ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

Bijoy-month-businesshour24

রাজনীতিতে অস্বাভাবিকতা ভয়ংকর

২০১৭ নভেম্বর ১৭ ২২:২৫:০২

চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড. মীজানুর রহমান শেলী। তিনি ১৯৬৪-৬৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ড. শেলী ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৬ -৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের

সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রধান ছিলেন। ১৯৮০ সালে স্বেচ্ছায় সরকারি কর্মকর্তার পদ ত্যাগ করে আর্থ সামাজিক পরামর্শক, উপদেষ্টা ও বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন ড. শেলী। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি কিছুদিন। বুধবার বিকেলে ড. শেলী তার ধানমন্ডির অফিসে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিজনেস আওয়ারের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরছেন বিজনেস আওয়ারের সিনিয়র রিপোর্টার সাগর আনোয়ার।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন জানতে চাইলে ড. মীজানুর রহমান শেলী বলেন, বাংলাদেশে ছদ্মবেশী একদলীয় শাসন চলছে। এই ছদ্মবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই ভালো হতো। আমাদের দূর্ভাগ্য হলো বিএনপি এই একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে শক্তভাবে প্রতিবাদ করতে পারছে না। সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, গুমের বিরুদ্ধে বিএনপি কিছু প্রতিবাদ করছে কিন্তু সমাজে সেই প্রতিবাদের প্রভাব পড়ছে না। এটাই বিএনপির ব্যর্থতা।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে আনতে গিয়ে আমরা বার বার গণতন্ত্রকে বিকৃত ও কলুষিত করেছি। দেশে গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র, কেন্দ্রীভূত ও ব্যক্তিগত শাসন চলছে। আমরা নেত্রী কেন্দ্রীক রাজনীতি করছি। এই অভিজ্ঞতাই আমাদের এখানে ২৭ বছর যাবত চলছে। আমরা যে কারণে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিকে বিসর্জন দিলাম এখন কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে প্রাইমমিনিস্টারিয়াল গণতন্ত্র চলছে। কারণ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী একই সাথে দলের প্রধান, সংসদের নেতা আবার কেবিনেটেরও প্রধান। মানে, একের মধ্যে তিন। একই ব্যক্তি একসাথে অনেক কাজ করলে ভূল হয় বেশি, কেননা তাকে স্তাবক, চাটুকাররা ঘিরে রাখে। এরশাদের সময়ও এমনটা হয়েছিল। এরশাদ যখন ক্ষমতা ছাড়েন তখন তাকেই ছয় বছর জেল খাটতে হয়েছে। বাকিরা কিন্তু কিছুদিন পর বেরিয়ে গেছে। এজন্য শীর্ষ নেতৃত্বের সচেতনতা প্রয়োজন।

আসলে বাংলাদেশের মানুষ এখন রাজনীতি নিয়ে কি ভাবছে বলে আপনি মনে করেন? জানতে চাইলে ড. মীজানুর রহমান শেলী বলেন,আসলে মানুষ সারাবিশ্বে নানান ধরনের দেখতে দেখতে এখন পরিবর্তনের নাম শুনলেই ভয় পায়। মানুষভাবে বাংলাদেশ তো আবার ইরাক সিরিয়া হবে না? স্বাভাবিক পরিবর্তন হলে তো ভালো কিন্তু অস্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত ভয়ংকর হতে পারে। ক্ষমতা ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা সহসাই সরকারের মধ্যে নেই। এজন্য জাতীয় সংলাপ প্রয়োজন। কেউ যাতে ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের প্রতি প্রতিশোধ না নেন এজন্যই এই সংলাপ প্রয়োজন। এজন্য একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা করা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য আমাদের এখানে মধ্যবর্তী সরকার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের জন্য একটা নিরাপদ এক্সিট রুট প্রয়োজন। মধ্যবর্তী সরকারে যারা থাকবেন তাদের প্রধান দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে।

ড. মীজানুর রহমান শেলী বলেন,এখন প্রশ্ন হলো সেই নেতৃত্ব কেমন হবে? আসলে আমার কাছে পূর্ণ তথ্য নেই। আসলে হু আর দ্য প্লেয়ার্স। পরিষ্কার করে বলা যাবে না । আসলে মধ্যবর্তী সরকার সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

দেশ নানান গুজবে ভাসছে। আপনি কি মনে করেন.. জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে গুজব নিয়ন্ত্রণ করা বড় মুশকিল। কোথায় কি হচ্ছে কে জানে? আসলে সরকার পতনের জন্য বিরোধীদলের আন্দোলন লাগে না। সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমই যথেষ্ট। যখন গণমাধ্যমগুলো সারাক্ষণ সরকারের গুণগান করে তখনই গুজম বেড়ে যায়।

আপনি মধ্যবর্তী সরকার তো সংবিধানে নেই তাহলে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,সংবিধানে থাকুক, না থাকুক সেটা বড় কথা নয়। জনগণ চাইলে নিয়ম কানুন বানানো যায়। সংবিধান তো আর ঐষি বাণী নয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন, সেটা তো সংবিধানে ছিল না। এটা তো বানানো হয়েছিল।

১/১১ এর প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই সচিব বলেন, ১/১১ এর ক্রীড়নকদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না। ১/১১ অন্যান্য সামরিক শাসনের মতো ছিল না। এটা ছিল ঘটনা চক্রের বিবর্তনের মতো। কিছু সামরিক ও বেসামরিক আমলার সমন্বয়ে এটা ছিল। ১/১১ তো জাতিসংঘ ও অন্যান্য দাতা সংস্থার সমর্থনেই ছিল কিন্তু তাদের কোনো রাজনৈতিক ভিশন ছিল না বলেই তারা ব্যর্থ হয়েছে।

বিএনপির আন্দোলন কেন জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারছে না ? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপি আন্দোলন করতে পারে না এর প্রধান কারণ হলো যারা একবার কোর্ট টাই পড়ে ফেলে তারা সহজে রাস্তায় নামতে পারে না। আন্দোলন করার ট্রাডিশন বিএনপির নেই।

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিষয়ে ড. মীজানুর রহমান শেলী বলেন, তার তো ক্যান্সার আগে ছিল না। এখন হঠাৎ করে কেন ক্যান্সার হলো।

আপনি বললেন, বিএনপি আন্দোলন করতে পারছে না। তাহলে আওয়ামী লীগের শঙ্কা কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে ২০১৪ সালের নির্বাচন তো ভালো হয়নি। এটা আওয়ামী লীগও জানে। তারা সমাজের সকল মানুষের সমর্থন পাচ্ছে না। বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক কারো পূর্ণ সমর্থন সরকার পাচ্ছে না। এছাড়া নিজেদের মধ্যে তাদের প্রতিনিয়ত সংঘাত হচেছ। আবার আগামী নির্বাচন তারা কিভাবে করবে এটা নিয়েও তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। আবার ইলেকশন নাও হতে পারে। আবার বিস্ফোরণও হতে পারে। এটাই আওয়ামী লীগের শঙ্কা।

তিনি আরো বলেন, দেশে যদি জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে দমিয়ে রাখা হয় তাহলে চরমপন্থি শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা থাকে। ইরাক, সিরিয়ায় একনায়কতন্ত্র ছিল বলেই সেখানে কিন্তু এমনই হয়েছে। তাই এ ব্যাপারে সবার সচেতন হওয়া দরকার।

আপনি কী রাজনীতিতে আসবেন? জানতে চাইলে ড. মীজানুর রহমান শেলী বলেন, সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী , স্বাধীনতার পক্ষের, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী ভালো কিছু হলে অবশ্যই থাকবো। আর সাংগঠনিকভাবে সচেতন হয়ে কেউ আসলে অবশ্যই সেটা ভেবে দেখা যাবে।

বিজনেস আওয়ার/ সাআ

উপরে