ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


মূল্যসূচকে বিরুপ প্রভাব ফেলছে নতুন কোম্পানি

২০১৮ মে ২০ ১৩:৩০:০৮

রেজোয়ান আহমেদ: আকর্ষণীয় আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল করে শেয়ারবাজার থেকে প্রতিনিয়ত অর্থ তুলছে নতুন নতুন কোম্পানি। তবে এসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরেই তাদের আর্থিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমে গিয়ে বাজারের মানদণ্ড নির্ধারক মূল্যসূচকে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। এছাড়া নতুন কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনের শুরুতে অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম চাহিদা থাকলেও তা পরবর্তীতে কমে যাওয়ায় বিরুপ প্রভাব পড়ছে।

বিজনেস আওয়ারের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভূক্ত হওয়া ৬৪ শতাংশ কোম্পানিই মূল্যসূচকে বিরুপ প্রভাব ফেলেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসূচকে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিএসইর সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক নিজাম উদ্দিন জানান, একটি কোম্পানি ডিএসইএক্স সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরে যদি শেয়ারের দাম কমে যায়, তাহলে ওই কোম্পানি সূচকে বিরুপ প্রভাব ফেলে। ঠিক একইভাবে শেয়ারের দাম বাড়লে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি যে দাম নিয়ে অন্তর্ভূক্ত হয়, সে তুলনায় কমেছে নাকি বেড়েছে তা বিবেচনায় আসবে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভূক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১২টি ২০১৬ সালে ও ২টি ২০১৭ সালে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স সূচকে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ১০টি কোম্পানি, ২৪ জুলাই ও ২৩ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল ও ২২ অক্টোবর একটি করে কোম্পানি অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

এই ১৪টি কোম্পানির মধ্যে ৯টি বা ৬৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অন্তর্ভূক্তিকালীন সময়ের তুলনায় নিচে নেমে এসেছে। যা ডিএসইএক্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আর বাকি ৫টি বা ৩৬ শতাংশ কোম্পানি সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

মূল্যসূচকে অন্তর্ভূক্ত হওয়া নতুন কোম্পানিগুলো হল- প্যাসিফিক ডেনিমস, বিবিএস কেবলস, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল, কেডিএস এক্সেসরিজ, আমান ফিড, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, জাহিন স্পিনিং, হামিদ ফেব্রিকস, ন্যাশনাল ফিড, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিষ্টেমস ও একমি ল্যাবরেটরিজ।

নিম্নে কোম্পানিগুলোর সূচকে অন্তর্ভূক্তিকালীন সময়ের ও চলতি বছরের ১৭ মে’র শেয়ার দর তুলে ধরা হল-

কোম্পানির নাম

অন্তর্ভূক্তকালীন দর

১৭ মে’র দর

ব্যবধান

সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল

১২.২০

৬.৫০

(৪৭%)

জাহিন স্পিনিং

২১.৭০

১১.৬০

(৪৭%)

বিবিএস কেবলস

১৩৪.৪০

৭৮.৮০

(৪১%)

প্যাসিফিক ডেনিমস

২৫.৯০

১৬.৮০

(৩৫%)

ন্যাশনাল ফিড

২০.৯০

১৪

(৩৩%)

খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ

২১.৪০

১৬

(২৫%)

কেডিএস এক্সেসরিজ

৭৪.৭০

৫৮.৬০

(২২%)

তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ

১৯.৩০

১৮

(৭%)

একমি ল্যাবরেটরিজ

৯৭.৫০

৯৭.২০

(০.৩১%)

ডরিন পাওয়ার

৬১.৫০

১০৪.৮০

৭০%

ইউনাইটেড পাওয়ার

১৬০.২০

২২৩.২০

৩৯%

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড

২৫.৪০

৩২.২০

২৭%

আমান ফিড

৪৩.১০

৫৪.৫০

২৬%

হামিদ ফেব্রিকস

২০.৮০

২৫

২০%

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএসইর মূল্যসূচক গণনা করা হয় ফ্রি ফ্লট ভিত্তিতে। একটি কোম্পানির যে পরিমাণ শেয়ার বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন হয় তাই ফ্রি ফ্লট। অর্থাৎ স্পন্সর, পরিচালক, প্লেসমেন্ট, ক্রস হোল্ডিং (একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকা শেয়ার), স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগকারীর শেয়ার বা অন্য কোনভাবে লকিং থাকা শেয়ার সূচক গণনায় বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তারা বলছেন, যেহেতু সূচক গণনা করা হয় ফ্রি ফ্লট ভিত্তিতে, তাই একটি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন যত বেশিই হোক ওই কোম্পানির শেয়ারের মূল্যের ভিত্তিতে সূচকে বড় ধরণের উত্থান-পতন হয় না। তবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন যাই হোক এর শেয়ারের দাম কমা অথবা বাড়ার ওপর সূচকে কিছু না কিছু প্রভাব পড়বেই।

তাদের মতে, শেয়ারবাজারে তালিকাভূক্তির আবেদনের সময় কোম্পানিগুলো আকর্ষনীয় আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করছে। কিন্তু তালিকাভূক্তির পরেই তাদের আর্থিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদনের সময় সঠিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে কিনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বিজনেস আওয়ারকে বলেন, যদি ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সূচকে অন্তর্ভূক্ত হয়েই ৬৪ শতাংশ কোম্পানি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটা শেয়ারবাজারের জন্য দুঃখজনক। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। একইসঙ্গে আইপিও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বিজনেস আওয়ারকে বলেন, যেকোন কোম্পানির শুরুতে ইস্যু মূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ দরে শেয়ার লেনদেন হয়। এটা একটা সাংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরী হওয়ায় এমনটি হয়। যা ঠিক না। আর এই অস্বাভাবিক চাহিদা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন দর কমতে থাকে। যাতে মূল্যসূচকে বিরুপ প্রভাব পড়ে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক রিসার্চ কর্মকর্তা মো. বখতিয়ার হাসান বিজনেস আওয়ারকে বলেন, সূচকে অন্তর্ভূক্ত যে কোন কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেই সূচকে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে নতুন তালিকাভুক্ত হওয়ার অধিকাংশ কোম্পানিই সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে কোম্পানিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের নতুন নতুন কোম্পানি আনতে হবে। তবে ভালো কোম্পানির বদলে খারাপ কোম্পানির বাজার থেকে টাকা তোলার সুযোগ দিলে তা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইপিও অনুমোদন দেওয়ার সময় সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বিজনেস আওয়ার/২০ মে, ২০১৮/আরএ

উপরে