ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫


নির্মাণে বঞ্চিত এক প্রজাতির নাম 'সহকারী পরিচালক'

২০১৮ মে ১৭ ১৫:৪০:০৮

শিশির আহমেদঃ আমাদের দেশে দৃশ্যমাধ্যমের অন্যতম প্রয়োজনীয় কিন্তু দুর্দান্ত নিগৃহীত প্রজাতির নাম সহকারী পরিচালক। এক অনিশ্চিত জীবন যাত্রার প্রতীক তারা। তবুও তারা ছুটে চলেন স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার অদম্য নেশায়। চোখে চিত্রের কারুকাজ দেখতে দেখতে পাড়ি দেন অমসৃণ পথের শরীর।

যেকোনো শ্রমিক জানে যে একটি নির্দিষ্ট শ্রমঘন্টা পর সে মজুরি পাবে কিন্তু একজন সহকারী পরিচালক সম্মানী হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেন না তিনি মজুরি পাচ্ছেন কিনা! এই সম্মানী পেতেও তাকে প্রায়ই চূড়ান্ত অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়। সহকারী পরিচালককে টাকা দিতে এলেই কেনো যে বাজেটে সমস্যা হয় পরিচালক বা প্রযোজকের তা এক গভীর রহস্য বটে!

সবারই ঘরের কোনো বা বাড়িতে একটা ছোট্ট ঝুড়ি থাকে উচ্ছিষ্ট জমানোর জন্য, ঠিক তেমনি একটি নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণ পর্বের সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, রাখার জায়গা সহকারী পরিচালক।

একজন সহকারী পরিচালককে পরিচালক থেকে শুরু করে অভিনয় শিল্পীসহ ব্যবস্থাপনা সহকারীরও নাজেহালের শিকার হতে হয়। সহকারী পরিচালকেরা যেনো জড়পদার্থ, তাদের মন নেই, নেই ভালো লাগা, মন্দ লাগার মতো অনুভূতি।

অথচ আজকালকার বেশিরভাগ পরিচালক; বিশেষ করে বাজার কাটতি পরিচালকদের অধিকাংশই নামেমাত্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের নির্মাণের সবকিছুই নির্ভর করে সহকারী পরিচালকদের উপর।

সহকারীদের দিয়ে নাটক-টেলিছবি বানিয়ে চ্যানেলে তা চালান নিজের নামে। তবুও কৃতজ্ঞ হতে পারেন না তারা। দিতে পারেন না সহকারীদের ন্যায্য পাওনা বা সম্মান। অনিয়মের এইসব রাজ্যে কেউ তাকিয়েও দেখে না। কোনো সাংবাদিকের কলমও প্রবেশ করে না এই পথে। টেলিভিশনে মানহীন গল্প-নাটক নিয়ে অনেক কথা হয় দর্শক বিমুখতার কারণ হিসেবে। সেখানে এই বিষয়টিও যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সেটি ভাবারও সময় হয় না কারো!

তবে এ কথা সত্যি। সবখানেই ব্যতিক্রম থাকে। এখানেও আছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেখেছি অনেক পরিচালক ও প্রযোজক আছেন যারা তাদের সহকারী পরিচালককে ভালোবেসেছেন দৃষ্টান্ত তৈরি করার মতোই। তাদের জন্য শ্রদ্ধার কমতি নেই সহকারী পরিচালকদের।

গণমাধ্যমও এড়িয়ে চলে তাদের, কারণ তাদের নিয়ে সংবাদ লিখলে তাতে লাভের অংক শূন্য। ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজন বিনোদন সাংবাদিক বড় ভাই, বন্ধুদের বলেছিলাম সহকারী পরিচালকদের নিয়ে কিছু লিখুন। কিন্তু তার প্রতিফলন আজ পর্যন্ত প্রসব হয়নি। সবাই মুখ বাকিয়ে হেসে আশ্বস্ত করেছেন। কারণ খুব স্বচ্ছ-আগেই বলেছি, লাভ নেই, নিউজে তথাকথিত হিট নেই।

গত ২৯ জুলাই ও ৫ আগস্ট বেশ কয়েকজন সহকারী পরিচালক মিলিত হয়েছিলাম বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বরের সবুজ গালিচায়। সবার অভিজ্ঞতাই প্রায় অভিন্ন। একটি নাটক নির্মাণের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে চ্যানেলে প্রদর্শনী পর্যন্ত একজন সহকারী পরিচালককে শ্রম দিতে হয় শারীরিক এবং মানসিকভাবে- সেখানে একজন সহকারী পরিচালককে কী পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয় তা জানলে যেকোনো সুস্থ্য মানুষ অস্বস্তিতে ভুগবেন। কিন্তু আমাদের অভিভাবকদের (পরিচালকদের) সে বিষয়ে কোনো ভাবনাই নেই।

অভিজ্ঞতায় এমনও দেখা গেছে, শুটিং শেষে পরিচালক নিজে অভিনেতা/অভিনেত্রীর গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। কিন্তু সহকারী কীভাবে গভীর রাতে বাসার ফিরবেন তা অনুচ্চারিতই থেকে গেছে।

আমার নিজেরও এমন দিন গেছে, রাত তিনটায় শুটিং শেষ, রাস্তা ও পকেট দুটোই ফাঁকা। অবশেষে উত্তরা থেকে হেঁটে বাসায় ফিরেছি। ২০১৬ সালে কাজ শুরু করার পর ঈদের দিন বিকেল পর্যন্ত নাটক সম্পাদনার সাথে থেকে বিকেলে মানিব্যাগে লুকানো টাকা দিয়ে বাসায় ফিরেছি।

২০১২ সালে একজন পরিচালককে একজন শিল্পনির্দেশক নিয়ে দিয়েছিলাম। সেই শিল্পনির্দেশকের টাকা আমাকেই শোধ করতে হয়েছে ২০১৪ সালে। অথচ সেই নাটকের আমার পারিশ্রমিক আজও পাইনি। দেখা গেলো কাজ শেষ, পরিচালক বললেন, প্রযোজক টাকা দিলেই তোমাকে ফোন দিব। ফোন আর আসেনা কিন্তু অন্য সহকারী নিয়ে সেই পরিচালক ঠিকই কাজ ও কামে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফোন দিলে ফোন ধরেন না, ম্যাসেজ দিলে রিপ্লাই মেলেনা। দেখা হলে কখনোই পরিচয় ছিলোনা এমন ভান করে এড়িয়ে চলেন।

আমি নিজে বাবা মায়ের সাথে থাকি বিধায় বেঁচে গেছি। কিন্তু এমন অনেককেই দেখেছি- দেখছি বাসাভাড়া দিতে না পেরে রাস্তায় রাত কাটাতে। অথচ, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে পরিচালককে ফোন দিতে দিতে তার ফোনের চার্জই শেষ। পরিচালক বড় ভাইয়ের থেকে টাকা নিয়ে প্রেমিকাকে জন্মদিনে উপহার দিয়ে চমকে দেবার তাড়নায় সারারাত নির্ঘুম কাটানো সহকারী পরিচালক নিজেই চমকে উঠেছে সেই বড় ভাইয়ের অমায়িক অভদ্র আচরণে।

এক অনিশ্চিত, হতাশাচ্ছন্ন জীবনের কঠিন আদরে অনকের দৃশ্যকারিগর হবার স্বপ্ন অকালেই ঝড়ে যায়। আমরা যারা চিত্রনির্মাতা হবার স্বপ্ন নিয়ে আসি তারা হয় মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত থেকে। আর এই শ্রেণিসমাজের ছেলেটি যখন দৃশ্যমাধ্যমে আসে তখন কিন্তু তার পরিবার ও সমাজ থেকে দূরে চলে যায়। কারণ ওই শ্রেণিসমাজটি নানাবিধ কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামি দ্বারা আক্রান্ত। ফলে, রোগে-শোকে তারা হয়ে উঠে আরো অসহায়।

২০১১ থেকে ২০১৬; এই দীর্ঘ সহকারী পরিচালকের জীবনে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি তা আমাকেও হতাশাচ্ছন্ন করে তুলেছে বারবার। কিন্তু আমি টিকে আছি আজও। নিজে পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। নিজে নাটক লিখছি। চেষ্টা করছি ভালোবাসার জায়গাটিতে টিকে থাকার।

গ্রামীণ যাত্রাপালার সহকারী পরিচালক হিসেবে যে পথচলা শুরু ২০০৬ সালে তা সেই স্বপ্ন আজ আমি বিস্তৃত করেছি বৃহত্তর পরিসরে। আমি থেমে যাইনি, অনেকেই এভাবেই বেড়ে উঠে। কিন্তু তার থেকেও বেশি সংখ্যাটাই হারিয়ে যায় এই অসুস্থ্ বাস্তবতায়।

অনেক সহকারী পরিচালক আছে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নামীদামি সব নির্মাতার নাম চলে আসবে যারা তাদের ঠকিয়েছেন দিনের পর দিন। নিজে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করেছেন ওই সহকারীর ঘাম বিক্রি করে।

২০১৪ সালে এক পরিচালক যে কিনা আমার ছোটভাই ছিলো এবং আমার দ্বিতীয় সহকারী হিসেবে তাকে কাজে নিয়েছিলাম। সে পরিচালক হয়ে আমাকে ঠকিয়ে গেল। যাতে তার নাগাল না পাই ফেসবুকে ব্লক করে দিলো, ফোন নং বদলে ফেললো, ঠিকানা পরিবর্তন করে চলে গেলো অন্য কোথাও। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সেই সুমহান বাটপারকে আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয়নি।

এইসব উদাহরণ মাত্র। প্রতিটি সহকারী পরিচালকের হৃদয়ে এরচেয়ে বড় বড় ক্ষত স্তরে স্তরে সাজানো আছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এইসব নষ্ট আচরণ দেখে দেখে একজন সহকারীও যখন পরিচালক হয়ে যায় তখন সেও একই আচরণ করে তার সহকারীদের উপর। এভাবেই সময়ক্রমে বয়ে চলছে এই অসুস্থ্যতা; বলা চলে বংশ পরম্পরায়। আর এটাই বড় বেশি হতাশার অভিনয় শিল্পের জন্য।

আরো এক হতাশার কথা বলি। গেল ২২ জুলাই ডিরেক্টর’স গিল্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অনেকেই অনেক কথা বলে বেড়িয়েছেন। নানা রকম চাকচিক্যে ভরপুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাদের কেউ হেরে গেছেন। কেউ দায়িত্বে এসেছেন নতুন নেতৃত্ব নিয়ে।

কিন্তু সেখানেও সহকারী পরিচালকদের নিয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করা হয়নি। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থী এমনকি নির্বাচনের ইশতেহারেও সহকারী পরিচালক শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তাদের জীবন বাস্তবতা নিয়ে কারো ইশতেহারেই একটি শব্দ চোখে পরেনি।

তারমানে এই নিগৃহীত প্রজাতি এভাবেই বেড়ে উঠুক। জায়গাটা অসুস্থ্যই থাকুক যুগের পর যুগ- বিষয়টিকে এভাবেই নেওয়া হয়েছে। সম্মানিত পরিচালকবৃন্দ, আপনারা সহকারী পরিচালকদের অভিভাবক- আশ্রয়দাতা।

আপনারা যদি তাদের সাথে এই আচরণ অব্যাহত রাখেন তাহলে একটি সুস্থ্ শিল্পজগত কখনোই গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আর আপনাদের আদর্শ বা চেতনাও যে শিল্প বান্ধব নয় সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠে। বৈষম্য রেখে সিস্টেম পরিবর্তিত হয় না।

হিরোশিমা, নাগাসাকিতে এখনো অসুস্থ্য শিশু জন্ম নেয়। অসুস্থ্য পরিবেশে থেকে কখনোই সুস্থ্য শিল্প সৃষ্টি সম্ভব নয়। আসুন না, আমরা সবাই মিলে একটি সুস্থ্য শিল্পজগত গড়ে তুলি! সময় তো ফুরিয়ে যায়নি। সবে শুরু। ডিরেক্টর’স গিল্ডের মাধ্যমে সহকারী পরিচালকদের ন্যূনতম একটি মানসম্পন্ন সম্মানী নির্ধারণ করে দিন।

তাদের অভিযোগ উত্থাপন এবং সেগুলো সসম্মানে নিষ্পত্তির একটা ব্যবস্থা করুন। প্রাথমিক অবস্থা থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন। একটি সুস্থ্ সংস্কৃতি বিনির্মাণে সুস্থ্ নির্মাতা উঠে আসুক। শিল্পের চাষাবাদ হোক শৈল্পিক উপায়ে। শিল্প হোক মানবিক উপায়ে নির্মিত মনুষ্যত্ববোধ সৃষ্টির অন্যতম হাতিয়ার। সবাই ভালো থাকুন। ভালো থাকুক আমাদের শিল্পচর্চার প্রিয় আঙিনা।

বিজনেস আওয়ার/১৭মে/এমএএস

উপরে