ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫


ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি অবৈধ : সায়েম খান

২০১৭ নভেম্বর ১৭ ২২:১৭:১৪

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচিত কেন্দ্রীয় নেতা সায়েম খান। জন্ম প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জে। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত সায়েম খান ২০০৬-৭ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হোন।

এরপরথেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পন। ছিলেন এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সায়েম খান ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম, বর্তমান কমিটির মূল্যায়ন ও আগামীর কাউন্সিল নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বিজনেস আওয়ার ২৪.কমের প্রতিবেদকের সঙ্গে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন বিজনেস আওয়ারের স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদ।

বিজনেস আওয়ার:গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আপনাদের কমিটির মেয়াদ শেষ। দুই বছর অতিক্রম করে তৃতীয় বছরে চলছে। এই সময়ে আপনাদের অর্জনগুলো যদি বলতেন..

সায়েম খান:হ্যাঁ, গঠনতন্ত্র অনুসারে আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ। মেয়াদ শেষ করে তৃতীয় বছরে চলছে। কিন্তু আপনাদের বুঝতে হবে মেয়াদ শেষ মানেই এই নয়, কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে ভ্যাকুয়াম করে দিতে হবে। হয়তো মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে এই কমিটি তার আইনগত ও নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না আমাদের নতুন কমিটি গঠন করার বৈধতাও এই কমিটির হাতে। সুতরাং আপনি বর্ধিত এই সময়টাকে ট্রানজিশনাল পিরিয়ড হিসাবে ধরতে পারেন। অতিবাহিত সময়ের মধ্যে অর্জন যদি ধরেন, তাহলে বলতে হবে কোন কমিটির সবচেয়ে বড় সফলতা হল নির্ধারিত মেয়াদ ভালোভাবে পার করা। বর্তমান কমিটি সেটা খুব মসৃণভাবে পার করেছে। এর বাইরে মোটা দাগে বলতে গেলে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে আদর্শিক জায়গা থেকে কাজ করেছে, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সাথে যুক্ত ছিল (কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে)। সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা এই কমিটির অন্যতম একটা অর্জন।

বিজনেস আওয়ার:আপনাদের মেয়াদে ছাত্রলীগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের সন্তান এমনকি তাদের ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের পদায়নের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে যদি বলতেন..

সায়েম খান:অন্য সংগঠন থেকে আসা কাউকে যখন ছাত্রলীগে পদায়ন করা হয় তখন ছাত্রলীগের কর্মীদের অপমান করা হয়। কেননা, ছাত্রলীগ কর্মী সংকটে ভোগা কোন ছাত্রসংগঠন নয়। যদি কেউ অন্য সংগঠন থেকে আসা কাউকে ছাত্রলীগে পদায়ন করে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, যে নেতা পদায়ন করেছে সে ছাত্রলীগের আদর্শে বিশ্বাসী নয়। তবে অধিকাংশ সময় দেখা যায়, এটা একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। ছাত্রলীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য,ব্যর্থ করার জন্য স্বাধীনতা বিরোধী এইসব সংগঠন থেকে কর্মী পুশ করে ছাত্রলীগের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করা হয়। এই রকম অভিযোগ যেসব জায়গায় উঠেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বিজনেস আওয়ার:এই ব্যর্থতা ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর বর্তায় কি না?

সায়েম খান:একভাবে বর্তায়, তবে সব ক্ষেত্রে না। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যেমন তার রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে থাকে। তেমনি স্থানীয় ছাত্রলীগও রাজনৈতিকভাবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় এটা হয়ে থাকে।

বিজনেস আওয়ার:ছাত্রলীগের সবশেষ সাধারণ সভায় আপনারা কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপর স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনেছিলেন… স্বেচ্ছাচারিতা বলতে আপনারা আসলে কি বুঝিয়েছেন?

সায়েম খান:স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তোলা হয় নি। দেখেন,যদি আমরা আমাদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে স্বেচ্ছাচারী বলি তাহলে তো আমার বা আমাদের সাধারণ সভায় কথা বলারই সুযোগ থাকার কথা ছিল না। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক গণতান্ত্রিক ছিলেন বলেই আমরা সাধারণ সভায় কথা বলতে পেরেছি। তবে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যখন কোন নির্দিষ্ট বলয় দ্বারা প্রভাবিত হয় তখন তারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যান। এই পক্ষপাতদুষ্টতা এবং বলয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেন। সেটাকে অনেকে স্বেচ্ছাচারিতা বললেও বলতে পারেন।

বিজনেস আওয়ার:ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ সংগঠনের তহবিলের হিসেব চেয়েছিলেন। সেটি কি পেয়েছেন?

সায়েম খান:হাঁ, সেটা এক রকম স্পষ্টই হয়েছে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকই বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২,৩০,০০০ টাকা প্রতি মাসে দিয়ে থাকেন। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের কথা ওঠেও নাই বা সেটা প্রকাশও হয় নি।

বিজনেস আওয়ার:বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মেলন হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এটা নেতৃত্বের ব্যর্থতা কি না?

সায়েম খান:ব্যর্থতার প্রশ্ন তো সেখানে আসবে যেখানে সফলতার ভাগিদার হওয়ার সুযোগ আছে। ছাত্রলীগের অধিকাংশ জেলা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রয়েছেন। সেই নেতা কমিটি করার সময় কতটুকু ভুমিকা পালন করতে পারেন তা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। যদি কমিটি দেয়ার এখতিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার হাতে থাকে তাহলে সেখানে কমিটি না হলে সেই ব্যর্থতা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার। মূলকথা নেতা বানানোর কর্তৃত্ব যার হাতে থাকে, ব্যর্থতার দায়ও তার।

বিজনেস আওয়ার:এই সময়ে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে দাবি উঠছে। আপনি কি মনে করেন..

সায়েম খান:ছাত্রলীগের নতুন কমিটি নিয়ে দাবি উঠেছে এই ধরণের কথা অবান্তর। যে ছাত্র সংগঠনগুলোর গঠনতন্ত্র নাই তাদের কমিটির দাবি করতে হয়। কারণ তাদের সবকিছু অনির্দিষ্ট থাকে। ছাত্রলীগ এই দেশে একমাত্র ছাত্রসংগঠন যার একটি পুর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র আছে। তাই ছাত্রলীগের কমিটি দুই বছর পর হওয়া বাধ্যবাধকতা। এটা কোন দাবি না।

বিজনেস আওয়ার:ছাত্রলীগের নতুন কমিটির প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভব করছেন..

সায়েম খান:আমি কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন করতে পারি, “নতুন কমিটির প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভব করা হবে না”? নতুন কমিটি মানে নতুন আয়োজন, নতুন নেতৃত্ব। নতুন করে সংগঠনের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন তৈরি হওয়া। এটাকে আপনি বলতে পারেন স্কুল শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই পাওয়ার মত। নতুন বইয়ের সুগন্ধ যেভাবে শিক্ষার্থীকে গোগ্রাসে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করে তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন সংগঠনের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

বিজনেস আওয়ার:সামনে নির্বাচন। নির্বাচনের আগে নতুন কমিটির দাবি কতোটুকু যৌক্তিক..

সায়েম খান:দেখুন, ছাত্রলীগ একটি ছাত্রসংগঠন। এটা নির্বাচনমুখী কোন দল না। তবে হ্যাঁ, ছাত্রলীগ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট সংগ্রহে সহায়তা করে থাকে। ছাত্রলীগের যে কমিটিই থাকুক তারা সেটা করবে। এর চাইতে অল্প সময়ের দূরুত্বে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়েছে- ২০০৬ সালে। ৬ মাস দূরত্বে নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রলীগের ঐ সম্মেলন হয়েছিল। ১৯৭০ সালেও নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়েছিল। আর অধিকাংশ জেলাগুলোতে নতুন কমিটি দেয়া হচ্ছে। সারাদেশে যদি এইসব নতুন কমিটি দিয়ে নির্বাচন করা হয়, তাহলে কেন্দ্রে কেন নতুন কমিটি দিয়ে নির্বাচন মোকাবেলা করা যাবে না? আমি তো মনে করি সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটিকে দায়িত্ব দিলে তারা অনেক উৎসাহ, উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে।

বিজনেস আওয়ার:যদি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন কমিটির উদ্যোগ না নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে আপনারা কি করবেন..

সায়েম খান:দেখুন, আমি আগেই বলেছি কমিটিটা দাবির বিষয় না। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এটা বাধ্যবাধকতা। যাদের হাতে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী এই বাধ্যবাধকতা দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছিল তারা যদি নেত্রীর সেই পবিত্র আমানতের খেয়ানত করে এ দায় তাদের নিতে হবে। এখানে যেহেতু আমাদের হাতে কর্তৃত্ব নাই, তাই আমাদের দায়ও নাই। অনেকে বলেন, যারা নতুন সম্মেলন নিয়ে কথা বলে তারা পারলে পদত্যাগ করুক। দেখুন, ২৬ জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত আমরা বৈধ। এর মধ্যে ১২টা পর্যন্ত আমরা কোন ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু যখন রাত ১২টা ১ মিনিট তখন থেকে এই কমিটি গঠনতান্ত্রিকভাবে অবৈধ। অবৈধদের আর পদত্যাগ করার বৈধতা থাকে না। তাই শুধু বলবো, কর্তৃত্ব যাদের হাতে তারা যদি এই দায় শোধ না করে, তাহলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

বিজনেস আওয়ার:আপনারা শিক্ষার্থীদের সামষ্টিক সমস্যা নিয়ে আন্দোলন না করে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে গুটি কয়েকজনতে সহযোগিতা করেন এমন আলোচনা সংগঠনে জোরালো। বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন..

সায়েম খান:দেখুন, এমন কিছু যদি হয়ে থাকে সে দায় সংগঠনের না। সে দায় কর্তৃত্বের। কারণ, কর্তৃত্ব নির্ধারণ করে কি ধরণের কর্মকাণ্ড হাতে নিতে হবে।

বিজনেস আওয়ার:ডাকসু, জাকসু, সাকসু, রাকসু, চাকসু নিয়ে আপনাদের ভূমিতা জোরালো নয় এমন অভিযোগ রয়েছে বামদলগুলোর। অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

সায়েম খান:এটা মোটেও সত্য নয়। ছাত্রলীগ সব সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। অন্য কেউ তো বলতে পারেন না- ছাত্র সংসদের দাবিতে কোন ধরণের ভুমিকা জোরালো আর কোনটা জোরালো না। যেমন- ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন আপনার কাছে জোরালো মনে না-ই হতে পারে। কিন্তু এর তাৎপর্য তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। দেখেন, ছাত্রলীগ একটি নিয়মতান্ত্রিক সংগঠন। তাই সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করা হয় নিয়মের মধ্যে থেকে যদি দাবি দাওয়া আদায় করা যায় তাহলে নিয়ম ভাঙার কি দরকার। ছাত্রলীগের প্রশাসনের সাথে আলাপচারিতার সেই সুযোগ আছে। ছাত্রলীগ সেটা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে করার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসাবে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে ছাত্রলীগের কমিটি আছে সেদিকে লক্ষ্য রাখলেই বুঝতে পারবেন।

বিজনেস আওয়ার:সম্প্রতি জানা গেল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজসেবা সম্পাদক পদের দাবি করছেন দুইজন নেতা। এক পদে দুইজনকে কিভাবে পদায়ন করা হলো?

সায়েম খান:দেখুন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এটা হওয়ার কোন সুযোগ নাই। কেন্দ্রের একজনের পদ শুন্য না হওয়া পর্যন্ত ঐ পদে কাউকে নিয়োগ বা পদায়ন করা যায় না। আর কেন্দ্রের একজন নেতাকে অব্যাহতি দিতে হলে অনেক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কেন্দ্রের কোন নেতাকে অব্যাহতি বা বহিষ্কার করতে হলে সেটা বর্ধিত সভায় অনুমোদন করাতে হয়। এমনটা হয়েছে কিনা জানি না। তবে এমনটা হয়ে থাকলে সেটা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন। এমন হলে পরবর্তীতে দেখা যাবে সংগঠনের কোন পদই নিরাপদ থাকবে না।

বিজনেস আওয়ার/ সাআ

উপরে