ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

Bijoy-month-businesshour24

প্রবাসীদের কষ্টের রেমিটেন্সে আমরা..

২০১৭ নভেম্বর ১৭ ২৩:০৭:৫১

কড়া রোদে দাঁড়িয়ে রডের ফ্রেম বাধছে ধোবাউড়ার ফুলপুর গ্রামের শফিকুল। সিঙ্গাপুর শহরের এক কোনে উইচান প্রজেক্টে। আজ থেকে প্রায় তের বছর আগে সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করে এক বন্ধুর হাত ধরে এ বিদেশ বিভুঁইয়ে আসা। এমন গরমে রোদের মাঝেই কাজ করতে করতে দিন পার করতে হয় তাকে। শফিকুলের মতো আরো হাজারও শ্রমিক বিদেশের মাটিতে আনস্কিল লেবার কাজ করছে। দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে শফিকুল স্কিল লেবার হলেও তার হাতে টাকা জমেনি একটিও। যা আয় করে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয়। সংসারের খরচ আর ঋন শোধ করতেই অনেকটা সময় কাটিয়েছে সে।

এমন অনেক প্রবাসী আছেন যারা সৌদি আরব বা আরব দেশগুলোতে কাজে যায় সেখানে জীবনযাপন আরও কঠিন। একবেলা খেয়ে বাকী সময় অনাহারে কাটিয়ে যে কটা টাকা জোটে তাই দেশে পাঠিয়ে দেয় তারা। এমন ঘটনা দেখা গেছে মালয়শিয়া, ব্রুনাই, কাতার অথবা ইউরোপিয় দেশ গুলোতে থাকা প্রবাসীদের মাঝে। তারপরও প্রবাসে যেতে আগ্রহের কমতি নেই মানুষের।

অদেখা সে কষ্টের কথা বলতে পারে এমন কাউকে পাশে পায়না তারা। তাদের সহানুভুতি দেখানোর বেলায় এদেশে থাকা পরিবার নিরবেই তাদের চাহিদার পুরনেই ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন সময় শিল্পীদের গানে ফূটে ওঠে তাদের কিছূ চিত্র। তারপরও সবটুকু নয়। এগুলো তো গেল তাদের কষ্টের কথা। এর উপর আবার আছে দালালের প্রকোপ। প্রতিটা দেশেই এমন অনেককে খুঁজে পাওয়া যাবে যারা দেশিদের পেয়ে তাদের লুটেছে। অথচ এর উল্টো হওয়ার কথা ছিল।

এমন কষ্ট করে যখন দেশে ফেরে তাদের খোজ রাখে এমন প্রতিষ্ঠান নেই যারা প্রবাসীদের থিতু হতে সহায়তা করবে। সরকারী ভাবে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রনালয় আছে প্রবাসীদের জন্য। কিন্তু তাদের তদারকীতে যারা আছেন তাদের হাতে এমন চিত্র তুলে দিলেও বিদেশ ফেরত কর্মীদের দেখভাল করবে এমনটা নেই।

গণমাধ্যমে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকার হিসেবের পাশাপাশি যে মানুষটা এ কাজের সহায়ক তার খবর নেবে কে? প্রতিটা দেশেই এমন শ্রমিকদের সহায় হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশে এর কোনো হিসেব রাখা খুবই জটিল। বৈশ্বিক পরিবর্তনে আমাদের দেশও ক্ষতির মুখে পড়েছে এটা যেমন সত্য পরিচর্যা কমেছে সেও মেনে নিতে হবে।

এদিকে ভারত, ফিলিপাইন , থাইল্যান্ড সহ সাউথ এশিয়ার শ্রমবাজারে আমরা অবহেলিত। কিন্তু কেন? আমাদের তো সবই ছিল। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রাপ্তি কমেছে। তবে দেশগুলোর মধ্যে প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশ ও ভারতে। সে তুলনায় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এতটা প্রকট হয়নি।

পেছন ফিরে হিসেবের খাতা দেখা হলে সেখানেও কিন্তু এসব কথা বলা নেই। সম্প্রতি সময়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এখন একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। দুই বছর ধরেই এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০১৭ সালেও একই প্রবণতা। যেমন ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স কমেছিল ১ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ৪২৯ বিলিয়ন বা ৪২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ নিয়ে তাদের হালনাগাদ উন্নয়ন নামে সম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রবাসী আয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী সব দেশে প্রবাসী আয় কমলেও এর গভীরতা ও ধারাবাহিকতার দিক থেকে পরিস্থিতি খারাপ বেশি বাংলাদেশ ও ভারতের। অর্থাৎ এই দেশ দুটিতে প্রবাসী আয় বেশি কমেছে এবং তা ধারাবাহিকভাবেই কমছে।

নতুন খড়গ হলো এদেশের প্রবাসীদের যারা উপসাগরীয় দেশ গুলোতে একটু ভাল আছেন। বাংলাদেশ ও অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় পায় মূলত মধ্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। এসব দেশের অর্থনীতির আয়ের মূল উৎস জ্বালানি তেল। আর এই জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার কারণেই প্রবাসী আয়ে ধাক্কা লেগেছে। তেল থেকে আয় কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো নানা ধরনের আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছে। যেমন, অনাবাসী নাগরিকদের ওপর কর আরোপ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও ভর্তুকি হ্রাস। এসব কারণে দেশগুলোতে থাকা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। আর এরই প্রভাব পড়েছে প্রবাসী আয় প্রবাহে।

এখানে হিসেবটা দেখাতে হলো এ কারনে যে আমাদের দেশে যারা রেমিটেন্স পাল্লা ভারি করেন সে শ্রমিক ভায়েরা কি তাদের যোগ্য সমাদর পান? অথবা গেল দু-তিন বছরে যে মাহিলা গৃহকর্মীরা প্রবাসী হয়ে নির্যাতনের স্বীকার হলেন তারা! এমন প্রমেশ্নর উত্তর শুধুই কি মিস্টার রেমিটেন্স? কবে মিলবে আমাদের সেসব প্রবাসীদের যথাযোগ্য সমাদর যারা দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন।

এস রহমান, কাতার প্রবাসী

উপরে