ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

Bijoy-month-businesshour24

ডানপিটে সাজিদের ব্যবসায়ী হওয়ার গল্প

২০১৭ নভেম্বর ১৭ ১৭:৪৫:১৭

স্কুল পালানো ছিল যার নেশা। ক্লাসের ঘন্টা পড়লেই বারান্দার গ্রিল বাকিয়ে ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতেন স্কুলগন্ডি ছেড়ে। একসময়ের ডানপিটে এ তরুণ কড়া শাসনের তোপে পারিবারিক উষ্মায় ঘর থেকে পলিয়ে এলেন ঢাকায়। অসীম ধৈর্য্য আর প্রচেষ্টায় তরুণ বয়সে হয়ে উঠলেন দেশসেরা এক উদ্ভাবনী ব্যবসায়ী। এ সাফল্যর পেছনে কাজ করেছে তার নিরলস পরিশ্রম আর উদ্ভাবনী কৌতুহল।

বলছিলাম বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গ্রীণ পাল্প (ম্যাকানিক্যল পাল্প) এর প্রোডাক্ট প্রস্তুতকারক কেপিসি’র স্বতাধীকারী কাজী সাজিদুর রহমানের কথা। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কোম্পানি। ২০১৬ সালে সেরা উদ্ভাবনী শিল্পপতি হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে পুরুষ্কৃত হওয়ার সম্মান লাভ করেছেন তিনি। তার উদ্ভাবনী ছিল শতভাগ পরিবেশ বান্ধব এবং ওয়েস্টজ শূণ্য এ প্রোডাক্টের কাগজ একুশ দিনে মাটিতে মিশে যায় জৈব সার হিসেবে। পন্য প্রস্তুতিতে শুধু বিদ্যুৎ আর কাচাঁ মাল প্রয়োজন। শতভাগ পরিবেশ বান্ধব এ শিল্পের বিভিন্ন দিক ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি বিজনেস আওয়ার ২৪.কম এর সঙ্গে গল্পে মাতেন তরুণ এ উদ্যোক্তা। গল্পে অংশ নেন বিজনেস আওয়ার এর নির্বাহী সম্পাদক আমিরুল ইসলাম নয়ন ও বিশেষ প্রতিনিধি সৈয়দ শামসুর রহমান বিপ্লব।

ছেলেবেলার গল্প :


আশির দশকের মাঝামঝি কাজী আলাউদ্দিন ও ফাতিমা বেগমের ঘরে কাজী সাজিদ এর জন্ম। ছেলে বেলায়ই বাবার কঠিন শাসন, ভাইবোনের প্রশ্রয় আর মায়ের আদরে বড় হোন সাজিদ। কৌতুহলী মনটাকে দিয়েছেন পরিমিত সুযোগ। খেলাধুলা আর দুরন্তপনায় কেটে যেতো দিনের পুরোটা সময়।

ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় সাজিদ। ডানপিটে বলে পরিবারের সবারই তাকে নিয়ে ছিল একধরনের শঙ্কা। এসবের কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নতুন কিছু করার প্রতি অদম্য ঝোঁক তাকে নিয়ে গেছে অনন্য এক মাত্রায়।

পড়াশোনা …………


লেখাপড়ায় ভীষন মেধাবী। পড়ার চেয়ে অন্য কাজে ঝোঁকের কারণে পরিবারে সব সময় একটা চাপে থাকতেন তিনি। ডানপিটে স্বভাবের কারণে বন্ধুমহলে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। যে কোন অনুষ্ঠান তাকে ছাড়া যেনো হতোই না। এমনকি পাড়ায় পাড়ায় মল্লযুদ্ধেও তার জুড়ি মেলা ভার। এসব কারণে স্কুল গন্ডি পেরিয়ে বেশ ঝামেলায় কাটাতে হয় তাকে। বাবার কড়া শাসন তাকে ভুগতে হয়েছে বহুবার। গণিতে তার দক্ষতা ছিল ইর্ষা করার মতো। যে কোনো অংকই বেশ সাবলিল ভাবে সমাধান করার পটুতা ছিল তার। স্কুল জীবন শেষ করার সময় বিজ্ঞান, অংক সব বিষয়ে লেটারমার্ক ছিল। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর পারিবারিক এক বিধি-নিষেধের কারণে আর খুলনায় থাকতে পারেননি। এরপর ২০০৩ সালে চলে আসতে হয়েছে সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ঢাকা শহরে। অচেনা এ শহর ঢাকার ধানমন্ডি ১৫ নম্বরে ঠাঁই নেন। তখনকার সময়ে নিরাপদ আশ্রয় মহসিন ভায়ের হোস্টেলে উঠেন। এখানে এসে পরিচয় হয় স্থানীয় সহ-পাঠিদের সাথে। তাদের পরামর্শে জোর-জবরদস্তি করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আই ইউ বি তে সিএসইতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এখানেও পড়ার পাশাপাশি টিউশনি ছিল তার ভরসা। শিক্ষা জীবনে নিজের খরচ নিজেই চালিয়ে সম্পন্ন করেছেন উচ্চশিক্ষা। চঞ্চল স্বভাবের কারণে স্থির হতে পারেননি কোন কাজেই। বার বার বদল করেছেন উপার্জণের পথ।

লক্ষ্য ছিল তুখর ফুটবলার হওয়া :


খুলনা জেলা স্কুলের নিয়মিত ছাত্র সাজিদ ছিলেন ভীষণ ডানপিটে। পড়ালেখার চেয়ে বাইরের বিষয়ে তার ঝোঁক বেশি ছিল। খেলা তাকে টানতো চুম্বকের মতো। ফুটবল কিংবা ক্রিকেট, দুটোতেই সমান পারদর্শী। লক্ষ্যছিল দেশসেরা ফুটবলার হবেন। দীর্ঘদিন স্কুল টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে খেলে গেছেন ফুটবল আর ক্রিকেট। ভাল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ছিলেন অসাধারণ। সতীর্থরা ‘জন্টিরোডস’ খেতাবি নামে ডাকতো তাকে। জাতীয় দলের খেলোয়াড় মাজেদুল ইসলাম রানা আর সেতুর স্বতীর্থ খেলোয়াড় সাজিদ। একসাথে ওপেনিং করতেন। সেতু-রানারা ঢাকায় ক্রিকেটার হয়ে এলেও সাজিদ ফুটবলের নেশায় খুলনায় থেকে যান। এ কারণে আর এগিয়ে যেতে পারেননি। তবে পুরো খুলনা বিভাগে তার ছিল ব্যাপক পরিচিতি । অন্য দলের হয়ে ভাড়াটে হিসেবে খেলতে গিয়ে বাসায় বহুবার শাস্তি ভোগ করেছেন এই পাগলাটে খেলোয়াড়। তার পরও খেলা ছাড়েননি। এখন তার উপলব্ধি ফুটবলের নেশাই ক্রিকেটার হতে বাধা দিয়েছে।

ব্যবসায়ী হওয়ার গল্প:
হাসতে হাসতেই বললেন, আমি স্কুল জীবন থেকেই ব্যবসায়ী। যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন বাজি (পটকা) বিক্রি করেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার বাজির চাহিদা ছিল ব্যাপক। আর একটা দিক ছিল ছাত্রদের কাছে নোট বিক্রি করে অর্থ উপার্জন। পরীক্ষার ঠিক আগে এ কাজটা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছি। অংকে আমি বরাবরই ভাল। গড়ে ৯৩ শতাংশ নম্বর ছিল সব পরীক্ষায়। বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করলেও ঢাকায় এসে ভর্তি হই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্পিউটার প্রকৌশলী হিসেবে পাশ করি। ঢাকায় প্রথম এসে কিছুদিন টিউশনি করেছি ।

পরিচিত কেউ ছিল না ঢাকায়। পান্থপথে দুর সম্পর্কের এক আত্মীয় নানা ভাইয়ের অফিসে যাতায়াত শুরু করলাম কাজ শেখার জন্য। তাদের ব্যবসা ছিল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ। বিদেশ থেকে আমদানি করে পিডিবির কাছে সরবরাহ করা। আর্ন্তজাতিক দরপত্রের মাধ্যমে পুরো কাজটি হতো।

ওই সময় কৌতুহলের জেরে আমি কাজটা শিখে ফেলি। ঢাকায় এসে পরিচয় সে নানার কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করে একটা কোম্পানি করে ফেলি। পুরো কাজটা একা হাতেই সম্পন্ন করি। চীনে সফর করার সময় হুয়ায়ে ইলেক্ট্রনিক্স এপারেটারর্স মিস্টার লি নামের এক চাইনিজের সাথে পরিচয় হয়। কাজ শুরুর আগে তার সাথে যোগাযোগ করি। ব্যবসা করতে নিজের কোম্পানি জরুরী। সে মতে নিজে ট্রেড লাইসেন্স করে নিজেই দরপত্রে অংশ নিলাম। কিছু ঝামেলার পর কাজও পেয়ে গেলাম।

এখন সরবরাহের পালা। আগের কোম্পানির সাথে কাজ করার সময় চীনা হুয়ায়ে ইলেট্রনিক্স এপারেটার্স এ মিস্টার লি’র সাথে পরিচয় হয়েছিল। তার ওই কোম্পানিকে আমি বললাম এ কাজের জন্য মালামাল সরবরাহ করতে। মিস্টার লির সহায়তায় হুয়ায়ে আমার সাথে চুক্তি করলো, তাদেরকে কমিশনে কাজ দিয়ে দিলাম। এ কাজে আমার কমিশন এলো ১২ লাখ টাকার কিছু বেশি। এর পর ওই কোম্পানির হয়ে আরো ৫-৬টা কাজ করলাম। মাথায় অন্য চিন্তা এলো, এটা একঘেয়ে মনে হওয়ায় আমি ব্যবসা গুটিয়ে ফেললাম।

চীনে চিঠি দিয়ে হুয়ায়েকে জানিয়ে দিলাম। আমার সব পাওনা বুঝে নিয়ে, এবার শেয়ারবাজারে ঢুকলাম। ধীরে ধীরে শেয়ারবাজারের উপর একটা ট্রেডিং সফটওয়ারও বানালাম। দেখলাম এটা বেশ কাজের। অল্পদিনেই সাফল্য টের পেলাম। ২০১০ সালের ০১ লা নভেম্বর মাকে নিয়ে হজ্বে গেলাম, ফেরার কথা ডিসেম্বর দুই তারিখে।

হজ্জে যাওয়ার পর মনটা আবার পরিবর্তন হয়ে গেল। শেয়ার ব্যবসার প্রতি অনীহা চলে এল। মন বললো এটা জুয়ার মতো, তখনি সিদ্ধান্ত নিলাম আর শেয়ার ব্যবসা করব না।

হজ্ব শেষ হলো। মদিনা শরিফে গেলাম। ওখানে গিয়ে প্রতিদিন রোজা থাকতাম। মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে জানলাম প্রথম কাতারে বসলে ইফতার দেয় নামাজিদের জন্য। এক সময় ইফতারও পেলাম। এক কাপ কফির মতো পানীয় আর এককাপে খেজুর। নামাজ দাড়িয়ে যাওয়ায় আমি পানীয় খেয়ে খেজুর জামার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম। পুরো এশার নামাজ শেষ করে যখন হোটেলে এলাম, তখন খেজুরের কথা মনে পড়ায় আমি পকেট থেকে ওই খেজুর বের করে খেতে লাগলাম। হঠাৎ চোখ পড়লো কাপটার উপর। আরে এ তো কাগজের কাপ।

তখন এ কাপ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। ইন্টারনেট ঘেটে বের করলাম কিভাবে কোথায় এটা করা হয়। পড়তে পড়তে সিদ্ধান্ত নিলাম আর নয় এবার ঢাকায় ফেরা যাক।

সকালে উঠেই মাকে বললাম আমি ঢাকা ফিরে যাবো। কিন্তু পাসপোর্ট বা টিকেট কিছুই আমার হাতে নেই। হজ্জের সময়ে যে মোতওয়াল্লি তার জিম্মায় রেখেছিল, সে আমায় পাসপোর্ট টিকেট কিছুই দিচ্ছিল না। তার ধারণা আমি পালিয়ে যাবো। নিরাপত্তার কারণে কোনটাই দিলনা আমায়। বাধ্য হয়ে আমি পাসপোর্টের ফটোকপি নিলাম তার কাছ থেকে। ওই কপি নিয়ে আমি টিকেট কেটে আনলাম। টিকেট আনার পর সে সব কাগজ দিয়ে দিলো। হ্জ্জ থেকে মাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি নভেম্বরের একুশ তারিখে। সেদিন বিশ্রাম নিয়ে পরদিন আমার সব শেয়ার বেচে দিলাম। এর চারদিন পরে শেয়ারবাজারে পতন শুরু হয়।

এরপর কাগজের কাপের মিশন…………..
শেয়ারবাজার ছেড়ে আবার আমি পিডিবি অফিসে যাই। গিয়ে দেখি পুরোটাই রাজনীতিকরণের মধ্যে ঢুকে গেছে। মানে ব্যবসার পরিবেশ আর মনে ধরলো না। ফিরে এলাম সদ্য পাওয়া চিন্তার মধ্যে। পেপার কাপ নিয়ে বিস্তর খোঁজ খবরের পর মালয়শিয়া গিয়ে এ বিষয়ে কিছু কাজও শিখলাম।

ওখানে জানলাম চীনে এ বাজার আরো বড়। চলে গেলাম চীনে। মেশিন দেখলাম চালানোর পদ্ধতি জানলাম। কিন্তু নিখুঁতভাবে কাজ করতে আরো ভালো জানা দরকার । বড় বড় কোম্পানিরা কেউ শেখাবে না। তাই একটু ক্ষুদে কোম্পানি খুঁজে বের করে তাদের কাছে কাজের পুরোটাই শিখলাম। আমাদের দেশের জন্য কেমন মেশিন দরকার জেনে, সে হিসাবে অর্ডারও করলাম।

দেশে এসে জানলাম নতুন ইন্ডাস্ট্রি করতে ১৩ ধরনের ডকুমেন্ট লাগে। এর মধ্যে প্রতিটা কাগজ নিজের চেষ্টায় ঘুরে ঘুরে তৈরি করলাম।

ভাড়ায় কারখানার জায়গাও নিলাম। ২০১২ সালের এপ্রিলে মেশিন আসলো। ওইদিনই আমি তিনজন লোক নিয়োগ দিলাম। প্রোডাকশনে আসতে দু-তিনমাস লাগবে। ওই বছরের জুনে দু’লাখ পিস শেভরনের অফিসে সেল দিই। এভাবে আস্তে আস্তে আগাচ্ছি।

নিজেই মার্কেটিং করছি, শেভরণের পর এর মতই ৫০-৬০টা বিদেশি ও কর্পোরেট ক্লায়েন্ট পেয়ে গেলাম। এভাবে শুরুর দিকটা খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩ সালে এসে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৩-১৪ সালে আমরা কোন লাভই করতে পারিনি। ২০১৫-তে এসে ব্যবসার মোড় ঘুরে গেল। প্রাণ, নেসলে, ইস্পাহানি সিলন চা এর মতো বড় বড় কোম্পানিরা গ্রাহক হিসেবে আমার প্রোডাক্ট কিনতে শুরু করলো। ইস্পাহানি তো চায়ের সাথে দোকানে দোকানে এ কাপ দেয়া শুরু করলো।

মার্কেটিং করতে গিয়ে দেখেছি নতুন নতুন ধারণা দিলে এগিয়ে নেয়া সহজ হয় । গ্রাহক তৈরি করায় এ ব্যবসার অনেক পথ খোলা আছে। সেগুলো আস্তে আস্তে কাজে লাগাচ্ছি।

তরুণ উদ্যোক্তা পুরস্কার পাওয়ার পেছনের কথা……….
একদিন হঠাৎ এসএমই ফাউন্ডেশন আমায় ডাকলো ২০১৫’র শেষ দিকে। আমার প্রোডাক্ট নিয়ে তাদের দেয়া সম্মাননার জন্য আবেদন করতে বললেন। আমি তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম নিবন্ধন কেন করবো।

তারা বললেন, আমরা প্রতি বছর শিল্পোদোক্তাদের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগীতার মাধ্যমে পুরুস্কৃত করার জন্য নির্বাচন করি। বোর্ড নির্বাচিত একজন বছরের সেরা শিল্প উদ্যোক্তা নির্বাচিত হন। এর আগে আমরা মাত্র দু বার এ পুরুস্কার দিতে পেরেছি।

শুনে আমার মনে হলো এমন কি হবে যে আমার প্রোডাক্ট নিয়ে মাতামাতি। তবুও আমি ধীরে ধীরে এসএমই’র সব প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে শেষ করি। নিবন্ধন, সাক্ষাতকার থেকে শুরু করে ভিডিও পর্যন্ত্ সব শেষ হলো। এবার নির্বাচনের ফলাফল জানার পালা।

এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ফোন এলো ২০১৬র মার্চের দুই তারিখে রাত নয়টায়। আমাকে বলা হলো ঢাকায় থাকার জন্য। আভাস দিলো আমি সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছি।

ফোন দিয়ে বললেন, আগামিকাল চীন-মৈত্রীতে আপনার মাকে নিয়ে আসবেন। কেন আসবো জানতে চাইলে বললেন, আপনি ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পেতে যাচ্ছেন। কথাটা শুনে নিজের কানেও বিশ্বাস করতে পারিনি।

অনুষ্ঠানের দিন আমি একা ড্রাইভারকে নিয়ে জিনসের প্যান্ট গেঞ্জি আর কেডস পরে গেলাম যাচাই করতে। তবে নতুন কেনা স্যুটটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে নিয়ে চীন মৈত্রীতে গেলাম।

হলে গিয়ে পেছন দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি আমার ভিডিও টা চলছে। মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ লাগলো। গাড়ির কাছে ফিরে এসে কাপড় বদল করে ড্রাইভারকে বললাম মাকে নিয়ে আসতে। সেদিন আমায় দু মিনিট ডায়াসে দাড়িয়ে কথাও বলতে হয়েছিল।

শুরু হলো নতুন করে পথচলা………..
এর পরে তো আপনারাই সবকিছুর সাক্ষী। আমি এ প্রজেক্ট নিয়ে যতটা করবো বলে ভেবেছি, তার অনেক কাজ এখনও বাকি। যেদিন আমি প্রতিটা চায়ের স্টলে এই কাপের ব্যবহার দেখবো বা তাদের কাছে পৌছে দিতে পারবো তখন মনে করবো আমি কিছু একটা করতে পেরেছি।

আগামীর পরিকল্পনা……..
সীমিত লোকবল নিয়ে এ ভাবে এক নুতন উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সময় লেগেছে তবু থেমে যাইনি। আমাদের এই ট্রেডে অনেক বাধা বিপত্তি আছে সত্যি । কিন্তু এর ভবিষ্যৎ খুব ভাল, এর পরিচর্যা করলে গামেন্টস সেক্টর থেকেও বড় হতে পারে । আমার কারখানায় এখন ৪০জন লোকবল রয়েছে।

পূর্বাচলে নিজের জায়গায় শতভাগ গ্রীন ইন্ড্রাস্ট্রি থেকে গ্রীন প্রোডাক্ট তৈরির লক্ষে নির্মানাধীন কারখানায় স্থানান্তর করলে আরো বেশি উৎপাদনে যেতে পারব।এ সেক্টরে কারখানায় উৎপাদন করতে পানি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন, গ্যসের ব্যবহার নেই। সেই সাথে বর্জ্য সমস্যাও নেই, কেননা এ খাতে কোন ওযেস্টেজ থাকে না। সবগুলোই কাজে লেগে যায়। ফলে পরিবেশ দুষণ মাত্রা শূণ্যর কোঠায় থাকে।

এ সেক্টরে সম্ভাবনা ও সমস্যা…..


আমাদের দেশে এ শিল্প বিকাশ ঘটলে গার্মেন্টস সেক্টরের চেয়েও বড় আকার হবে। তবে সরকারের আরও আন্তরিকতা পেলে আরও দ্রুত এ সেক্টর প্রসার ঘটবে। আমার জানা মতে সম্প্রতি এ সেক্টরের দুটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ বাজারের দামের সাথে উৎপাদন খরচের তারতম্য মেলাতে পারছেনা।

ভুটানে এর ডিউটি মাত্র ৫শতাংশ, ভারতে ০(শূণ্য) শতাংশ বাংলাদেশে এর ডিউটি ৬১ শতাংশ । এ ছাড়া বিশ্বের কোন দেশে এর কোনো ডিউটি দিতে হয়না। সেদিকে বিচার করলে আমরা প্রথমে পিছিয়ে পড়ি প্রতিযোগিতা থেকে। অনেকে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন খরচের ভার বহন করতে না পেরে।

আমাদের এ ডিউটি দিয়ে কাঁচামাল আনার পর বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার শিল্পের দুষণ মুক্ত রাখছে। সেদিকে আমাদের কোনও ইনসেন্টিভ দেয়া হয় না। ডাইভারসিফিকেশন প্রক্রিয়ায় আমাদের কোনও বিশেষ সুবিধা আদায় কারার সুযোগ নেই। আমরা পিছিয়ে পড়ছি আমদানি ডিউটিতেই।

ফুডগ্রেড থেকে শুরু করে ফুড প্রসেস ও হাউজহোল্ড ইউজ জুড়ে এক বিশাল সীমানা রয়েছে পেপার গুডসের। চা পানীয় কিংবা ফুড রিলেটেড সব কিছুই এতে ব্যবহার করা যায়। এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো এ প্রোডাক্ট একুশ দিনে মাটিতে মিশে যায় জৈব সার হিসেবে। যা কৃষির জন্য বিশেষ ভাবে উপকারী।

বিজনেস আওয়ার/এন/

উপরে