ঢাকা, বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮, ৪ মাঘ ১৪২৪

Queen-south-businesshour24
delta-hospital-businesshour24

‘সিকিউরিটিজ হাউজের শাখা বাড়াতে হবে’: শেরিফ এম আর রহমান

২০১৭ নভেম্বর ২৭ ১১:৪৩:১৭

দেশের শেয়ারবাজারের বৃত্ত দিন দিন বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে বড় শেয়ারবাজারের মূলধন। আগের মতো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে পুঁজি হারানোর ঘটনা অনেকটাই কমে এসেছে। যেকোন সময়ের চেয়ে বর্তমান শেয়ারবাজার অনেক স্মাট। কিন্তু সেই তুলনায় স্মাট হতে পারেনি সিকিউরিটিজ হাউজগুলো। এখনও অনেক সিকিরিটিজ হাউজের সেবা ও মানের অভাব রয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের কাছে আমাদের উন্নত সেবা ও মান পৌচ্ছে দিতে ভাল সিকিউরিটিজ হাউজের শাখা বাড়ানোর ওপরে জোর দিয়েছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজ ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেরিফ এম আর রহমান।

ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজে শেরিফ এম আর রহমান যোগদানের আগে অ্যাপেক্স ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন। তিনি এ্যাম সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রুমার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেড, এবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড এবং ইক্যুইটি পার্টনারস সিকিউরিটিজ লিমিটেডের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। তিনি দীর্ঘ ২১ বছরের বেশি সময় ধরে শেয়ারবাজারের সক্রিয়ভাবে জড়িত আছেন।

তার দীর্ঘ কর্মজীবনে, তিনি ব্রোকারেজ ফার্ম, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং কাস্টডিয়াল ব্যাংকের পরিচালনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পেশাজীবী প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার জন্য রহমানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি শেয়ারবাজারের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং উইংস বিভিন্ন প্রবর্তিত ধারণা এবং ব্যবসা মডেলের জন্য সুপরিচিত। শেরিফ এম আর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.কম এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এনএসইউ ও ইডব্লিঊইউ’র বিভিন্ন গবেষণার সাথে জড়িত।

সম্প্রতি সিইও শেরিফ এম আর রহমান বিজনেস আওয়ার ২৪.কমের মুখোমুখি হন রাজধানীর মতিঝিলে তার ব্র্যাক ইপিএল সিকিউরিটিজ হাউজ কার্যালয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

বিজনেস আওয়ার : শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন?

শেরিফ এম আর রহমান : শেয়ারবাজার ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। এরই ধারাবহিকতায় বাড়ছে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের (ঢাকা ও চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ) লেনদেন। অতীতের চেয়ে সবগুলো সূচক এখন উর্ধ্বমুখী। বেড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় লেনদেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও লেনদেন ফিরে আসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বিদেশি বিনিয়োগ। তাদের সম্মিলিত লেনদেনে বেড়েছে উভয় শেয়ারবাজারে মৌলভিত্তি কোম্পানিগুলোর কদর। ফলে পজেটিভ গতি সঞ্চারিত হচ্ছে শেয়ারবাজরের সর্বক্ষেত্রে। অবশ্য এ অবস্থানে আসতে আমাদের প্রায় ৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

বিজনেস আওয়ার : সিকিউরিটিজ হাউজের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে বলুন?

শেরিফ এম আর রহমান : ২০১০ সালের ধসের কারণে দীর্ঘসময় ধরে শেয়ারবাজারে মন্দা অবস্থা ছিল। ফলে অনেকে সিকিউরিটিজ হাউজ চালিয়ে যেতে হিমশিম খেয়েছে। ওইসময় হাউজ চালিয়ে যাবার মতো সবার অবস্থান সমান ছিল না। তাদের সেবা ও গুনগত মান একও ছিল না। একারণে বেশ কিছু সিকিউরিটিজ হাউজ সেবা ও মানের দিক দিয়ে অনেকের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তবে বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি নানামুখী পদক্ষেপে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগে সুদিন এসেছে, এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছে হাউজগুলো। ইতিমধ্যেই তারা নতুন নতুন সেবা ও গুনগত মান দিয়ে আকৃষ্ট করছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে অতীতের চেয়ে ভাল অবস্থানে যাচ্ছে সিকিউরিটিজ হাউজগুলো। তবে সব সিকিউরিটিজ হাউজগুলোকে পুরোপুরি দাড়াতে সময় লাগবে।

বিজনেস আওয়ার : সিকিউরিটিজ হাউজের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

শেরিফ এম আর রহমান : শেয়ারবাজারে বর্তমানে ২৪০টি সিকিউরিটিজ হাউজ রয়েছে। অপরদিকে শেয়ারবাজারের পরিসর বড় হচ্ছে। তাই সিকিউরিটিজ হাউজের আকার আরো বড় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে নতুন সিকিউরিটিজ হাউজ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিসর বড় বিষয়টি এমন নয়। তবে হাউজের পরিসর বাড়ানোর জন্য পুরোনো হাউজগুলোতে নতুন নতুন শাখা করা জরুরী। অবশ্য এই শাখাগুলো ঢাকায় নয় বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে করা যেতে পারে । কারণ এতে বিভাগীয় শহরে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়বে।

বিজনেস আওয়ার : ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম সম্পর্কে বলুন?

শেরিফ এম আর রহমান : ‘ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম’ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি ভাল উদ্যোগ। বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে এ প্রোগ্রাম শেয়ারবাজার বিনিয়োগে পজিটিভ ভূমিকা রাখবে। এ উদ্যোগের কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে জানতে পারবে। বুঝা সম্ভব হবে কোন খাতে বিনিয়োগ করলে তারা লাভবান হবে। জানতে পারবে কোম্পানির আয়, শেয়ার প্রতি মুনাফা (ইপিএস), শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস), পিই রেশিও, উদ্যোক্তা পরিচালকের পরিকল্পনাসহ কোম্পানির ব্যবসার ধরণ। এক কথায় ভাল শেয়ার সম্বন্ধে নিজেরাই বিচার বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে। ফলে তারা গুজবে নয় জেনে, শুনে ও বুঝে বিনিয়োগ করবে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগে একধরনের পেশাদারিত্ব হবে।

বিজনেস আওয়ার : রাষ্ট্রীয়, বহুজাতিক ও দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রয়োজন আছে কি? তালিকাভুক্ত না হবার কারণ এবং তালিকাভুক্ত করতে আপনার পরামর্শ?

শেরিফ এম আর রহমান : শেয়ারবাজারের মূলধন ও পরিসর ধারাবাহিকভাবে বড় হচ্ছে। আবার দেশের জিডিপিতেও শেয়ারবাজারের অবস্থান দিন দিন শক্ত হচ্ছে। এ অবদান আরো বড় ও শক্ত করতে শেয়ারবাজারের মূলধনী কোম্পানির অংশগ্রহন বাড়াতে হবে। তাই শক্তিশালী শেয়ারবাজার গঠনে রাষ্ট্রীয়, বহুজাতিক ও দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সময়ের দাবি। কিন্তু এসব কোম্পানিগুলো বিভিন্ন জটিলতার কারনে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এর মধ্যে সরকারি কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ আমলাতন্ত্র জটিলতা। বহুজাতিক ও দেশের বড় বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ জবাবদিহিতা। তারা চায় না তদের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পাবলিকের সামনে চলে আসুক। কিন্তু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে এসব কোম্পানিগুলোকে আর্থিক প্রতিবেদন, স্বচ্ছতাসহ ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে জবাবদিহি দিতে হবে। এভয়ে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে চাচ্ছে না। আবার কেউ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাগ অন্য কাউকে দিতে চায় না। ভাগ পেতে হলে অবশ্যই তাকে খুশি করতে হবে। হতে পারে ব্যবসার সম্পদের সমপরিমান বা তার চেয়েও বোশি দিয়ে কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের চাহিদা অনুসারে নানাধরনে সুবিধা দিয়ে তাকে শেয়ারবাজারে আনতে হবে।

বিজনেস আওয়ার : শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও পরিসর বাড়াতে কি ধরণের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

শেরিফ এম আর রহমান : পরিসর বাড়ানোর আগেই প্রয়োজন শেয়ারবাজারে মৌলভিত্তি বা ভাল মানের কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কারন ভাল কোম্পানি শেয়ারবাজারের আসলে সাধারণভাবেই শেয়ারবাজারের পরিসর বড় হবে। এছাড়াও বাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন খাতের নতুন নতুন প্রোডাক্ট আনতে হবে। কারন নতুন নতুন প্রোডাক্ট বিনিয়োগকারীদের চাহিদা পূরন করবে। তবে এসব প্রোডাক্ট আনার আগে অনুসন্ধান করে বুঝা উচিৎ বিনিয়োগকারীরা কোন প্রোডাক্টে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কারন এসব প্রোডাক্টে তারাই মূলত বিনিয়োগ করবে। একই সঙ্গে এ বাজারের উন্নয়নে সচল করতে হবে ডেরিভেটিভস, ইটিএফ ও বন্ড মার্কেট। আবার এই শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও এই প্রভাব আছে। সুতরাং শেয়ারবাজারের পরিসর বড় করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে।

বিজনেস আওয়ার : বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে কিছু বলুন?

শেরিফ এম আর রহমান : বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত অর্থ থাকলে, তা নিয়ে শেয়ারবাজারে আসুন। ধার করে টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্চনীয়। বিনিয়োগের আগে অবশ্যই শেয়ারবাজার সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ করা উচিৎ বিনিয়োগকারীদের। এ জ্ঞানের জন্য ‘ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম’ গুরুত্বপর্ণ অবদান রাখবে। শেয়ারবাজরের উন্নয়ন নিয়ে ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে ব্যাপক কাজ করছে। আবার শেয়ারবাজার বিষয়ক জ্ঞান দানের জন্য বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তাই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আসার এসব প্রশিক্ষণ নেবার ওপরে বিনিয়োগকারীদের জোর দিতে হবে।

বিজনেস আওয়ার/১৯ নভেম্বর/এন

উপরে