ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫


বিয়ের পরেও প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে আমার ছোটবোন

২০১৮ মে ১৬ ১৬:৪৪:৫৯

আজও এক অবহেলিত শ্রেণিরই নাম 'নারী'।শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে নারীর জয়ডঙ্কা ধ্বনিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নারী আজও পিছিয়ে। এমনই একটি অভিজ্ঞতা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো আজ।

বলতে চাই একটি সাধারণ মেয়ের কথা। যে স্বামীর মন রক্ষার্থে নিজের বোনের সাথে ৬-৭ বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে দ্বিধা বোধ করেনি। স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সংসারে অশান্তি হতে পারে তার জন্য নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন নিভৃত গৃহকোণে চোখের জল ফেলে কাটিয়েছে বছরের পর বছর।

তবে সেই পতিব্রতা নারীর যে স্বামী তার কথা আবার উল্টো। তার মতে, কোনো ভদ্র ঘরের মেয়েরা ঘর থেকে বের হয় না। পতিদেবতার এই উক্তি ঐশ্বরিক বানী মেনে সেই নারী ৯ বছর স্বামীর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে, স্বামীর ভুল ও অন্যায় লুকানোর জন্যই তার ব্যস্ততা।

তবে সেই বাঙালি বা বাংলাদেশি বধূ এভাবে ৯ বছর মারধর খেয়ে ওই একই ঘরে থাকার পর জানতে পারে, তার স্বামীর একাধিক নারীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তারপরেও যেন স্বামীর অপমান না হয়। সমাজের চোখে ছোট হয়ে না য়ায়। সেই দিকেই চেষ্টা তার আপ্রাণ। সেই নারীকে বাঙালি নাকি বাংলাদেশি নারী ডাকবো তা নিয়ে আছি সিদ্ধান্তহীন।

একাডেমিক শিক্ষায় তার স্বামী বৈমানিক হতে পেরেছেন। কিন্তু নৈতিকতা শিখতে পারেননি বিন্দুমাত্র। তার স্বামী তাকে বিয়ের আগেই আরেকটি বিয়ে করেছিল। কিন্তু তার স্বামী তাকে এবং তার পুরো পরিবারকেই অন্ধ বানিয়ে বোঝাতে সক্ষম হলো ওই মেয়ে তার গরিব খালাতো বোন, অসুস্থ মাকে দেখাশুনা করার জন্য মেয়েটিকে তার বাসায় রাখা। চুল পরিমাণ কেউ বুঝতে পারেনি এত নিখুঁত খেলা। যখন কয়েক মাস পর হাতে-নাতে ধরা পড়লো, তখনও সমাজের কটাক্ষ চোখ থেকে বাঁচার জন্য মাফ করে দিলেন তার সেই স্বামীকে।

এখানেই শেষ নয়, পাইলট পেশার ছায়াতলে যেকোনো মেয়েকে তার জন্য যোগাড় করাটা খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়। আর যদি মেয়েদের কাছে একটু ইনিয়ে বিনিয়ে চোখে দু'ফোঁটা জল এনে বলে, দাম্পত্য জীবন দুর্বিষহ , কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই, কয়েকদিনের মধ্যে ডিভোর্সও হয়ে যাবে। তাহলে তো এক শ্রেণীর মেয়েরা নিজেকে রানী ভাবতে শুরু করে দেয়।

তথ্য কতটুকু সত্য না মিথ্যা তা পর্যন্ত যাচাই করার প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু শরীর বিলিয়ে দেয়ার জন্য তৈরি। আচ্ছা বলুনতো, নিজেদের এত মূল্যহীন কেন ভাবেন! শর্টকাট এ নিজের জীবন গোছানো পেতে গিয়ে নিজের বিবেকের সাথে কতো তা বেঈমানি করছেন তার কি কখনো হিসেব নিকেশ করেছেন কখনো?

যে নারীর কথা এতক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে বললাম, সে বেশী দূরের কেউ না, আমারই আপন বোন। চ্যালেঞ্জ নিয়ে আপনাদের ভালোবাসায় আমি যতোটুকু শক্ত হয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস আনতে পেরেছি। আমার বোন তা পারেনি। আর তাই তিলে তিলে ধুঁকে ধুঁকে নিজেই শেষ হয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। আর আমরা নিষ্প্রাণ হয়ে শুধু দূর থেকেই দেখছি, কিছুই করার অধিকার নেই আমাদের। কারণ এই পতিব্রতা নারীর কাছে আমরা তো বড়ই অসহায়।

তবে, সবশেষ যখন তার স্বামী প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতনের পর বাসা থেকে চলে যায় এবং অন্য মেয়ের সাথে থাকা শুরু করে, তখন সে পল্লবী থানাতে এফ আই আর করতে গেলেও থানার কর্মরত কর্মকর্তারা যথেষ্ট প্রমাণ নেই- এই কারণ দেখিয়ে অভিযোগ আমলে নেননি।

পরবর্তীতে আমি প্রেস কনফারেন্স করে বিষয়টি সবার সামনে আনার কথা বলি। কিন্তু আমি বা আমরা আবারো হেরে যাই, তার জেদের কাছে। তার জেদ, তার স্বামীকে বাঁচানোর জেদ, তার স্বামীর নাম রক্ষার জেদ। তার সেই স্বামী, যেই স্বামী তাকে প্রতিদিন খুন করছে নতুন করে, প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে চলেছে তার নারীত্বকে!

আমার বোনকে তার স্বামী এমনভাবে গত নয় বছরে তৈরি করেছে যে, তার বাসায় কোন ইন্টারনেট ছিল না, এখন পর্যন্ত আমার বোনের হাতে কোনো স্মার্ট ফোন নেই। সে জানে না, কিভাবে গুগল করতে হয়, কিভাবে ফেসবুক চালাতে হয়, কিভাবে একটা অ্যাপ ডাউনলোড করতে হয়। আমার বোনকে অজ্ঞ রাখরতে ক্রিমিনাল ট্রেনিং- পুরোপুরি ব্যবহারে সক্ষম হয়েছে (বোনের স্বামী প্রাক্তন বিমান বাহিনী কর্মকর্তা এবং বর্তমানে পাইলট হিসেবে কর্মরত আছেন)।

যাহোক, উনি যে পরনারীর প্রতি আসক্ত বা শারীরিক সম্পর্ক করছেন, তার বিন্দুমাত্র আন্দাজ ছিল না আমার বোনের। কিন্তু দেখুন প্রকৃতির কি নির্মম পরিহাস, যেই মেয়ের সাথে প্রেমের অভিনয় করে, তার শরীর ভোগ করার পর তাকে ছেড়ে দিয়ে আবার অন্য মেয়ের কাছে চলে যায়, সেই মেয়েরাই আবার ফোন করে আমার বোনকে সব তথ্য দিতে থাকে।

কিন্তু তার স্বামী বরাবর অস্বীকার করে আসে আর মারধর করতে থাকে। গত ৫ মে আমার বোন ভাবীকে নিয়ে ধানমন্ডি স্টার কাবাবে চা খেতে গেলে, মেয়ে সহ তার স্বামীকে হাতে নাতে ধরে ফেলে। সেই নাটক দেখেছে রেস্টুরেন্ট সহ অত্র এলাকা। বোনকে ঐ মেয়ে জানায়, একবছর পর তাদের বিয়ে করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিজের স্ত্রীকে অগ্রাহ্য করে ঐ লোক ব্যস্ত হয়ে যায় উনার প্রেমিকাকে সামলাতে এবং মানাতে। অথচ, এই একইলোক বাসায় তার স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত বলতেন হাদিস পড়তে, তাদের একমাত্র সন্তানকে হাদিস শোনাতে।

পরবর্তীতে ঐ লোকের পরিবারকে এইসব ঘটনা জানানো হলে, আমার বোন ঠিকমত রান্না করতে পারেনা, এই দোষে সাব্যস্ত করে উনাদের পুত্রকে শাসন না করে ,পুরোপুরি সমর্থন করেন।

আর সমাজ? সমাজের দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। সমাজ তো আমরাই। আজ সমাজে আমার বোন এর মতো মানুষেরা ঘটনাগুলো ঘটতে দিচ্ছে বলেই নারীর দুর্বলতা বাড়ছে, কটাক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ও বাড়ছে। হ্যাঁ, স্বীকার করছি সবার মনোবল সমান নয়, সবার যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষমতাও সমান নয়।

সেই ক্ষেত্রে নিজের আবেগের থেকে নিজের বিশ্বস্ত মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। আমি বিশ্বাস করি কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ থাকেই কথা শোনার, পাশে থাকার , সাপোর্ট করার, আর তার জন্য মনের দরজা খোলা রাখা জরুরি।

Data Protection Rules এর কারণে আমি কারও নাম উল্লেখ করিনি। Consent & Proof ছাড়া কারও নাম বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা আইনগত নিষিদ্ধ। আমার এতগুলো কথা বলার কারণ হলো, অন্যান্য সাধারণ মেয়েদের সচেতন করে দেয়া আর সাথে, আমার যদি কখনো কিছু হয়ে যায়, পরবর্তীতে এই স্টেটম্যানটি হয়তো কোনো কাজে লাগতেও পারে। তবে, দুঃখ থেকে যাবে, আমি আমার বোনকে শক্ত করতে পারিনি। বাস্তবতার কাছে আগেই হার মেনেছে এই বাঙালি অথবা বাংলাদেশি নারী।

(লেখক: পাইলট মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি
বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আইরিশ​ মডেল-অভিনেত্রী, সাবেক মিস আর্থ ও মিস আয়ারল্যান্ড)

বিজনেস আওয়ার/১৬মে/এমএএস

উপরে