনেস আওয়ার : ইস্যু আনতে সময়ক্ষেপনের কারন হিসাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে ইস্যু ম্যানেজারদেরকে দায়ী করা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আপনাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পরে সংশোধন করবেন এমন অপেক্ষায় থাকেন বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে কি বলবেন?

ওবায়দুর রহমান : ইস্যু ম্যানেজারদের কিছু সমস্যা আছে। তারা সব কমপ্লায়েন্স পরিপালন না করেও ফাইল জমা দেয়। তবে ইস্যু ম্যানেজাররা এখন সক্রিয়। তবে ভালো কোম্পানির ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স পরিপালনে কিছুটা শিথীল করা দরকার। এক্ষেত্রে একটি কোম্পানির টেক্স ফাইল দেখলেই বোঝা যায়, কোম্পানিটি কতটা ভালো।

বিজনেস আওয়ার : ইস্যু দ্রুত আনতে করণীয় কি?

ওবায়দুর রহমান : এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও ইস্যু ম্যানেজারদেরকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।

বিজনেস আওয়ার : বসুন্ধরা পেপারের কাট-অফ প্রাইস ৮০ টাকা নির্ধারিত হওয়ার কারন হিসাবে কি মনে করেন?

ওবায়দুর রহমান : এক্ষেত্রে ২টি কারন রয়েছে। একটি ব্র্যান্ড ইমেজ ও অন্যটি বিডিংয়ের সময় শেয়ারবাজারের উর্ধ্বমূখী আচরন। দেখেন বসুন্ধরা গ্রপের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মেঘনা সিমন্টে নিয়মিতভাবে ব্যবসায় ভালো করছে। এছাড়া কোম্পানিটি নগদ ১৫ শতাংশের উপরে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। যা একই গ্রুপের বসুন্ধরা পেপারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আর বসুন্ধরা পেপারের বিডিংয়ের সময় শেয়ারবাজারে নতুন শেয়ারে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। ওই সময় অভিহিত মূল্যের শেয়ারগুলো ১০০ টাকার উপরে লেনদেন হয়েছে। যা বসুন্ধরা পেপারের বিডিংয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিজনেস আওয়ার : বসুন্ধরা পেপারেরর ভবিষ্যত কেমন হতে পারে?

ওবায়দুর রহমান : বসুন্ধরা ভবিষ্যতে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এরইমধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারন ও বিদেশে রপ্তানির পরিমান বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু হয়েছে। এ কোম্পানিটি বর্তমানে বাংলাদেশে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে এবং থাকবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করবে।

বিজনেস আওয়ার : এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেষ্টমেন্ট একসময় আইপিও আনার ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে থাকলেও মাঝে কয়েক একেবারে পিছিয়ে ছিল। এর কারন কি?

ওবায়দুর রহমান : আসলে আমরা এখন মানসম্মত ও বড় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার জন্য কাজ করছি। একটি বড় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার ক্ষেত্রে বড় টিম লাগে এবং অনেক কাজ করতে হয়। যে কারনে আগের তুলনায় আইপিওতে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। তবে আমরা চাই বড় ও ভালো কোম্পানিকে আনতে। সেই ধারাবাহিকতায় ওয়ালটনকে শেয়ারবাজারে আনার জন্য কাজ করছি।

বিজনেস আওয়ার : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ওবায়দুর রহমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

উপরে