ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


আইপিও’র টাকা অব্যবহৃত রেখে বোনাস শেয়ার ঘোষণা

২০১৮ নভেম্বর ২৮ ১১:১৬:১১

রেজোয়ান আহমেদ : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার না হতেই বোনাস শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা না থাকা ও উদ্যোক্তাদের টাকা না ছাড়তে চাওয়ার মনোভাবকে দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে অনেক কোম্পানিকে আইনি বাধ্যবাধকতার কারনেও বোনাস শেয়ার দিতে হয়। কারন আইপিও ফান্ড ব্যবহার করতে না পারলেও আইপিওধারী শেয়ারহোল্ডারদেরকে লভ্যাংশ প্রদান করতে হয়। অন্যথায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে হয়।

সাধারণত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন করে অর্থের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পুনঃগণপ্রস্তাব (আরপিও), রাইট শেয়ার, ডিবেঞ্চার বা বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে নতুন করে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু এ সব পদ্ধতিতে মূলধন বাড়াতে হলে নানা ধরনের আইনি পদ্ধতি পরিপালন ও কোম্পানিকে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা না থাকার কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বোনাস শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়ায়।

সম্প্রতি শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে এ ধরনের কোম্পানিগুলোর মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইপিওর অর্থ ব্যয় না হতেই কোম্পানিগুলো বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়াচ্ছে। বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানো হলে কোম্পানি থেকে কোনো ধরনের ক্যাশ আউটফ্লো হয় না। কিন্তু নগদ লভ্যাংশ দেয়া হলে ক্যাশ আউটফ্লো হয়। মূলত সমুদয় মুনাফা কোম্পানিতে রেখে দেয়ার কৌশল হিসেবে বোনাস শেয়ার ইস্যু করছে কোম্পানিগুলো। এতে কোম্পানির মূলধন বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সে হারে কোম্পানিগুলোর মুনাফার প্রবৃদ্ধি হয় না। এতে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ও সম্পদমূল্য কমে যায়। এছাড়া কোম্পানির লভ্যাংশ দেয়ার সক্ষমতাও কমে যায়।

এ বিষয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, একটি কোম্পানি যদি সত্যিই মুনাফা করে তাহলে বোনাস শেয়ার প্রদান করতে পারে। তবে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ওপর একটি কোম্পানির সক্ষমতা বা ভিত্তি কতটা মজবুত তা নির্ভর করে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

আইপিওর অর্থ ব্যবহার না হতেই কোম্পানিগুলোকে বোনাস শেয়ার প্রদান করতে দিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ভুল করছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, এ সব কোম্পানি শুধু বোনাস শেয়ার দিয়ে মূলধন বাড়াচ্ছে কিন্তু ব্যবসায় উন্নতি হয় না। আর বোনাস শেয়ার দেওয়ার পরের বছর গিয়ে কোম্পানিগুলোর ইপিএস কমে যায়, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা লোকসানের কবলে পড়েন। তাই আইপিওর টাকা ব্যবহার না হতে বোনাস শেয়ার প্রদানে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।

এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বলেন, উদ্যোক্তা পরিচালকেরা মূলত কোম্পানি থেকে টাকা বাহির করতে না চাওয়ার মনোভাবের কারনেই বোনাস শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দিয়ে থাকে। তবে অনেক কোম্পানির নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতাও থাকে না। এছাড়া একটি নতুন কোম্পানি আইপিও ফান্ড ব্যবহারের সুযোগ না পেলেও লভ্যাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় বোনাসে ঘোষণা দেয়।

তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিকে আগের অর্থবছরের জন্য আইপিধারীদের লভ্যাংশ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ আইপিওতে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পায়নি। যাতে নতুন কোম্পানিগুলো বোনাসে উৎসাহিত হয়। তবে এবার কয়েকটি কোম্পানি বোনাসের পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। যা ইতিবাচক।

সম্প্রতি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার পর বোনাস শেয়ার ইস্যু করে যে সব কোম্পানি মূলধন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে— কাট্টালি টেক্সটাইল, ইন্দোবাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, এমএল ডাইং, ভিএফএস থ্রেড ডাইং, এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্ট্র্যাকো রিফুয়েলিং স্টেশন, অ্যাডভেন্ট ফার্মা ও কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস।

কাট্টালি টেক্সটাইল : মেশিনারিজ ক্রয়, ভবন নির্মাণ ও ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে আইপিওর মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। যা সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে ২৪ মাস সময় লাগবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। যে অর্থ ব্যবহারের জন্য চলতি বছরের ১২ নভেম্বর অনুমোদন লাভ করে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই অর্থ ব্যবহার না করতেই গত ১২ নভেম্বর ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার ঘোষণার তথ্য ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে।

ইন্দোবাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস : কোম্পানিটি ব্যবসা সম্প্রসারণে আইপিও’র মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। যা ব্যবহারের জন্য চলতি বছরের ১৮ অক্টোবর ফান্ড পেয়েছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী কোম্পানিটি ১৮ মাসে এ অর্থ ব্যবহার করবে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই গত ২৫ অক্টোবর ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দেয়।

এমএল ডাইং : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। মেশিনারিজ ও ইক্যুপমেন্ট ক্রয়ের এবং আইপিও খরচ খাতে ব্যয় করতে শেয়ারবাজার থেকে এ অর্থ সংগ্রহ করে। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পায়। পরবর্তী ১৮ মাসে তা ব্যবহারের করার কথা। কিন্তু অর্থ ব্যবহারের ২৭ অক্টোবর কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ২০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

ভিএফএস থ্রেড ডাইং : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের জন্য গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পায়। সংগৃহীত অর্থ ১৮ মাসের মধ্যে ব্যবহার করার কথা। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ২৭ অক্টোবর ৬ শতাংশ নগদের পাশাপাশি ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি আইপিওতে ১০ টাকা মূল্যে ২ কোটি ২০ লাখ শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে ২২ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। সংগৃহীত অর্থ কোম্পানিটি প্লান্ট অ্যান্ড মেশিনারীজ ক্রয় ও ঋণ পরিশোধ করবে বলে জানায়।

এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ : কোম্পানিটি আইপিওর অর্থ ব্যবহারের জন্য ১৫ জুলাই অনুমোদন লাভ করে। কোম্পানিটি ১০ টাকা মূল্যে ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি মেশিনারীজ ও ইকুপমেন্ট ক্রয়, ভবন নির্মাণ ও আইপিও খাতে ব্যয় করবে বলে জানায়। টাকা ব্যবহার করতে সময় লাগবে ১৮ মাস। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ২৮ অক্টোবর ২ শতাংশ নগদের পাশাপাশি ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

ইন্ট্র্যাকো রিফুয়েলিং স্টেশন : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এবং চলতি বছরের ১৭ মে অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন পায়। ব্যবসায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানায়। উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার করতে সময় লাগবে ১৫ মাস। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ২৮ অক্টোবর ৫ শতাংশ নগদের পাশাপাশি ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

অ্যাডভেন্ট ফার্মা : কোম্পানিটি ভবন নির্মাণ, মেশিনারিজ ও ইক্যুপমেন্ট ক্রয়ের লক্ষ্যে আইপিওর মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এবং সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে ১৮ মাস সময় লাগবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অর্থ ব্যবহারের জন্য চলতি বছরের ১২ এপ্রিল অনুমোদন লাভ করে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই অর্থ ব্যবহার না করতেই গত ১৮ অক্টোবর ২ শতাংশের নগদের পাশাপাশি ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস : কোম্পানিটি মেশিনারিজ ক্রয় ও ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে আইপিওর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে এবং সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে ১২ মাস সময় লাগবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অর্থ ব্যবহারের জন্য চলতি বছরের ১৩ মার্চ অনুমোদন লাভ করে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই অর্থ ব্যবহার না করতেই গত ৩০ অক্টোবর ৭ শতাংশের নগদের পাশাপাশি ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

কাট্টালি টেক্সটাইলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ফজলুল হক বিজনেস আওয়ারকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নগদের পরিবর্তে বোনাস শেয়ার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে কোম্পানির উন্নয়ন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইপিও ফান্ড পাওয়ার আগেই বোনাস শেয়ার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজনেস আওয়ার/২৮ নভেম্বর, ২০১৮/আরএ

উপরে