ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫


কোন পথে বাংলাদেশ? (পর্ব-2)

২০১৮ ডিসেম্বর ০১ ১২:৫৯:০৬

রপ্তানী আয় ও রেমিটান্সের ক্রমবর্ধমান আন্তঃপ্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপির অনুপাতে মুদ্রার সরবরাহ (M২/জিডিপি) ২০০১ সালে ৩১.৫% থেকে ২০১৮ সালে তা প্রায় ৬০% করেছে। মুদ্রা সরবরাহের এই অব্যাহত প্রসার অর্থনীতিতে সার্বিক চাহিদা বৃদ্ধিতে নিয়ামক ভুমিকা পালন করেছে।

যেমন, মোট বিনিয়োগ-জিডিপির হার এই সময়ে ২৩.৫% হতে বেড়ে ৩০.৫%-এ উন্নীত হয়েছে। উল্লেক্ষ্য, বাংলাদেশের মোট দেশজ সঞ্চয় এ সময়ে বাড়লেও মোট বিনিয়োগ সেই তুলনায় অনেক বেশী বেড়েছে। সঞ্চয়-বিনিয়োগ তফাৎ তাই জিডিপির ৭-১০% বিরাজ করেছে। অন্য কথায়, বিনিয়োগ সঞ্চয়ের থেকে সব সময় জিডিপির ৭-১০ শতাংশ বেশী হয়েছে।

এটা নির্দেশ করে যে, প্রতি বছর বাংলাদেশ সমপরিমান বানিজ্যা ঘাটতি মোকাবেলা করছে। কার্যত, বাংলাদেশ পণ্য ও সেবা খাতে এই বানিজ্য ঘাটতি গত ৫ বছর যাবত প্রতিবছর গড়ে ১০-১২ বিলিয়ন ইউএস ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অব্যাহত বানিজ্য ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ কিন্তু বাড়তি কোন বৈদেশিক ঋণের বোঝা সৃষ্টি করেনি। বরং রেমিটান্সের আন্তঃপ্রবাহ সেই ঘাটতি পূরণ করেছে এবং তা সামষ্টিকঅর্থনীতির চলতি হিসাবে ভারসাম্য (Current Account Stability) এনে দিয়েছে। আমাদের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপির হার ২০% এর নীচে (এডিবি, ২০১৮)। যে কোন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বৈদেশিক ঋণের এই পরিমাণকে স্বাভাবিক বলবে। এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলার কোন অবকাশ নেই। গ্লোবাল রেটিং সংগঠন (যেমন Standard & Poor বা Moody's) বাংলাদেশকে তাই সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক ঋণ বাবস্থাপনায় অনুকুল রেটিং দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বা ভিয়েতনামের বৈদেশিক ঋণের বোঝা জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশী।

আরও পড়ুন...

কোন পথে বাংলাদেশ? (পর্ব-১)

অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মুদ্রায়ণের (Monetisation) ফলে গত ২৫ বছরে আর্থিক খাতে ব্যাপক তারল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ঋণদান ক্ষমতা বহুগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি খাত এই সময়ে তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের সিংহভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের মাধ্যমে পুরণ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঋণের এই প্রবাহ সবসময় উৎপাদনশীল খাতে হয়নি।

শেয়ারবাজার ও আবাসন খাতে মাত্রাতিরিক্ত ঋণের প্রবাহ হওয়ার ফলে, ওইসব খাতে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি হয়েছে। জমি ও এপার্টমেন্টের দাম কোন কোন স্থানে ২০-৩০ গুণ বেড়েছে। শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারনে ২০১০ সালে স্টক মার্কেট ক্রাশ করেছে। সেক্ষেত্রে কর্পোরেট সুশাসন ও স্টক রেগুলেটরদের আইন প্রয়োগে সক্ষমতার অভাব এবং স্টক এক্সচেঞ্জের অসম্পুর্ন মার্কেট কাঠামো পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে। মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিংব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ভবিষ্যৎমুখী ও বিচক্ষণ হতে পারলে, উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩% না হয়ে ৩০% হতে পারত। ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৮% না হয়ে ৯%-এ উন্নীত হত বলে মনে করি। তারপরও স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির গত তিন দশকের অর্জন অনেক প্রশংসনীয়।

লেখকঃ ড. মিজানুর রহমান

অধ্যাপক, একাউন্টিং ও ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজনেস আওয়ার/০১ ডিসেম্বর, ২০১৮/আরএ

উপরে