ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


‘শেয়ারবাজারের পেছনে ফেরার সুযোগ নেই’

২০১৮ অক্টোবর ২১ ১০:১২:০৯

শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) দীর্ঘ ৭ বছর ধরে চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন ড. এম খায়রুল হোসেন। যিনি শেয়ারবাজারের এক ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিজের দক্ষতার মাধ্যমে ২০১০ সালের মহাধ্বসের পরবর্তী সেই ভয়াল পরিস্থিতিকে সামলে নিয়েছেন। নানা সংস্কারের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের ভিত্তি করেছেন মজবুত। যেখান থেকে শেয়ারবাজারের পেছনে ফেরার কোন সুযোগ নেই। একইসঙ্গে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো ধস সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। যাতে শেয়ারবাজারের প্রতি দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। যিনি প্রথম দফার মেয়াদ শেষে নিজ কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যেতে চাইলেও সরকার যেতে দেননি। তার দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য ২ বার পুন:নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে সর্বশেষ গত এপ্রিলে আরও ২ বছরের জন্য পূণ:নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ড. এম খায়রুল হোসেন বিজনেস আওয়ার ২৪ডটকম;র স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদকে সাক্ষাতকার দেন। যার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

খায়রুল হোসেন বলেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বিগত কয়েক বছরে রেগুলেটরি সক্ষমতা বাড়িয়েছি, তালিকাভুক্ত কোম্পানির গভর্নেন্স হয়েছে, স্টক এক্সচেঞ্জে মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ (ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন) করা হয়েছে, মনিটরিংয়ের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জে সুশাসন বেড়েছে, সবকিছুতে ট্রান্সপারেন্সি বেড়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীসহ স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী হয়েছে। এছাড়া ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) করার ফলে রিপোর্টিংয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এসেছে।

তিনি বলেন, গত ৭ বছরে পাবলিক ইস্যু রুলসের আধুনিকায়ন করা হয়েছে, উদ্যোক্তা/পরিচালকদের অসৎ উদ্দেশ্য প্রতিরোধে বোনাস শেয়ার বিক্রিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে বিনিয়োগ শিক্ষা, নিরীক্ষার মান উন্নয়নে প্যানেল অডিটরস গঠন এবং কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনয়নে যুগোপযোগি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন দিক নির্দেশনা (সিজিজি) জারি, প্লেসমেন্ট আইন সংস্কার ও উদ্যোক্তা/পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারনের নির্দেশনা জারি করেছি। এছাড়া শেয়ার কেলেঙ্কারীতে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করার ক্ষেত্রে বর্তমান কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা আনতে ভুতুড়ে অমনিবাস হিসাবকে পৃথককরণ, ১৯৬৯ অধ্যাদেশের যুগোপযোগি সংশোধনী ও সব শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা করা হয়েছে এই কমিশনের সময়ে।

বিশ্বের অন্য কোন দেশে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের মতো আকর্ষণীয় রিটার্ন পাওয়া যায় না বলে জানান খায়রুল হোসেন। যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করছে। এছাড়া সরকারের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ করার ফলে সবাই বাংলাদেশের দিকে ছুটছে। চীন এরইমধ্যে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এসেছে। এছাড়া নিয়মিত বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এদেশে বিনিয়োগের জন্য যোগাযোগ করছে বলে জানান।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে অনেকেই আসন্ন রাজনীতি নিয়ে প্রপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদেরকে সচেতন হতে হবে।

শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ইনভেষ্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ২ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান খায়রুল হোসেন। এরমধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। এছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য চীনা কনসোর্টিয়াম থেকে প্রাপ্ত অর্থে ১০ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইন মওকুফ করা হয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রদত্ত অর্থমন্ত্রীর সুপারিশগুলোর মধ্যে কিছু বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা হচ্ছে। যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের পেছনে ফেরার কোন সুযোগ নেই। এই শেয়ারবাজারের উজ্জল ভবিষ্যত ও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছি। এক্ষেত্রে সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ রয়েছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের কোন বিকল্প নেই। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে ভবিষ্যতে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সবাই শেয়ারবাজারের প্রতি ঝুঁকবে।

অত্যাধুনিক সার্ভিলেন্স সফটওয়্যার স্থাপনের ফলে শেয়ার লেনেদেনে কেউ অসৎ উপায় অবলম্বন করলে, তা সঙ্গে সঙ্গে সনাক্ত করা সম্ভব বলে জানান খায়রুল হোসেন। যাতে শেয়ারবাজারে আরেকটি ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো ধস সৃষ্টির সুযোগ নাই। যেখানে বিগত কয়েক বছরে নানা সংস্কারের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান কমিশনের কাজের সফলতায় বিএসইসি ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনসে (আইওএসসিও) বিএসইসি ‘এ’ ক্যাটাগরি অর্জন করেছে। এছাড়া বিএসইসির সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নিজস্ব ভবন তৈরী করা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নিজস্ব অর্থায়নে ১০ তলা বিশিষ্ট ভবন তৈরী করা হয়েছে।

জিডিপিতে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অবদান তুলনামূলক কম বলে জানান খায়রুল হোসেন। যা মাত্র ২০ শতাংশ। হংকংয়ে যেখানে ৪০০ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভর ও বিদেশীদের লেনদেন ৫ শতাংশ। কিন্তু অন্যান্য দেশের শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ৭০-৮০ শতাংশ। আর বিদেশীদের লেনদেনে অংশগ্রহণ থাকে ৪০ শতাংশ। যা আমাদের দেশের শেয়ারবাজারেও হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বন্ড মার্কেটকে সেকেন্ডারিতে আনার জন্য কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। বিভিন্ন ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এগুলোকে সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা হবে। এগুলোতে ফিক্সড ইনকাম আছে। এছাড়া অন্যান্য ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ শেয়ারবাজারে আনবেন বলে জানান।

সর্বশেষ বিনিয়োগকারীদেরকে প্রাধান্য ও তাদের কথা চিন্তা করে কমিশন কাজ করে বলে জানান ড. এম খায়রুল হোসেন।

বিজনেস আওয়ার/২১ অক্টোবর, ২০১৮/আরএ

উপরে