ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


আমরা কেন ইতিহাস ভুলে যাই বারবার?

২০১৮ আগস্ট ০৭ ১০:২৯:১১

আমরা কেন ইতিহাস ভুলে যাই বারবার? ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯' এর ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছাত্র আন্দোলন আমরা ভুলে যাই। ৯০'এর স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কথা ভুলে যাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে খেলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের বিক্ষোভ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও যে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল সে কথাও ভুলে যাই।

ছাত্ররা আজ অবধি কোন অন্যায্য দাবি নিয়ে রাজপথে নামেনি কখনও। সময়ের পরম্পরায় তাদের সব দাবি ন্যায়সঙ্গত বলেই তারা যুগে যুগে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছে। শাসক গোষ্ঠি যখনই এধরণের আন্দোলনে বল প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ আরও বহুগুণ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। আর নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই ২০১৮’এর শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরাতো সারা পৃথিবীর বুকেই এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করলো। শুধু সড়ক নয় ব্যবস্থাপনা নয়,

বিচারপতি-মন্ত্রী-সাংসদ-সাংবাদিকসহ সব শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝেই যে গলদ রয়েছে তাও তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই আন্দোলনেও কেন বল প্রয়োগের চেষ্টা করা হলো তবে?

স্বীকার করে নিতে হবে সরকার শুরু থেকে অবশ্যই অনেক কৌশলী ছিলো, সতর্ক ছিলো। পুরো দেশবাসীর সমর্থনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বল প্রয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকারের ছিল না। পুলিশও অনেক ঠান্ডা মাথায় তাদের ভুমিকা পালন করার চেষ্টা করেছে। ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাধারন সম্পাদক কয়েকটি স্পটে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে, এটাও একটা ভাল দিক। তারপরও কেন পুলিশী হামলা করা হলো? ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হামলে পড়লো? ছাত্রদেরকে আরও বেশি উত্তেজিত করা হলো? কে ইন্ধন দিলো হামলাকারীদের?

শিক্ষার্থীদের এই অভিনব আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও অপশক্তি যে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবে তাতো সরকারের হিসেবে থাকার কথা। তাহলে কেন তাদের সব দাবি মেনে নেয়ার ঘোষনায় ছাত্রদেরকে আস্থায় আনতে পারলো না? পারছে না এই জন্য যে তাদের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করার মত ত্বরিৎ গতিতে সরকার আসলে দৃশ্যমান কিছু করতে পারেনি। উল্টো তাদের নামে পুলিশ আর শ্রমিকরা মিলে মামলা করেছে ১১টি।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে মাথায় হেলমেড পরে ছাত্রলীগ নেতাদের হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। শনিবার জিগাতলায় বিজিবি হেড কোয়ার্টারের সামনে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর আবারও হামলে পড়লো দুর্বত্তরা। রীতিমতো রণক্ষেত্র হয়ে ওঠা ওই সংঘর্ষে শতাধিক ছাত্র আহত হলো।

সাংবাদিকদের ওপর আক্রমন চালানো হলো, পেটানো হলো। সরকারের ক্যাডাররাই যে এই হামলা করেছে তাতে সন্দেহ থাকার কোন কারণ নেই। সংঘর্ষের সময় পুলিশের নিরব ভূমিকা সেটাই প্রমাণ করে। রোববারও ফার্মগেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত শিবিরের জঘন্য ষড়যন্ত্র কিশোর-তরুণদের অমিত শক্তির অসাধারন একটা আন্দোলনকে দুর্বল করে দিলো। তারা যে নিরীহ এই ছোট ছোট বাচ্চাদের ওপর ভর করে সরকার উৎখাতের স্বপ্ন দেখছিলো তা বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতার টেলিফোন আলাপের প্রকাশিত অডিও থেকে ইঙ্গিত মেলে।

আন্দোলনের শুরু থেকে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে উস্কানীমূলক বক্তব্য, অশ্লীল শব্দযুক্ত পোস্টার আর নানা ধরণের গুজব ছড়ানো থেকে শুরু করে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির তৎপরতা দৃশ্যমান। বিপরীতে সরকারের অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থকরাও আন্দোলনটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ক্ষুদে ছেলেমেয়েদের ছবি বিকৃতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে অসুস্থ মানসিকতায় নানা উপায়ে।

বাস মালিকরাও এক ধরণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের প্রতি। সারাদেশে অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করে দিলো তারা। বাস মালিক নেতারা বলছেন, নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় তারা রাজপথে বাস নামাচ্ছে না। আন্দোলন তুলে নিলেই না কি বাস নামানো হবে। মুখে তারা যাই বলুক এটা স্পষ্ট যে আন্দোলন তুলে নিতে শিক্ষার্থীদের প্রতি এটা তাদের এক ধরণের আল্টিমেটাম। কারণ টানা এক সপ্তাহের আন্দোলনে লাইসেন্স থাকা কোন গাড়িতো শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর করেনি। তাহলে নিরাপত্তার অজুহাত তারা কেন দেবেন?

ছাই চাপা দিয়ে কখনও আগুন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য, অসংখ্য দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, সঠিক কর্মপন্থা অবলম্বনে শাসক গোষ্ঠিার ধারাবাহিক উদাসীনতা আর বিভিন্ন সেক্টরের অনিয়মের পরিণতি হলো লাখো শিশু-কিশোর-তরুণের মনে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন। তাদেরকে নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নোংরা খেলা দুই পক্ষের জন্যই বুমেরাং হবে, সন্দেহ নেই।

লেখক : মঞ্জুরুল আলম পান্না, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজনেস আওয়ার/০৭আগস্ট/এমএএস

উপরে