ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র

সুন্দরবনের বিনিময়ে কী পাবে বাংলাদেশ?

২০১৮ আগস্ট ১৩ ১৪:৩৮:৫৮

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের অতি নিকটে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনড় অবস্থানে রয়েছে সরকার। ধারাবাহিক আন্দোলন, জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের প্রামাণ্য উপস্থাপন, পরিবেশবিদদের অকাট্য যুক্তি এবং সর্বোপরি প্রবল জনমত সত্ত্বেও এই প্রকল্প পুনর্বিবেচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনায় সারা বিশ্বে যখন জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার শূণ্যে নামিয়ে বন্ধের প্রক্রিয়া তীব্র হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনকে ধংসাত্মক আগ্রাসনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা এই বন দেশের বিস্তৃণ উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। তবে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা দূর্যোগে সুন্দরবন এখন নিজেই বিপন্ন। তার উপর বনের অতি নিকটে নির্মাণ করা হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।

বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি সাধারণভাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নামে পরিচিত হয়েছে। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি’। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) ও ভারতীয় কোম্পানি ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) লিমিটেড যৌথভাবে প্লানটি স্থাপন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে এক সমঝোতা স্মারক সই করেন। ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ আদেশ জারি হয়। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বিপিডিবি ও এনটিপিসি চুক্তি সই করে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর রামপাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

১৮৩৪ একর জমির উপর এই প্রকল্পটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার)। এরমধ্যে বিপিডিবি ১৫ শতাংশ এবং এনটিপিসি ১৫ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করবে। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক ঋণ হিসেবে নেয়া হবে। প্রকল্পের ৫০ শতাংশের মালিক বিপিডিবি এবং বাকি ৫০ শতাংশের মালিক এনটিপিসি।

নানা কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এরমধ্যে প্রথম কারণ হলো সুন্দরবন থেকে এর দূরত্ব। কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বলে সাধারণত কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় না।

খোদ ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইআইএ গাইড লাইন, ২০১০ এ বলা আছে, ‘মেট্রোপলিটন শহর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সংরিক্ষত বনাঞ্চলসহ পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে না। অথচ সেই ভারতীয় প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬৬০ মেগাওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট নির্মাণ করা হবে। দু’টি ইউনিট নির্মাণে মোট সময় লাগবে সাড়ে ৪ বছর। দীর্ঘ এই সময় জুড়ে আশপাশের এলাকা জুড়ে পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদের উপর এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচলের ফলে নদীতে তেল ও বর্জ্য নিঃসরণ ও শব্দদূষণ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বনসহ সুন্দরবনের সামগ্রিক ইকো সিস্টেমের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

সরকারের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদনেও এ ধরনের আশঙ্কা করা হয়েছে (সূত্র: রামপাল ইআইএ,পৃষ্ঠা ২৬৮)।
নির্মাণ পর্যায়ের এই ক্ষতি সাময়িক হলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পর জীবাশ্ম জ্বালানি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিগর্ত বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে মারাত্মক বিপদাপন্ন হবে সুন্দরবনসহ ওই অঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশ। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি)।

সরকারের হিসাবেই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নিঃসৃত হবে। এর প্রভাবে স্থাপনাটির মাত্র ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত সুন্দরবনের উপর যে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা থেকেও এর পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৯০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। শুরুতে এর নেতিবাচক প্রভাব বোঝা যায়নি। কিন্তু এক পর্যায়ে ওই এলাকার ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উচু বিশালাকৃতির পেকান গাছ মরতে শুরু করে।

১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসাবে ফায়েত্তি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার ডাই অক্সাইডের বিষ ক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওকসহ বিভিন্ন জাতের গাছ আক্রান্ত হয়। কমপক্ষে ১৫ হাজার বিশালাকৃতির পেকান গাছ মারা যায় এবং অসংখ্য বাগান ধ্বংস হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা এই ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়ে। ফায়েত্তি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন সালফারডাই অক্সাইড নিঃসরণের প্রভাব এতো মারাত্মক হলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড নিঃসৃত হলে সুন্দরবনের উপর এর কী প্রভাব পড়বেনা তা সহজেই অনুমেয়।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর ফলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনিভূত ছাই ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। (সূত্র: রামপাল ইআইএ,পৃষ্ঠা ২৮৭-২৮৮)।

এই ছাই বাতাসে উড়ে, ছাই মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নীচে ও নদীর পানিতে মারাত্মক দূষণ ঘটাবে। আরেকটা বড় ঝুকি হলো, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় কিংবা অন্যকোন কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ছাই মিশ্রিত পানি সুন্দরবনের নদীতে ও পরিবেশ ছড়িয়ে যেতে পারে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা আমদানি করা হবে। এসব কয়লা সমুদ্র পথে ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা হবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রথমে মংলা বন্দর এবং পরে সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিতে হবে। ফলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রায় সারা বছর ধরে হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করবেনা যা সামগ্রিকভাবে বনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাই (রামপাল ইআইএ, পৃষ্ঠা ২৯৩-২৯৪) এ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে।

দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সরকার ‘রেড’ ক্যাটাগরির শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করেছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান শুধু শিল্প এলাকা বা কোনো ফাঁকা জায়গায় স্থাপিত হতে পারে। সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুন্দরবনের চারদিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করেছে।

প্রজ্ঞাপনে এ ধরনের এলাকায় প্রাণী বা উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী সব কর্মকান্ড কার্যকলাপ, ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন কর্মকান্ড, মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকারক সব রকম কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়া ২০১০ সালে সুন্দরবন এলাকার পশুর নদীসহ সুন্দরবনের বেশ কিছু জলাভূমিকে ‘বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করে। পরিবেশগত সংকটাপণ্য হিসেবে চিহ্নিত এলাকার ৪ কিলোমিটার দূরে এই যুক্তিতে প্রকল্পের পক্ষের লোকেরা বলছেন, এটি সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর হবে না।

সুন্দরবন বিশ্বের বিপন্ন জলজ ও স্থলজ প্রজাতির বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একটি নিরাপদ আবাসস্থল। শুমারি অনুযায়ী এখানে বাঘের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪৫০ থেকে হ্রাস পেয়ে ১০০ এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। সুন্দরবনে ৩৩৪টি উদ্ভিদ প্রজাতি, ১৬৫ প্রজাতির শ্যাওলা গুল্ম, ১৩টি প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে ৬৯৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

এ ছাড়া ৮টি প্রজাতির উভয়চর প্রাণী, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া এবং নানা প্রজাতির মলাস্কা। স্থানটি বিরল প্রজাতির পাখিদের একটি অভয়ারণ্য। সর্বাধিক আকর্ষণীয় পাখির প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ৩১৫ ধরনের জলকুক্কুট, র‌্যাপ্টার্স, ৯টি প্রজাতির মাছরাঙ্গা, ম্যাগনিফিসেন্ট সাদা পেটের সমুদ্র ঈগলসহ জানা-অজানা বন্যপাখি। এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে বিপন্ন হবে এসব বন্য পাখি-প্রজাতি।

রামপাল প্রকল্প নিয়ে ২০১২ সালেই রামসার ও ইউনেসকো সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ প্রকল্পের ওপর দেয়া মতামতে পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছে, ‘রামসার এলাকায় সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ওপর এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্ষতিকারক প্রভাবের ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন।’ বন বিভাগও এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ২০১১ সালে প্রদত্ত পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক সরকারকে বলেছেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সুন্দরবনের বাঘ তথা জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সরকারকে জানিয়েছে, ‘কয়লাবাহী জাহাজ চলাচলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে।‘ পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই থেকে সালফার ডাই-অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। একই সঙ্গে অ্যাসিড নিঃসরণের কারণে ভূমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পাবে। বায়ুদূষণকারী উপাদানগুলো মেঘের মাধ্যমে ছড়াবে। নাব্যতা হ্রাস পাওয়া পশুর নদীর সংকট বাড়বে। এতোসব উদ্বেগ বিবেচনায় না নিয়ে সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়েছে।

তাদের দাবি, আলট্রা সুপার থার্মাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। যদিও সরকারের এই দাবি বিজ্ঞানভিত্তিক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সুন্দরবনসহ আশপাশের অঞ্চলের প্রকৃতি-পরিবেশের বিরাট ক্ষতির বিনিময়ে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিথ হলেও তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় যে খুব বড় অবদান রাখবেনা তা নয়। এ কেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে গেলেও দেশের মানুষের মাথাপিছু মাত্র ৮ ওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।

বাণিজ্যিকভাবেও এটি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নয়। কারণ চুক্তি অনুযায়ী এই প্রকল্পে মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারতীয় এনটিপিসি ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে এবং পিডিবিকে এনটিপিসি থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অর্থাৎ এদেশের পরিবেশ-প্রকৃতির বিনিময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যের কাছ থেকে কিনতে হবে! আইইইএফএ ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বর্তমানে গড় বিদ্যুতের দামের চেয়ে ৩২% শতাংশ বেশি হবে। অতিরিক্ত দামে বিদ্যুৎ কিনতে হলে পিডিবিকে হয় ভর্তুকি না হয় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে।

সারা বিশ্বেই এখন কয়লার মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব নানা উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে জোর দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অনেক দেশই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ নতুন করে কয়লার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কয়লার উপর নির্ভরশীলতা বাড়লে তা পরিবেশের উপর হুমকি হলেও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় কোনো ভূমিকা রাখবে না। এর পরিবর্তে নবরায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কারণ সীমিত আয়তন ও বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে মাটি, পানি ও বনভূমিসহ পরিবেশ রক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরি। বিদ্যুতের বিকল্প উৎস থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবন রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: রাজু আহমেদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজনেস আওয়ার/১৩আগস্ট/এমএএস

উপরে