ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫


নামিদামি কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসছে না

২০১৭ নভেম্বর ১৭ ১৭:৩৪:৩৭

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান। তিনি বিএমবিএর সভাপতি নির্বাচিত হন জানুয়ারি ২০১৬ সালে, যা শেষ হবে আগামি ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭। দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে অর্থ ও শেয়ারবাজারের সঙ্গে জড়িত আছেন তিনি। এ বাজার উন্নয়নে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। মো. ছায়েদুর রহমান কুমিল্লা জেলার দেবিদারে পহেলা নভেম্বর ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহন করেন। পিতা মরহুম আব্দুর রশিদ ও মা রোকেয়া খাতুনের বড় সন্তান। এস এস সি ১৯৮১ ও এইচ এস সি ১৯৮৩ সালে পাস করেন। ১৯৮৫ সালে স্নাতক ও ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকত্তোর (ম্যানেজমেন্ট) ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ, এলএল বি এবং এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে এ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিতে হিসাব রক্ষক হিসাবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে বীমা কোম্পানিতে হিসাব রক্ষক পদে যোগদান করেন। তবে ১৯৯১ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন ভাবে শেয়ারবাজারের সাথে কাজ করেন। তারপর ১৯৯৮ সালে স্বদেশ ইনভেস্টম্যান (মার্চেন্ট ব্যাংক) এ যোগদান করেন। এরপর জিএইচপি ফাইন্যান্স, ব্র্যাক ইপিএল ও পিপলস লিজিং কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন, তিনি পূঁজিবাজারের সকল এরিয়াতে প্রত্যক্ষ কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৮ সালে তিনি ইস্টার্ণ ব্যাংক ( ইবিএল) যোগদান করেন হেড অফ ইনভেষ্টম্যান্ট ব্যাংকিং হিসাবে। এরপর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এখানেই কাজ করেছেন। তিনি বর্তমানে ইবিএল ইনভেস্টমেন্টস এর পরিচালক ও ইবিএল সিকিউরিটিজ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।

সম্প্রতি বিএমবিএর সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান বিজনেস আওয়ারের মুখোমুখি হন রাজধানীর মতিঝিলে তার ইবিএল সিকিউরিটিজ এর কার্যালয়ে। বিএমবিএ’র সভাপতির এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান।

বিজনেস আওয়ার: বর্তমান শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে বলুন ?
মো. ছায়েদুর রহমান : বর্তমানে শেয়ারবাজারের ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। তবে এই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নি:স্ব হবার কিছু কারন নেই। নি:স্ব হবার ধারণা করা সঠিক হবে না। তবে বিশ্বের সব শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি আছে । তেমনি আমাদের দেশের শেয়ারবাজারেও ঝুঁকি রয়েছে, এটা থাকবে। এ থেকে বাঁচতে বা নিরাপদে থাকতে শেয়ারবাজারের প্রতি সম্পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে, না বুঝে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে এবং মার্জিন ঋন ব্যবহার বাদ দিতে হবে। যেখান থেকেই তথ্য আসুক, সেটাকে যাচাই-বাছাই করতে হবে এবং পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে তারপর শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক কথায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ শিক্ষা নিয়ে নিজেকে পরিপক্ক করে শেয়ারবাজারে লেনদেন করতে হবে।

বিজনেস আওয়ার : অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে কেন তালিকাভুক্ত হচ্ছে না?
মো. ছায়েদুর রহমান : অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি কোম্পানী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না দেশের নামিদামি গ্রুপ কোম্পানিগুলো। ফলে শেয়ারবাজারে ভাল কোম্পানির শেয়ারের অভাব রয়েছে। তাই শেয়ারবাজারের উন্নয়নের স্বার্থে নামিদামি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন । সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ আমলাতন্ত্র। তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।

বিজনেস আওয়ার : বহুজাতিক ও দেশের নামিদামি কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার কারণগুলো কি?
মো. ছায়েদুর রহমান : অতালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পাবলিকের সামনে প্রকাশ করেনা বা তালিকাভুক্ত না হলে কোম্পানীর নিয়মকানুন পরিপালনে বাধ্যবাদকতা কম থাকে। ফলে তাদের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ে কাউকে কোন জবাবদিহি করে না। কিন্তু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোকে আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছতাসহ ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ে বিনিয়োগকারীদের এবং নিয়ন্ত্রনকারী সহ বিভিন্ন ভাবে জবাবদিহি করতে হয়। এ কারনে অনেক কোম্পানিই তালিকাভুক্ত না হয়ে নিরবে ব্যবসা করতে চায়। এছাড়াও “কষ্টার্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাগ কেউ কাউকে দিতে চায় না।

বিজনেস আওয়ার : অধিকাংশ মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ারবাজারে কোন কোম্পানি আনতে পারছে না, কেন?
মো. ছায়েদুর রহমান : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে মূল ভুমিকায় থাকে ইস্যু ম্যানেজার। বাজার চিত্রে দেখা যায়, অনেক দুর্বল কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত হচেছ । দুর্বল কোম্পানির আনার ক্ষেত্রে অডিটর ও কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে দায়ভার নিতে হবে। কারন কোম্পানির মূল তথ্য তারাই জানে। ইস্যু ম্যানেজার শুধুমাত্র অডিটেড এবং প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি কওে কাজ করে। দেশে প্রায় দেড় লাখ কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনশ কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। দেশে প্রায় ৫৮টি মার্চেন্ট ব্যাংক রয়েছে। এদের মধ্যে শেয়ারবাজারের প্রতি বছর অনুমোদন পাচ্ছে প্রায় ১৪টি কোম্পানি। কিন্তু এর মধ্যে যে মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ারবাজারে বেশি কোম্পানি আনছে সেইগুলোই কদর পাচ্ছে নতুন আসার প্রাতিষ্ঠানগুলোতেও। এছাড়াও একটি কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকা ভুক্তির অনুমোদন পেতে প্রায় দুই বছর লেগে যায়। এই দুই বছরে একটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে এনে প্রারিশ্রমিক হিসাবে যা পাচ্ছে একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের জন্য তা অত্যন্ত কম।

বিজনেস আওয়ার : শেয়ারবাজারের অডিট রিপোর্টগুলো স্বচ্ছতার সম্মন্ধে বলুন?
মো. ছায়েদুর রহমান : কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যে রিপোর্ট দিয়ে থাকেন সে তথ্যের আলোকে অডিট হয় এবং অডিটর রিপোর্ট দেয়। সে ক্ষেত্রে অডিটর ও কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেই এ বিষয়ে দায় নিতে হবে। তবে আগের চেয়ে রিপোর্টর মান উন্নতির দিকে মনে হয়।

বিজনেস আওয়ার : ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট বাস্তবায়নে সুবিধা প্রসঙ্গে বলুন?
মো. ছায়েদুর রহমান : ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট বাস্তবায়ন হলে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। আইনটি বাস্তবায়ন হলে নিরীক্ষকদের দায়বদ্ধবতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। এতে আর্থিক প্রতিবেদনের কোনো অংশে যদি কারও আপত্তি থাকে তবে তা জানানোর একটা জায়গা তৈরি হবে তা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।

বিজনেস আওয়ার : সরকারের কাছে ৬ হাজার কোটি টাকার ফান্ড তহবিল প্রস্তাব বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে?
মো. ছায়েদুর রহমান : নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ অনেক কমেছে সময়ের সাথে। এ প্রস্তাবটি বাজারে জন্য ইতিবাচক হবে, এমনটি ভেবে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ৬ হাজার কোটি টাকা তহবিল পেতে আমরা কোন কাজ করছি না। কারন বর্তমানে বাজার ভালর দিকে আছে, তাই আমরা সেই ৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবটি নিয়ে এখন ভাবছি না।

বিজনেস আওয়ার : ফেসবুকে শেয়ার দর বাড়া বা কমা তথ্যে ছড়ানো হচ্ছে এটাকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?
মো. ছায়েদুর রহমান : ফেসবুকে ছড়ানো এসব তথ্যের ফাঁদে পা দেয়া উচিত নয় বিনিয়োগকারীদের। এতে কিছু বিনিয়োগকারী লাভের মুখ দেখলেও অধিকাংশই লোকসানে পড়ে। ফেসবুকে যেসব চক্র বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দর ওঠা-নামার তথ্য দিয়ে আসছে তাদের বিষয়ে বিএসইসি কাজ করছে বলে আমরা জানি। তবে বিনিয়োগকারীর সতর্কতাই তাকে নিরাপদ রাখতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীকে ফেসবুক বা কারো ওপর নির্ভর করে শেয়ার কেনা-বেচা করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানাই।

বিজনেস আওয়ার: শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ দুর্বল (মাত্র ২০ শতাংশ) সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনের এমন উক্তি প্রসঙ্গে আপনার মতামত?
মো. ছায়েদুর রহমান : শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ গ্রহন বাড়াতে হবে। কারন ইতিবাচক বাজার ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীগণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শেয়ার ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি এবং দীর্ঘ সময় ধারণ করতে পারে। সকল দেশের পুজিবাজারেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

বিজনেস আওয়ার : বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে কিছু বলুন?
মো. ছায়েদুর রহমান : বর্তমান শেয়ারবাজার নিয়ে বিচলিত হওয়ার মত কোন কারণ দৃশ্যমান নয় । বাজারের আইন কানুন, কাঠামো সহ অনেক সংস্কার হয়েছে এবং আরও হচ্ছে। এখন বাজার ভালোর দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আপনারা দৈনিক লেনদেন পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করুন। মার্জিন লোন পরিহার করে কোম্পানির অতীত ইতিহাস যাচাই বাছাই করে বিনিয়োগ করুন। মৌলভিত্তিক কোম্পানি দেখে বিনিয়োগ করুন। এ মুহূর্তে সূচক ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো খবর। শেয়ারবাজারের এই সুবাতাস ধরে রাখতে বিনিয়োগ শিক্ষা খুবই জরুরি, বুঝে, শুনে ও বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করুন। লভ্যাংশের বিষয় বিবেচনা করে বিনিয়োগ করুন মূলধনী লাভ পেলে ভাল।

বিজনেস আওয়ার/এমএজেড

উপরে