ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

Bijoy-month-businesshour24

বসুন্ধরা পেপারসের শেয়ার ২৬৪ শতাংশ অতিমূল্যায়িত

২০১৭ নভেম্বর ০৭ ১১:৫০:৫৩

রেজোয়ান আহমেদ: সম্প্রতি বিডিং সম্পন্ন করা বসুন্ধরা পেপারস মিলসের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ি কোম্পানিটির কাট-অফ প্রাইস ২৬৪ শতাংশ অতিমূল্যায়িত হয়েছে। এমনকি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) ১০ শতাংশ কমে ইস্যু করা হলেও সেটা হবে ২২৭ শতাংশ অতিমূল্যায়িত দর। এর আগে অন্য কোন কোম্পানির শেয়ার দর যোগ্যতার চেয়ে এতো বেশি নির্ধারিত হয়নি।

বসুন্ধরা পেপারস মিলসের কাট অফ প্রাইস হিসাবে ৮০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই দরে কোম্পানি ১২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। আর আইপিওতে ১০ শতাংশ কমে প্রতিটি শেয়ার ৭২ টাকা দরে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।

রেড হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ি, ব্যবসায়িক পারফরমেন্সের ভিত্তিতে বসুন্ধরা পেপারস মিলসের প্রতিটি শেয়ার দর সর্বোচ্চ ২২ টাকা হতে পারে। ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে শেয়ারটির এই দর আসে। এ হিসাবে কোম্পানিটির কাট-অফ প্রাইস ৫৮ টাকা বা ২৬৪ শতাংশ ও আইপিও দর ৫০ টাকা বা ২২৭ শতাংশ অতিমূল্যায়িত হয়েছে। অথচ ফিক্সড প্রাইস মেথডে কোন কোম্পানি ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ মূল্যায়নের চেয়ে বেশি দরে শেয়ার ইস্যু করতে পারেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম (এফসিএমএ) বিজনেস আওয়ারকে বলেন, শেয়ার দর ভ্যালুয়েশন অনুযায়ি বসুন্ধরা পেপারসের কাট-অফ প্রাইস সর্বোচ্চ ৫৩ টাকা হতে পারে। এক্ষেত্রে হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিটা বাদ দিলাম। এ হিসাবে অবশ্যই বসুন্ধরার দর অতিমূল্যায়িত হয়েছে। যা আমরা নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও হয়েছে।

তিনি বলেন, চলমান বুক বিল্ডিংয়ে বুক বিল্ডিং সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এটি সংশোধন করা না হলে ভবিষ্যতেও এমন অতিমূল্যায়িত কাট-অফ প্রাইস আরও নির্ধারিত হবে। তাই শেয়ারবাজারের স্বার্থে অবশ্যই এটি সংশোধন করা উচিত।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যেকোন কোম্পানির শেয়ার দর বিবেচনায় ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানির শেষ ৫ বছরের ওয়েটেড শেয়ারপ্রতি মুনাফাকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ ৩ মাসের গড় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দিয়ে গুণ করে এই দর নির্ধারন করা হয়। এ হিসাবে বসুন্ধরা পেপারসের শেয়ার দর হয় ২২.৩৮ টাকা।

দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ৮টি কোম্পানি প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করেছে। তবে সব কয়টি কোম্পানি ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত দরের চেয়ে কম দরে শেয়ার ইস্যু করেছে। এরমধ্যে রিজেন্ট টেক্সটাইল ৩১ টাকা পাওয়ার যোগ্য হলেও ২৫ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করে। এছাড়া সিমটেক্স ৩৩ টাকার বিপরীতে ২০ টাকায়, কেডিএস এক্সেসরিজ ৩৪ টাকার বিপরীতে ২০ টাকায়, আমান ফিড ৮৬ টাকার বিপরীতে ৩৬ টাকায়, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ ২৮ টাকার বিপরীতে ২৬ টাকায়, বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস ৬৬ টাকার বিপরীতে ৩৫ টাকায়, শাশা ডেনিমস ৫৪ টাকার বিপরীতে ৩৫ টাকায় এবং ইফাদ অটোস ৬৩ টাকার বিপরীতে ৩০ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করেছে।

এদিকে ২০১৬ সালে একমাত্র প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করা ডরিন পাওয়ার জেনারেশন ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে ৩৭ টাকা পাওয়ার যোগ্য ছিল। তবে কোম্পানিটি ২৯ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করার অনুমোদন পেয়েছে।

২০১৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিবিএস ক্যাবলস ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’পদ্ধতিতে শেয়ারপ্রতি ৩২ টাকা পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া নাহি অ্যালুমিনিয়াম ২৪ টাকা, ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস ৩১ টাকা, প্যাসিফিক ডেনিমস ২০ টাকা, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ১৪ টাকা, নূরানি ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার ১৩ টাকা পাওয়ার যোগ্য। তবে কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করার অনুমোদন পায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা বিজনেস আওয়ারকে বলেন, বুক বিল্ডিংয়ে কোম্পানিগুলোর শেয়ার ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’পদ্ধতিতে মূল্যায়িত দরের চেয়ে বেশি হচ্ছে। কিন্তু ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসা সবগুলো কোম্পানি এই পদ্ধতিতে নির্ধারিত দরের কমে এসেছে। তাহলে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আগে আসা কোম্পানিগুলোর দর নিশ্চয় অবমূল্যায়িত হয়েছে। অন্যথায় বুক বিল্ডিংয়ে দর অতিমূল্যায়িত হচ্ছে।

‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ইস্যু ম্যানেজাররা কোম্পানির শেয়ার ইস্যু করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) আবেদন করতেন। এবং এর আলোকে কমিশন প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের অনুমোদন দিত। যদিও এখন প্রিমিয়ামে আসতে হলে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে দর নির্ধারনে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা মূল ভূমিকা রাখেন। তবে এখনো কোম্পানিগুলোকে ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে দর মূল্যায়ন করে দেখাতে হয়।

এদিকে ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ ছাড়া আরও ৩টি পদ্ধতিতে বসুন্ধরার শেয়ারের দর কেমন হতে পারে তা তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে শেয়ারপ্রতি সম্পদ (পূণ্:মূল্যায়নসহ) বিবেচনায় ৩০.৪৯ টাকা ও পূণ্:মূল্যায়ন ছাড়া ১৫.৭৯ টাকা হতে পারে বলে বসুন্ধরার রেড হেরিং প্রসপেক্টাসে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একই ক্যাটাগরির গড় দর ভিত্তিতে ৪৯.০৬ টাকা এবং পি/বিভি মাল্টিপল অব সিমিলার স্টক পদ্ধতিতে ৫৩.০৫ টাকা হতে পারে।

অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম (এফসিএমএ) বলেন, বিডিংয়ের কাট-অফ প্রাইস যে সঠিক হয় না, তা বোঝার আরেকটি সহজ উপায় হল কাট-অফ প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে আইপিওতে শেয়ার ইস্যু। এক্ষেত্রে সহজেই বোঝা যায় কাট-অফ প্রাইস ফেয়ার না। যদি তাই হয়, তাহলে আইপিওতে কেনো ১০ শতাংশ কমে শেয়ার ইস্যু করা হবে।

দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজম্যান্ট অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সাবেক সভাপতি এএসএম শায়খুল ইসলাম (এফসিএমএ) বিজনেস আওয়ারকে বলেন, ৫৩ টাকা পাওয়ার যোগ্য কোম্পানির শেয়ার ৮০ টাকা নির্ধারিত হলে, স্বাভাবিকভাবেই বিডিং নিয়ে প্রশ্ন তৈরী হয়। এক্ষেত্রে বিএসইসি তদন্ত করে কারন অনুসন্ধান করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বসুন্ধরার বিডিংয়ে হয়তো সব আইন পরিপালন হয়েছে। তবে আইন পূরণ সত্ত্বেও সন্দেহ হলে, তা নিয়ে তদন্ত করা যেতে পারে।

বসুন্ধরা পেপারস মিলসের সচিব নাসিমুল হাই বিজনেস আওয়ারকে বলেন, কাট-অফ প্রাইস অতিমূল্যায়িত নাকি অবমূল্যায়িত-এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করব না। এ নিয়ে কোন প্রত্যাশা ছিল না। শুধুমাত্র ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চেয়েছি। এর চেয়ে বেশি কিছু না।

ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান বিজনেস আওয়ারকে বলেন, বিডিংয়ে সাধারন বিনিয়োগকারীরা অংশগ্রহণ করেননি। এক্ষেত্রে সব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিড করেছেন। যাদের দর মূল্যায়ন বা যাচাই-বাছাই করার জন্য নিজস্ব টিম রয়েছে। এক্ষেত্রে বিডাররা যেটা ভালো মনে করেছে, সে দরে বিড করেছে। এক্ষেত্রে কোন মন্তব্য নাই।

প্রসপেক্টাস অনুযায়ি সর্বোচ্চ ৫৩ টাকা দর হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা ঠিক আছে। তবে এক্ষেত্রে কোম্পানির সুনাম বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কিন্তু বসুন্ধরা পেপারসের দেশব্যাপি সুনাম আছে। আর নিশ্চয় বিডাররা সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বিড করেছেন।

কোম্পানিটি শেয়ারবাজার থেকে ২০০ কোটি টাকা উত্তোলন করবে। এরমধ্যে ১২৫ কোটি টাকার জন্য বিডিং সম্পাদিত হয়েছে। বসুন্ধরা উত্তোলিত অর্থ দিয়ে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্চাম ক্রয়, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও খরচে ব্যয় করবে।

উল্লেখ্য, বসুন্ধরা পেপার মিলস বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে টাকা সংগ্রহের লক্ষে গত বছরের ৩০ জুন ‘রোড শো’ সম্পন্ন করেছে। ৫০০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধনের কোম্পানিটিতে ১৪৭ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন রয়েছে। কোম্পানিটি ১৯৯৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। এরপরে ২০১১ সাল থেকে ২১টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে আসছে।

বিজনেস আওয়ার/৭ নভেম্বর, ২০১৭/আরএ

উপরে