ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

প্রয়োজন সংশোধন

কতটা ফেয়ার হচ্ছে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ব্যবহার!

২০১৮ আগস্ট ০৫ ১০:৩১:৩৮

রেজোয়ান আহমেদ : বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারনে এরইমধ্যে কোম্পানিগুলো ও যোগ্য বিনিয়োগকারীরা কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েছে। এ পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসতে চাওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর যোগ্যতার তুলনায় বেশি করার জন্য এই কারসাজি করছে। এবং এক্ষেত্রে সফল হচ্ছেন কারসাজিকারীরা। যাতে বুক বিল্ডিং চালুর আড়াই বছরের মধ্যে আবারও পদ্ধতিটি বিতর্কের মুখে পড়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অবহিত হলেও তা নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে উচ্চ কাট-অফ প্রাইস নির্ধারনে সহযোগিতার জন্য কোম্পানিগুলো আগে থেকেই যোগ্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগসাজোশ করে। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো যোগ্য বিনিয়োগকারীদেরকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ারও অভিযোগ আছে। যা বুক বিল্ডিং পদ্ধতির কিছু দূর্বলতার কারনে করা এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর জন্য বুক বিল্ডিং সিষ্টেমস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অপব্যবহার হচ্ছে। আর এই অপব্যবহার রোধে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে যোগ করেন। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম (এফসিএমএ) বিজনেস আওয়ারকে বলেন, চলমান বুক বিল্ডিংয়ে বুক বিল্ডিং সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এটি সংশোধন করা না হলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হবে। তাই শেয়ারবাজারের স্বার্থে অবশ্যই এটি সংশোধন করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, বিডিংয়ের কাট-অফ প্রাইস যে সঠিক হয় না, তা বোঝার আরেকটি সহজ উপায় হল কাট-অফ প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে আইপিওতে শেয়ার ইস্যু। এক্ষেত্রে সহজেই বোঝা যায় কাট-অফ প্রাইস ফেয়ার না। যদি তাই হয়, তাহলে আইপিওতে কেনো ১০ শতাংশ কমে শেয়ার ইস্যু করা হবে।

এর আগে বিতর্কের মুখে ২০১১ সালে এমজেএল বাংলাদেশের পরে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই পদ্ধতিটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

প্রিমিয়ামসহ শেয়ারবাজারে আসতে চাইলে পাবলিক ইস্যু রুলস-২০১৫’তে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই পাবলিক ইস্যু রুলস জারি করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বিডিংয়ে অংশ নেওয়া সবাই কাট-অফ প্রাইসে শেয়ার পাওয়ার অধিকারী। যা একটি কোম্পানির কাট-অফ প্রাইসের যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হিসাবে কাজ করছে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বসুন্ধরা পেপার মিলসের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এ কোম্পানিটিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কারসাজির মাধ্যমে কাট-অফ প্রাইস ৮০ টাকা নির্ধারিত হয়। যা যোগ্যতার তুলনায় বেশি হওয়ায় প্রশ্ন উঠে। এছাড়া যৌক্তিকতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদন্ত করে। তদন্তে নিলামে অংশগ্রহনকারীদেরকে দর প্রস্তাবকারীদের জন্য যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। এরপরে ৮০ টাকা থেকে এর উপরে দর প্রস্তাবকারী যারা মূল্যের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণী ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদেরকে কেনো অযোগ্য ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে বিএসইসি কারন দর্শানো চিঠি দেয়।

এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বিজনেস আওয়ারকে বলেন, কোন কোম্পানির বিডিংয়ে যদি যোগ্য বিনিয়োগকারীদেরকে তার প্রস্তাবিত দরেই শেয়ার নিতে হয় এবং কাট-অফ প্রাইসের নিচে প্রস্তাবকারীদের শেয়ার দেওয়া না হয়, তাহলে যৌক্তিক দর মূল্যায়ন হবে। এছাড়া বিডিং চলাকালীন দর প্রস্তাবের তথ্য গোপন রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ধরেন উদাহরন স্বরুপ একটি কোম্পানির নিলামে ৬০ টাকা থেকে ২০ টাকা দর প্রস্তাব হয়েছে। আর কাট-অফ প্রাইস হয়েছে ৩৫ টাকা। এক্ষেত্রে যদি বিডিংয়ে ৬০ টাকায় দর প্রস্তাবকারীকে ওই দরে শেয়ার নিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে যৌক্তিক দর প্রস্তাব করবে। কারন অন্যরা তার চেয়ে কম দরে শেয়ার পাবে।

এদিকে কাট-অফ প্রাইসের নিচে দর প্রস্তাবকারীকে শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া না হলে সেও যৌক্তিক দরে প্রস্তাব করতে চাইবে বলে মনে করেন মাহবুব এইচ মজুমদার। কারন অন্যথায় সে শেয়ারটি পাবে না। আর শেয়ার পেতে চাইলে যৌক্তিক দর প্রস্তাব করতে হবে।

বিডিংয়ের ৭২ ঘন্টা দর প্রস্তাবের তথ্য গোপন থাকলে অন্যরা প্রভাবিত হবেন না বলে জানান মাহবুব এইচ মজুমদার। এছাড়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষও বিডিংয়ের অবস্থা না দেখার ফলে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আতাঁত করার সুযোগ পাবে না। কারন তারাতো জানবেই না কাট-অফ প্রাইস কি হতে চলেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও কারসাজি থেকে নিজেদেরকে দুরে সড়িয়ে নেবেন।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি চালুর পরে এ পর্যন্ত ৪টি কোম্পানি বিডিং সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- আমরা নেটওয়ার্ক, বসুন্ধরা পেপার মিলস, আমান কটন ফাইবার্স ও এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যেকোন কোম্পানির শেয়ার দর বিবেচনায় ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানির শেষ ৫ বছরের ওয়েটেড শেয়ারপ্রতি মুনাফাকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ ৩ মাসের গড় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দিয়ে গুণ করে এই দর নির্ধারন করা হয়। এবং বিএসইসি এই মূল্যায়নের থেকে কম দরে আইপিও অনুমোদন দিতো। তবে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির কাট-অফ প্রাইস যোগ্যতার তুলনায় অনেক বেশিও হচ্ছে।

নিম্নে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ও ফিক্সড প্রাইস মেথডে প্রিমিয়ামে আসা কোম্পানিগুলোর যোগ্যতার তুলনায় দরের তথ্য তুলে ধরা হল। এক্ষেত্রে বুক বিল্ডিংয়ে আসা কেম্পানিগুলোর সঙ্গে একই খাতের এবং সর্বশেস প্রিমিয়ামে আসা কোম্পানিগুলোর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং খাতে নিকট ভবিষ্যতে প্রিমিয়ামে কোন কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায়, অভিহিত মূল্যের কোম্পানির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বস্ত্র খাত:

কোম্পানির নাম

হিস্টোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পদ্ধতিতে শেয়ার দর মূল্যায়ন

কাট-অফ প্রাইস/নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দর

এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট

২৮.২৩ টাকা

৪৫ টাকা

আমান কটন ফাইবার্স

৫৪.১০ টাকা

৪০ টাকা

রিজেন্ট টেক্সটাইল

৩০.৭৭ টাকা

২৫ টাকা

সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ

৩৩.০৬ টাকা

২০ টাকা

তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ

২৮.৪৯ টাকা

২৬ টাকা

শাশাঁ ডেনিমস

৫৩.৮৮ টাকা

৩৫ টাক

তথ্য প্রযুক্তি খাত :

কোম্পানির নাম

হিস্টোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পদ্ধতিতে শেয়ার দর মূল্যায়ন

কাট-অফ প্রাইস/নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দর

আমরা নেটওয়ার্ক

৬০ টাকা

৩৯ টাকা

আমরা টেকনোলজিস

২৪.০২ টাকা

২৪ টাকা

ইনফরমেশন টেকনোলজিস

১০.২৬ টাকা

১০ টাকা

পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং খাত :

কোম্পানির নাম

হিস্টোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পদ্ধতিতে শেয়ার দরমূল্যায়ন

কাট-অফ প্রাইস/নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দর

বসুন্ধরা পেপার মিলস

২২.৩৮ টাকা

৮০ টাকা

খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং

৩৬.২১ টাকা

১০ টাকা

বিজনেস আওয়ার/০৫ আগস্ট, ২০১৮/আরএ

উপরে