sristymultimedia.com

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬


এজিএম পার্টির সঙ্গে রাজ্জাকের বিনিয়োগের মিল

১২:১৩পিএম, ০১ ডিসেম্বর ২০১৯

রেজোয়ান আহমেদ : বাংলাদেশ পুজিঁবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক। তিনিও সভাপতির মতো ৩টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব রক্ষণাবেক্ষন করেন। যেসব হিসাবের মাধ্যমে তিনি ১৫৮ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। তবে কোম্পানি অনেক হলেও শেয়ার সংখ্যা এবং মূল্য খুবই কম। তিনি গড়ে প্রত্যেকটি কোম্পানির ১১টি করে শেয়ার কিনেছেন। যা করে থাকে এজিএম পার্টির সদস্যরা। যারা এমন স্বল্প সংখ্যক শেয়ার কিনে এজিএমে অংশগ্রহণ করার রাস্তা উন্মুক্ত রাখে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির এজিএম থেকে ব্যক্তি স্বার্থ হাতিয়ে নেন।

কাজী আব্দুর রাজ্জাকের বর্তমানে ৩টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব রয়েছে। এগুলো ইবিএল সিকিউরিটিজ, হাবিবুর সিকিউরিটিজ ও বানকো সিকিউরিটিজে খোলা হয়েছে। সবগুলোতেই তার শেয়ার রয়েছে। তবে মূলত তিনি ইবিএল সিকিউরিটিজের বিও হিসাবে সব শেয়ার কিনেছেন।

আব্দুর রাজ্জাক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৯টি কোম্পানির মধ্যে ১৫৮টি বা ৫০ শতাংশ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। তিনি ওইসব কোম্পানির ১ হাজার ৭০৫টি শেয়ার কিনেছেন। গড়ে প্রত্যেকটি কোম্পানির ১১টি শেয়ার কিনেছেন। গত ৩১ আগষ্টে শেয়ারবাজারের প্রতিটি শেয়ারের গড় দর ছিল ৪৮ টাকা। এ বিবেচনায় রাজ্জাকের ১ হাজার ৭০৫টি শেয়ারের দর হয় ৮১ হাজার ৮৪০ টাকা। যেখানে বর্তমানে শেয়ারবাজারের ২৬ লাখের প্রতিটি বিও হিসাবে গড়ে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। তারপরেও আব্দুর রাজ্জাক এই নামমাত্র বিনিয়োগ নিয়ে সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানববন্ধনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন।

ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক ১৫৮ কোম্পানির শেয়ার কিনলেও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কোন ইউনিট কিনেন নাই। অনেক ফান্ডের ইউনিট দর তলানিতে থাকলেও তা আকৃষ্ট করতে পারেনি তাকে। যদিও ফান্ডের এজিএম অনুষ্ঠিত হয় না। যাতে ওখানে গিয়ে স্বার্থ হাসিলের সুযোগ থাকে না।

আরও পড়ুন....
ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ মাত্র ৩ হাজার টাকা

নিম্নে আব্দুর রাজ্জাকের ইবিএল সিকিউরিটিজের মাধ্যমে বিনিয়োগের তথ্য তুলে ধরা হল-

জানতে চাইলে আব্দুর রাজ্জাক বিজনেস আওয়ারকে বলেন, এজিএমে গিয়ে আমি ভালো কোম্পানির প্রশংসা এবং খারাপ কোম্পানির দুর্নাম করি। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে ভালো করার জন্য পরামর্শ দেই। এছাড়া অনেক কোম্পানির এজিএমে ভালো বক্তব্যও হয়। একইসঙ্গে এজিএম পার্টির অনেকে প্রতিবাদও করেন।

ঐক্য পরিষদের অনেকে এজিএম পার্টি হিসাবে অংশগ্রহণ করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যা সংগঠনের অনেকেই যায়। অনেক বিনিয়োগকারী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ, তাই ওখানে যায়। আগে গেলে গিফট পেত, এখন যাতায়াতবাবদ কিছু টাকা পায়। গিফটের আশায় শেয়ারহোল্ডারসহ আমাদের কিছু সদস্য নিয়মিত এজিএমে যায়। এটা অবাস্তব বা অসত্য না। তবে ভবিষ্যতে এজিএম পার্টির দৌরাত্মরোধে কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বিজনেস আওয়ারকে বলেন, কেউ যদি এজিএমে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য নামমাত্র শেয়ার ধারন করে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা উচিত। এছাড়া এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এজিএমে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন বিনিয়োগকারী ১টি শেয়ার ধারনের কারনেও এজিএমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এখন সে যদি ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এজিএমে ঝামেলা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. মোহাম্মদ মুসা বিজনেস আওয়ারকে বলেন, এজিএমে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য নামমাত্র শেয়ার কিনে থাকে এজিএম পার্টির সদস্যরা। যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে শেয়ারবাজারের বৃহৎ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়। তাই শেয়ারবাজারের উন্নয়নে এ জাতীয় বিনিয়োগকারীদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সক্রিয় ভূমিকা রাখা দরকার।

বিনিয়োগকারীদের জন্য রাজপথে আব্দুর রাজ্জাকের জোড়ালো কন্ঠস্বর শোনা গেলেও তার বিরুদ্ধে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও কম না। তিনি কোম্পানিগুলোর এজিএম গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করে থাকেন। এছাড়া আইপিও অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোতে গিয়ে অর্থ আদায় এবং লটারিতে টাকা সংগ্রহ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যেখানে তার সঙ্গে একজোট হয়ে সংগঠনটির কিছু সদস্যও এ অনৈতিক কর্মকান্ড করে থাকেন।

এক মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বিজনেস আওয়ারকে বলেন, এইসব লোকদের জ্বালায় আমরা অতিষ্ঠ। আইপিও অনুমোদনের পরপরই এরা চাদাঁ দাবি করে বসে। না হলে আবার উকিল নোটিশ পাঠায়। এছাড়া বিএসইসিতে আইপিও বাতিল চেয়ে চিঠি দেয়। যদিও কমিশন তাদের চিঠির পেছনে চাদাঁবাজির উদ্দেশ্য জেনে গেছে, যে কারনে তাদেরকে এখন আর গুরুত্ব দেয় না। সম্প্রতি তারা আইপিও লটারিতে গিয়েও চাদাঁবাজির পায়তারা শুরু করেছে। তাদের এতো অন্যায়ের পরেও নামসহ মন্তব্য করতে সাহস পাচ্ছি না। ওরা কখন আবার ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করে বসে। তাই এইসব চাদাঁবাজাদের রুখতে কমিশনকে এগিয়ে আসার জন্য আহবান করছি।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা বিজনেস আওয়ারকে বলেন, ঐক্য পরিষদের ব্যানারে কিছু নামধারী বিনিয়োগকারীর অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ অনেক দিনের। কিন্তু কেউ তাদের বিরুদ্ধে কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করে না। অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

আব্দুর রাজ্জাকের হাবিবুর রহমান সিকিউরিটিজে ১২০২০৮০০৫৮১৪৭৮১৫ নম্বরের বিওতে ২৫টি কোম্পানির ১৮৫টি শেয়ার কেনা আছে। এছাড়া বানকো সিকিউরিটিজে ১২০২১৫০০১৬০৪১৬২৭ নম্বরের বিও হিসাবে ২টি কোম্পানির ৬৩টি শেয়ার এবং ইবিএল সিকিউরিটিজে ১২০১৯৫০০৬২৫৬৫৯৫৭ নম্বরের বিওতে ১৩১টি কোম্পানির ১৫০২টি শেয়ার কেনা আছে। এক্ষেত্রে ১৫৮ কোম্পানিতে গড়ে ১১টি শেয়ার কেনা হয়েছে।

নিম্নে আব্দুর রাজ্জাকের হাবিবুর রহমান সিকিউরিটিজ ও বানকো সিকিউরিটিজের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের তথ্য তুলে ধরা হল-

এ বিষয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমার ৩টি বিও হিসাবের মধ্যে বানকো সিকিউরিটিজে লোকসান রয়েছি।

সংগঠনটির সাধারন সম্পাদক কোন কোন কোম্পানির মাত্র ১টি করে শেয়ার কিনে ওই কোম্পানির মালিকানায় অংশগ্রহণ করেছেন। এরমাধ্যমে ওই কোম্পানির এজিএমে প্রবেশের দ্ধারও পরিস্কার রেখেছেন। এমন ১টি শেয়ার কেনা কোম্পানির তালিকায় রয়েছে- সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও রূপালি ব্যাংক। যিনি ২টি করে শেয়ার কিনেছেন আরএকে সিরামিকস, এসিআই ফরমূলেশনস, এসিআই লিমিটেড, এপেক্স ফুটওয়্যার, ন্যাশনাল টি, নাভানা সিএনজি ও রহিম টেক্সটাইলের।

শেয়ারবাজারে আব্দুর রাজ্জাক সবচেয়ে বেশি শেয়ার কিনেছেন ইভিন্স টেক্সটাইলের। এ কোম্পানিটির ১৫০টি শেয়ার রয়েছে তার বিও হিসাবে। এরপরের অবস্থানে থাকা পিপলস লিজিংয়ের ৬০টি, আরগন ডেনিমসের ৫০টি, বিআইএফসির ৪০টি, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩৪টি, বেক্সিমকো লিমিটেডের ৩৫টি, আফতাব অটোমোবাইলসের ২৮টি ও ঢাকা ব্যাংকের ২৭টি শেয়ার রয়েছে।

শেয়ারবাজারের জন্য করনীয় নিয়ে সরকারকে উপদেশ দেওয়া আব্দুর রাজ্জাক নিজের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেন না। অন্যদের তিনি মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার জন্য পরামর্শ দিলেও নিজে দূর্বল, লোকসানি এবং বন্ধ কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনেন। তার এ তালিকায় বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, আইসিবি ইসলামীক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, কেয়া কসমেটিকস, পদ্মা ইসলামী লাইফ, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ও খান ব্রাদার্সের মতো কোম্পানি রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদেরকে ভালো কোম্পানির শেয়ার কেনার পরামর্শ দিয়ে নিজে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কেনার কারন কি? এমন প্রশ্নে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিআইএফসি অবসায়নের জন্য আবেদন করেছে। এজিএমে এর প্রতিবাদ জানানোর জন্য কোম্পানিটির শেয়ার কিনেছি। এজিএমে প্রতিবাদের মাধ্যমে মান্নান সাহেবের কাছ থেকে লুটপাটের অর্থ ফেরত আনতে ভূমিকা রাখব। একইভাবে বাকি দূর্বল কোম্পানির শেয়ার কেনার পেছনে উদ্দেশ্য আছে বলে জানান তিনি।

বিজনেস আওয়ার/০১ ডিসেম্বর, ২০১৯/আরএ

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে