ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

কারণ ছাড়াই বাড়ছে ব্যাংকটির দর

লোকসানি আইসিবি ব্যাংকে আইসিবির ৯ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ

২০১৭ নভেম্বর ২৮ ১৪:১৮:৩৪

রেজোয়ান আহমেদ : শেয়ারবাজারকে সুস্থ ধারায় চলতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) এর সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা করা দায়িত্ব হলেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে। প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নামসর্বস্ব ও সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিতে বিনিয়োগের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে আইসিবি বিনিয়োগকারীদেরকে ভালো শেয়ারের পরিবর্তে জেড ক্যাটাগরি শেয়ারে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এমতাবস্থায় আইসিবির এ জাতীয় শেয়ারে বিনিয়োগের বিষয়ে তদন্ত করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

আইসিবির পোর্টফোলিও সংগ্রহের মাধ্যমে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা ও সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছে আইসিবির সহযোগি ৯ প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ৮টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ১টি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যেে আবার ৫টি ফান্ড গত ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭) আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

আইসিবির বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট, আইসিবি এএমসিএল ইউনিট ফান্ড, বাংলাদেশ ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল পেনশন হোল্ডারস ইউনিট ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় এনআরবি ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় ফান্ড, পঞ্চম আইসিবি ইউনিট ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল ইসলামীক ইউনিট ফান্ড ও আইসিবি এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড।

এদিকে আইসিবির সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলো আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরে ব্যাংকটির শেয়ার দরে উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। লোকসানি আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকটি গত ১৬ নভেম্বর থেকে দর বাড়ার শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির ১৫ নভেম্বরের ৫.২০ টাকার শেয়ার ২৭ নভেম্বর লেনদেন শেষে দাড়িয়েছে ৮.১০ টাকায়। এ হিসাবে ৮ কার্যদিবসে শেয়ার দর বেড়েছে ২.৯০ টাকা বা ৫৬ শতাংশ। তবে এই দর বাড়ার পেছনে কোন কারণ খুজে পায়নি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিএসইর ওয়েবসাইটে ২০ ও ২৩ নভেম্বর দুই দফায় সচেতনতামূলক তথ্য প্রকাশ করা হয়।

আগের বছরগুলোর মতো ২০১৭ সালেও ব্যবসায় লোকসান গুণছে আইসিবি ইসলামীক ব্যাংক। এ বছরের ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি ০.৪২ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিজনেস আওয়ার ২৪.কমকে বলেন, শেয়ারবাজারে আইসিবির বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক। যাতে সহজেই শেয়ার দরে প্রভাব ফেলা যায়। তারপরেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইসিবি ও এর ফান্ডগুলোর সতর্ক হওয়া উচিত। একইসঙ্গে আইসিবি এমএমসিএল কেনো একটি লোকসানি ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, সে বিষয়ে বিএসইসি ব্যাখ্যা চাইতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিজনেস আওয়ার ২৪.কমকে বলেন, শেয়ারবাজার স্বাভাাবিক রাখতে সরকারের সহযোগী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আইসিবি ও এর সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো শেয়ারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এর ব্যতিক্রম কাম্য নয়। বাজে শেয়ারে বিনিয়োগ এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়।

এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বিজনেস আওয়ার ২৪.কমকে বলেন,আইসিবির ফান্ডগুলো আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকের মতো জাঙ্ক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারে না। আইসিবিসহ তার ফান্ডগুলোর উচিত ভালো শেয়ারে সাধারন বিনিয়োগকারীদেরকে উৎসাহিত করা। কিন্তু নিজেরাই যদি জাঙ্ক শেয়ারে বিনিয়োেগ করে, সেটা শেয়ারবাজারের জন্য দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্টের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) গোলাম রাব্বানি বিজনেস আওয়ার ২৪.কমকে বলেন, শেয়ার প্রতি গড় ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য আইসিবি ইসলামি ব্যাংকের শেয়ার কেনা হয়েছে। তবে এখন বিক্রয় করে দেওয়া হচ্ছে। আর শেয়ার ব্যবসায় থেকে বিনিয়োগকারীদেরকে লভ্যাংশ দিতে হয়। যাতে বিনিয়োগের সময় বিনিয়োগকারীদের দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হয়। বিষয়টি নিয়ে নিউজ না করাই ভালো হবে।

আইসিবি এএমসিএল ইউনিট ফান্ড : চলতি বছরের ৩০ জুন আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে আইসিবি এএমসিএল ইউনিট ফান্ডের বিনিয়োগ ছিল (ক্রয়মূল্য) ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর এই বিনিয়োগ ৩ মাসের ব্যবধানে ৩০ সেপ্টেম্বর বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকায়। এ হিসাবে আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকের আরও ২ কোটি ৪২ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে ১৫৫ শতাংশ।

ফান্ডটি আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকের ৬২ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬৭টি শেয়ার কিনেছে ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দিয়ে। যাতে শেয়ারপ্রতি গড় ৬.৩৪ টাকা লেগেছে।

বাংলাদেশ ফান্ড : এ ফান্ডটির ৩০ সেপ্টেম্বর আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে বিনিয়োগ দাড়িয়েছে (ক্রয়মূল্য) ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা প্রতিটি ৬.০৭ টাকা গড়ে ১৯ লাখ ৮৩ হাজার শেয়ার কেনা হয়েছে। আর ৩০ জুনে ব্যাংকটিতে বিনিয়োগ ছিল ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এ হিসাবে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বা ৪৪ শতাংশ।

আইসিবি এএমসিএল পেনশন হোল্ডারস ইউনিট ফান্ড : আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে ফান্ডটির ৩০ সেপ্টেম্বর বিনিয়োগ দাড়িয়েছে (ক্রয়মূল্য) ১৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায়। যার পরিমাণ ৩০ জুনে ছিল ৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। যা ৩ মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ১১ লাখ ২৩ হাজার টাকা বা ১৫৮ শতাংশ। ফান্ডটি ৩ লাখ শেয়ার প্রতিটি ৬.১২ টাকা দরে কিনেছে।

আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট : ফান্ডগুলোর পাশাপাশি আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট প্রতিষ্ঠানটির নিজের হিসাবেও আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে বিনিয়োগ রয়েছে। এক্ষেত্রে অ্যাসেট ম্যানেজম্যান্ট প্রতিষ্ঠানটির ৩০ সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগ রয়েছে (ক্রয়মূল্য) ২৫ লাখ ৯১ হাজার টাকার। যা প্রতিটি শেয়ার ৫.৭৬ টাকা করে ৪ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার কেনা হয়েছে।

আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় এনআরবি ফান্ড : আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে ৩০ জুনের ২২ লাখ ১১ হাজার টাকার বিনিয়োগ ৩০ সেপ্টেম্বর বেড়ে দাড়িয়েছে (ক্রয়মূল্য) ৪৫ লাখ ৮ হাজার টাকা। যা প্রতিটি ৬.৪৪ টাকা দরে ৭ লাখ শেয়ার কেনা হয়েছে।

আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় ফান্ড : ফান্ডটির ৩০ জুনের ১৩ লাখ ২৬ হাজার টাকার বিনিয়োগ ৩০ সেপ্টেম্বর বেড়ে দাড়িয়েছে (ক্রয়মূল্য) ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকায়। যা প্রতিটি শেয়ার ৬.৫৫ টাকা করে ৩ লাখ শেয়ার ক্রয়ে এই টাকা ব্যয় হয়েছে।

পঞ্চম আইসিবি ইউনিট ফান্ড : এ ফান্ডটির ৩০ জুনে আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে বিনিয়োগকৃত (ক্রয়মূল্য) ৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা ৩০ সেপ্টেম্বর শূণ্যতে নেমে এসেছে। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগকৃত শেয়ার বিক্রয় করে শূণ্যতে আনা হয়েছে।

আইসিবি এএমসিএল ইসলামীক ইউনিট ফান্ড : চলতি বছরের ৩০ জুন আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে ফান্ডটির বিনিয়োগ ছিল (ক্রয়মূল্য) ১৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরোটাই বিক্রয় করে দেওয়া হয়েছে।

আইসিবি এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড : ৩০ জুনে আইসিবি ইসলামীক ব্যাংকে (ক্রয়মূল্য) ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকার বিনিয়োগ বা শেয়ার থাকলেও ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা বিক্রয় করে দেওয়া হয়েছে।

বিজনেস আওয়ার/২৮ নভেম্বর, ২০১৭/আরএ

উপরে