ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


নারী, তোমায় অভিবাদন

২০১৮ অক্টোবর ২৫ ১১:৩৩:৩৮

‘পুলিশ চেকপোস্টে সিএনজি আরোহী এক নারীর সঙ্গে পুলিশের বাদানুবাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’

এই কথাগুলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া। ধন্যবাদ পুলিশকে ঘটনাটি এড়িয়ে না যাওয়ার জন্য। এমন অনেক অভিযোগ হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেও

গত সোমবার দিবাগত রাতে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় তল্লাশির নামে এক তরুণীকে কয়েক পুলিশ সদস্যের হেনস্তা করার বিষয়টি অফিসিয়ালি আমলে নেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ তাদের দিলাম বৈকি, তবে তাদের এই কথার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। তার প্রমাণও ডিএমপির ওই স্ট্যাটাসে শত শত মানুষের বিক্ষুব্ধ মন্তব্য। দিনের পর দিন পুলিশের কিছু সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীর কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধতার বাইরে আসতে পারছে না।

পুলিশের যারা অপরাধ করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আসলে কী হয় বা কতটুকু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা আমজনতা কখনো জানতে পারে না। তাই তাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগেও কিছু কিছু ঘটনায় অপরাধী পুলিশ সদস্যদের সাময়িক বহিষ্কার কিংবা ক্লোজ করা হলেও তাদের আবার কয়েকদিনের মধ্যে স্ব-অবস্থানে ফিরে আসতে দেখেছি।

গত সোমবার দিবাগত রাতের ঘটনাটিতে অনেকে বিস্মিত হলেও আমি এতটুকু বিস্মিত হইনি, তবে কষ্ট পেয়েছি। বিস্মিত না হওয়ার মতো অনেক কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ হলো, পুলিশের অনেক ভালো কাজের পাশাপাশি দিনের পর দিন বাহিনীটির অনেক সদস্যের এ ধরনের অনৈতিক এবং অবৈধ কাজ আমার মতো আরও অনেকের কাছে বেশ পরিচিত। তল্লাশির নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগও নতুন কিছু নয়, নারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও নতুন কিছু নয়। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয় না বলেও তারা এ কাজে উৎসাহ পেয়ে থাকতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ হলো, ঘরে-বাইরে নারীকে শোষণের চিত্র এখনো আমাদের চারপাশে অসংখ্য, যে মানসিকতা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বের হতে পারছেন না।

অন্যতম প্রধান কারণ হলো, পুলিশকে প্রতিটি সরকারই রাজনীতিকীকরণের মধ্য দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের অসীম ক্ষমতার অধিকারী করে তোলা হচ্ছে। এই মুহূর্তে তাদের এই অসীম ক্ষমতার অপব্যবহার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে হয়।

সন্দেহ হলে চেকপোস্টে যে কারোর ব্যাগ চেক করা পুলিশের কর্তব্য এবং সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওই পুলিশ চেকপোস্টে সিএনজি থামানো হলেও ভেতরে থাকা নারীর ব্যাগটি চেক না করে তাকে অহেতুক হয়রানি করে যাচ্ছিলো কর্তব্যরত একদল পুলিশ। মেয়েটি নিজে বারবার তার ব্যাগ তল্লাশি করতে বললেও তা না করে পুলিশ বরং মেয়েটির মুখে বারবার টর্চের আলো ফেলে উত্ত্যক্ত ও একের পর এক আপত্তিকর মন্তব্য করছিল। মেয়েটির প্রতিবাদে পুলিশ সদস্যগুলো আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ঘটনা এখানেই থেমে রইল না।

সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে একটি মেয়ের বিনা অনুমতিতে তাকে ভিডিও করে ফেসবুকে ভাইরাল করার দুঃসাহস দেখালো পুলিশ। এক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কী বলে? না কি পুলিশ সদস্যরা ধরেই নিয়েছেন, ওই আইন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। তাদের এমনটা মনে হলেও তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকার কথা নয়। কারণ পুলিশের ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার বিপরীতে বাহিনীটির সদস্যরা নিজেদের সব আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছে। পুলিশ সদস্যরা মেয়েটিকে বেয়াদব বলার সঙ্গে সঙ্গে তার মা-বাবাকে নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

‘ভালো মেয়েরা এতো রাতে বের হয় না’, এ ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করার সাহস তারা পায় কোথা থেকে? যে কোনো প্রয়োজনে তো একজন মানুষ বের হতেই পারেন। জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তো যে কাউকে যে কোনো সময় বের হওয়া লাগতেই পারে। অথবা এমনও তো হতে পারে যে মেয়েটি একজন চিকিৎসক, মানুষের সেবা করেই তাকে অত রাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। গভীর রাতে একজন নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কবলে পড়ে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হতে থাকলে পুলিশকে ‘বন্ধু’ মনে করাটা কি অতই সহজ?

মেয়েটির পরিচয় এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তবে সে যে-ই হোক, স্যালুট তাকে। কারণ অত রাতে একদল পুলিশের অসভ্য আচরণের তুমুল প্রতিবাদ তিনি একাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অতটা সময়জুড়ে করে যাচ্ছিলেন। আমাদের মেয়েরা সাহসী হয়ে উঠছে, প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখে গেছে, এটাই বড় কথা।

রাষ্ট্রীয় একটা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের হয়রানির শিকার মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলবো, যে ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে আপনাকে অপমানিত করতে চেয়েছিল, তার বদলে দেশের মানুষ আপনাকেই অভিবাদন জানাচ্ছে। তাই আপনার প্রমাণিত অদম্য সাহস নিয়ে উচিত হবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করার।

আর পুলিশ কর্তৃপক্ষও বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, তাও দেখার অপেক্ষায় আমরা। যেহেতু অপরাধী পুলিশ, তাই তাদের বিরুদ্ধে মেয়েটির হয়ে সাধারণ অন্য কারোর মামলা করার সাহস না থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই কাজটি কেউ করতে চাইলেও পুলিশ যে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেবে এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে বিরল।

মাত্র ক’দিন আগেই এক নারী সাংবাদিককে একটি টেলিভিশন টকশোতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ‘চরিত্রহীন’ বলে মন্তব্য করলেন। বিষয়টি সম্পর্কে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বললেন, ‘আপনারা মামলা করেন, আমরা যা করার করব।’ সাধারণ এই মেয়েটির ক্ষেত্রেও কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সঙ্গে এমন অভয়ের কিছু শোনাবেন?

লেখক: মঞ্জুরুল আলম পান্না, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

উপরে