ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


গলাকাটা সুদ নিচ্ছে আট ব্যাংক

২০১৮ নভেম্বর ০৭ ১৬:১৯:৪৮

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক: শিল্প ও বাণিজ্য ঋণে গলাকাটা সুদ নিচ্ছে আট ব্যাংক। এ ছাড়া আরও ৩১টি ব্যাংক ডাবল ডিজিটে সুদ নিয়েছে সেপ্টেম্বরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর অঙ্গীকার শুধুই ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হয়েছে।

বারবার সময় বেঁধে দেয়া সত্ত্বেও বেশিরভাগ ব্যাংক তা অগ্রাহ্য করেছে। তারা সুদের হার গত সেপ্টেম্বরেও সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেনি। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ, ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) প্রতিশ্রুতির পরও এ হার ৯ শতাংশে নামায়নি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা ৩৮টি ব্যাংককে তাদের সর্বশেষ অবস্থা জানাতে চিঠি দিয়েছি। সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর প্রতিশ্রুতি তারা নিজেরাই দিয়েছিল। এখন তারা কমাবে না কেন? এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প ও বাণিজ্য ঋণে সুদ নিয়েছে সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। একই হারে সুদ কেটেছে মিডল্যান্ড ব্যাংকও।

ফারমার্স ব্যাংক ১৪-১৫ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক সোয়া ১১-১৪, এনআরবি ব্যাংক শিল্পে ৯-১২ এবং বাণিজ্যে ১০-১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ কেটেছে। মেঘনা ব্যাংক শিল্পে ৯ থেকে সাড়ে ১৪ এবং বাণিজ্যে ১২-১৫ শতাংশ সুদ কেটেছে।

সাউথ-বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক শিল্পে ৮-১০ শতাংশ সুদ কাটলেও বাণিজ্যে কেটেছে ১২-১৪ পর্যন্ত। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক বাণিজ্যে সুদ কেটেছে ৯-১৪ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন আটটি ব্যাংকসহ সেপ্টেম্বরেও সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেনি ৩৯টি ব্যাংক।

অথচ ১ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলো সব ধরনের ঋণের সুদহার কমিয়ে এক অঙ্কে নামানোর ঘোষণা দিয়েছিল। ঘোষণা অনুযায়ী সুদহার কার্যকর না করার বিষয়ে এক বৈঠক থেকে জানানো হয়, ৯ আগস্ট থেকে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ছাড়া সব ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামানো হবে।

সেটা সেপ্টেম্বরেও অধিকাংশ ব্যাংক কার্যকর করেনি। অর্থাৎ কয়েক দফা ঘোষণা দিয়েও ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেনি ব্যাংকগুলো।

এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পুরনো অনেক ব্যাংক কর্মসংস্থানমুখী শিল্প ঋণে সুদহার কিছুটা কমিয়েছে। তবে নতুন ব্যাংকের জন্য তা খানিকটা কঠিন।

কারণ ৬ শতাংশ সুদে পুরনো ব্যাংকও আমানত পাচ্ছে না। নতুন ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপ। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত নিতে ৯ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে সব ক্ষেত্রে সুদহার কমানোর সুযোগ কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনশীল খাতের ঋণ হিসেবে বিবেচিত শিল্পের মেয়াদি ঋণে দুই অঙ্কের সুদ নিয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক। আর শিল্পের মেয়াদি ঋণের তুলনায় চলতি মূলধন, ট্রেড ফাইন্যান্স, গৃহঋণে আরও বেশি সুদ নেয়া হয়েছে।

যার ফলে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানান সুবিধা নিয়েও সুদহার কমানোর যে ঘোষণা ব্যাংকগুলো দিয়েছে তা শুধুই ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হয়েছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক সেপ্টেম্বরে শিল্পের মেয়াদি ঋণে (ছোট ও বড়) সুদ নিয়েছে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। শিল্প খাতের চলতি মূলধন ঋণেও একই হারে সুদ কেটেছে। আর বাণিজ্যি (ট্রেড ফাইন্যান্স) ঋণে ১৪ থেকে বাড়িয়ে সুদ কেটেছে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত।

শুধু আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নয়, সরকারি বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সেপ্টেম্বরে শিল্পের মেয়াদি ঋণে সুদ নিয়েছে ১৩ শতাংশ। শিল্প খাতের চলতি মূলধন ঋণ বিতরণ করেছে ১২-১৩ শতাংশ সুদে। আর বাণিজ্যি (ট্রেড ফাইন্যান্স) ঋণে ১৪ শতাংশ সুদ নিয়েছে।

একইভাবে এবি ব্যাংক শিল্প ঋণ বিতরণ করেছে ৯-১৫ শতাংশ সুদে। আর বাণিজ্য ঋণ বিতরণ করেছে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ব্যাংক এশিয়া বড় ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি, চলতি মূলধন এবং বাণিজ্য ঋণে সুদ নিয়েছে ৯-১২ শতাংশ পর্যন্ত। ব্র্যাক ব্যাংক শিল্পে মেয়াদি ৯-১৮ শতাংশ, শিল্পে চলতি মূলধন ৯-১৬ এবং বাণিজ্যে ৯-১২ শতাংশ সুদ নিয়েছে।

এ ছাড়া ডাচ্-বাংলা ৯-১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯-১৪ দশমিক ৫০, আইএফআইসি ৯-১২, যমুনা ব্যাংক ৯-১২, মার্কেন্টাইল ব্যাংক বাণিজ্যে সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১৩, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক সাড়ে ৭ থেকে সোয়া ১৫, ন্যাশনাল ব্যাংক ১২-১৫, এনসিসি ব্যাংক ৯-১৩, ওয়ান ব্যাংক ১০ থেকে সাড়ে ১৪, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯-১৪, প্রাইম ব্যাংক ৯ থেকে সাড়ে ১৬, পূবালী ৯-১৪, সাউথ-ইস্ট ব্যাংক ৯-১৩, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক শুধু বাণিজ্যে ৯-১২, সিটি ব্যাংক সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ২০, ট্রাস্ট ব্যাংক ৯ থেকে সাড়ে ১৪, একটি বেসরকারি ব্যাংক ৯ থেকে সাড়ে ১৫ ও উত্তরা ব্যাংক শিল্প-বাণিজ্যে ৯-১৪ শতাংশ সুদ কেটেছে। আর বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৮টি শিল্প-বাণিজ্যের কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই অঙ্কের সুদ নিয়েছে।

এ ব্যাপারে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, সুদ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে প্রধান অন্তরায় উচ্চ খেলাপি ঋণ। বড় খেলাপিরা টাকা দিচ্ছে না।

সে কারণে ব্যাংকগুলোকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা নতুন ব্যাংকের জন্য আরও কঠিন। কারণ নতুন ব্যাংকগুলো এখনও উচ্চসুদে এফডিআর নিচ্ছে।

বিজনেস আওয়ার/০৭ নভেম্বর, ২০১৮/এমএএস

উপরে