ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮, ২ ভাদ্র ১৪২৫


বিডিং কারসাজি বন্ধ হওয়া উচিত: মো. মোশাররফ হোসেন

২০১৭ ডিসেম্বর ১০ ১১:৩২:৩১

ওভার অল আইপিও মার্কেটে শেয়ার দর নির্ধারণ নিয়ে এক ধরনের অনিয়ম চলছে। এ কারনে আইপিওর বিডিংয়ে অতিমূল্যায়িত করে শেয়ার দর নির্ধারণ হচ্ছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রাইমারি মাকের্টে। তাই বাজারের উন্নয়ন স্বার্থেই বিডিং কারসাজি বন্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করছেন প্রাইম ফিন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মো. মোশাররফ হোসেন।

তিনি ২০১০ সালে প্রাইম ফিন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও হিসেবে যোগ দেন। প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে যোগদানের আগে মোশাররফ হোসেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ করেছেন। এর মধ্যে দুটি জীবন বীমায় এমডি এবং দেশের বৃহত্তম বীমা সংস্থার চীফ অপারেটিং অফিসার পদে ছিলেন। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি কোম্পানির স্বাধীন পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

মোশাররফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ বিভাগে পিএইচডি করেন। বি কম পরীক্ষায় অসামান্য ফলাফলের জন্য তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এছাড়াও মোশাররফ হোসেন ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশ এবংইনস্টিটিউট অব কর্পোরেট গভর্নেন্সের ফেলো মেম্বার।

বিজনেস আওয়ার২৪.কমের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনায় শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন তিনি। আলাপচারিতায় উঠে আসে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপত্তাসহ সচেতনতামূলক বিষয়গুলো। একই সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে শেয়ারবাজারের রেগুলেটরদের বিভিন্ন উন্নয়নের দিক। সম্প্রতি রাজধানীর দিলকুশায় তার প্রাইম ফিন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের কার্যালয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান।

সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

বিজনেস আওয়ার : আইপিওর মাধ্যমে বুক বিল্ডিংয়ে কাট অফ প্রাইস (শেয়ার) নিয়ে কারসাজি হচ্ছে, আপনার মতে কেন এ কারসাজি?

মো. মোশাররফ হোসেন : আইপিও মার্কেটে শেয়ার দর নির্ধারণ নিয়ে এক ধরনের অনিয়ম চলছে। আইপিওর বিডিংয়ে শেয়ার অতিমূল্যায়িত দরে নির্ধারণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে করে অনেক কোম্পানি লিস্টিংয়ের পর শেয়ার দর অস্বাভাবিক হয়ে পড়ছে। সেই নেতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারের প্রাইমারি মার্কেটে ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেকেন্ডারি মার্কেটও। বর্তমানে আইপিও মাধ্যমে বুক বিল্ডিংয়ে কাট অফ প্রাইস দর নিয়ে যে কারসাজি হচ্ছে, কেন হচ্ছে বা কারা করছে সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে হচ্ছে, এটা রোধ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

বুক বিল্ডিং দর নির্ধারন নিয়ে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এখন বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এটি নিয়ন্ত্রনে উত্তম সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছে তারা। যা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে নিয়ে এর সমাধানের পথ দেখছেন। হয়ত দর নির্ধারনের সুষ্ঠু পথে ফিরতে বা কাট অফ প্রাইস দরে কারসাজি রোধ করতে আইনে সংস্কার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। আমার মতে, সংস্কারের প্রয়োজন হলে রেগুলেটরদের সেই বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করবে।


বিজনেস আওয়ার : আইপিওর অর্থ বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে কোম্পানিগুলো ব্যয় করতে না পারার কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?

মো. মোশাররফ হোসেন : আইপিওর অর্থ বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে যেসব কোম্পানিগুলো ব্যয় করতে পারছে না, সেটা কেবল ওইসব কোম্পানির কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। তবে আমার মনে হয়, সময় মত আইপিওর অর্থ ব্যয় না করতে পারা মানে, ওইসব কোম্পানির ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এর কারন। পাশাপাশি ওইসব কোম্পানির পরিকল্পনার সঙ্গে আইপিওর অর্থ ব্যয়ের অসমতা আছে। আবার আইপিও অর্থ ব্যয় প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দুর্বলতার বহি:প্রকাশ। কারন আমাদের দেশে যেকোন প্রজেক্ট করা সহজ ব্যাপার না। প্রজেক্ট বাস্তবায়নে করতে কোম্পানিগুলো অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রেগুলেটরদের বেধে দেয়া নিয়মের মধ্যে থাকতে হয় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে। তাই বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে আইপিওর অর্থ কাজে লাগাতে পারছেন না।


বিজনেস আওয়ার : দূর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে ইস্যু ম্য়ানেজারের ভূমিকা কি আরো ইতিবাচক হওয়া উচিত নয়?

মো. মোশাররফ হোসেন : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে মূল ভুমিকায় থাকে ইস্যু ম্যারেজারকোম্পানি। ওইসব ইস্যু ম্য়ানেজারদের হাত দিয়েই বাজারে নতুন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে দুর্বল কোম্পানি রয়েছে। এ দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়ছে। তাই এসব দুর্বল কোম্পানির শেয়ারবাজারে আনার ক্ষেত্রে ইস্যু ম্য়াযানেজারদের উপরে দায়ভার পুরোপুরি পরবে, এটা ঠিক না। এর দায়ভার অডিটর ও কোম্পানির উপরে যাবে, এটাও সম্পূর্ণ ঠিক নয়। কারন আপনার (বিনিয়োগকারী) পুঁজি নিরাপত্তা আপনাকেই দিতে হবে। কোথায় বিনিয়োগ করবেন সেটাও আপনার সিদ্ধান্ত। কারন কোথায় বিনিয়োগ করলে, সেখান থেকে মুনাফার ভাগ যেমন আপনি একাই পাচ্ছেন। তেমনি লোকসান ভাগও আপনার। আমার মতে, শেয়ারবাজারে ইস্যু ম্যানেজার নতুন কোম্পানি আনলেও বিনিয়োগকারীকেই তার বিনিয়োগ নিরাপত্তা দিতে হবে। এর মানে দায়ভার বিনিয়োকারীর উপরেই পড়বে। কারন বিনিয়াগকারীরা শেয়ার অতিমূল্যায়িত দরে ক্রয় করছে। কেন তারা ১০ টাকার শেয়ার দশ-পনের গুন বেশি দরে ক্রয় করছে। এটা কেবলই তারাই বলতে পারবে।

বিজনেস আওয়ার : কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতেফিন্যান্সিয়ালরিপোর্টিং অ্যাক্টের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলুন?

মো. মোশাররফ হোসেন : কোম্পানির ব্যবস্থাপনা যে রিপোর্ট দিয়ে থাকেন সেখানে অস্বচ্ছতা ও ভুল তথ্যের সরবরাহ আছে। এখনও শেয়ার প্রতিমুনাফা (ইপিএস) ও শেয়ারপ্রতি সম্পদকে (এনএভিপিএস) বেশি দেখিয়ে থাকেন অনেক কোম্পানি। এটি নিয়ন্ত্রণ জরুরী। শেয়ারবাজারের স্বার্থেই কোম্পানির একাউন্ট স্বচ্ছ হতে হবে। যাতে বিনিয়োগকারীরা তার ওপর নির্ভর করে বাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবেফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজারের কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বহুগুন বেড়ে যাবে। এ অ্যাক্ট বাস্তবায়নে ইতিবাচক হবে শেয়ারবাজার। আইনটি বাস্তবায়ন হলে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন হবে। নিরীক্ষকদের দায়বদ্ধতা বাড়বে। এতে আর্থিক প্রতিবেদনের কোনো অংশে যদি কারও আপত্তি থাকে তবে তা জানানোর একটা জায়গা তৈরি হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা পাবে।


বিজনেস আওয়ার : ৪.২৬ লাখ কোটি টাকার মূলধনী শেয়াবাজারের লেনদেন হাজার কোটি টাকা, এটা কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মো. মোশাররফ হোসেন : বর্তমান শেয়ারবাজারের ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। এখন শেয়ারবাজারের দৈনিক লেনদেন হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকার ঘরে। সূচকও রয়েছে ছয় হাজার পয়েন্টের উপরে। অতীতের বাজার থেকে ভাল অবস্থানে রয়েছে। আবার শেয়ারবাজারের মূলধন ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এখন এ ধরনের সাইজের মূলধনী বাজারের লেনদেন কত হতে পারে, সেই ধরনের কোন নির্দেশনা নেই। তবে মূলধনের সাইজ অনুসারে বাজারের এ ধরনের লেনদেন ভাল এমনটি বলা যাবে না। তবে আশা করছি, বাজার ইতিবাচক আচরণ করছে। অতীতের চেয়ে বাজারের পেশাদারিত্ব বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। তাই বলছি, সামনে বাজারের দৈনিক লেনদেন পরিমান আরো বাড়বে।


বিজনেস আওয়ার : শেয়ারবাজারের ঝুঁকি রোধে বিনিয়োগকারীদের করণীয় কি ?

মো. মোশাররফ হোসেন : বর্তমান শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে পুরোপুরি নিঃস্ব হবার কিছু নেই। তবে বিশ্বের সব শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি আছে। তেমনি দেশের শেয়ারবাজারেও ঝুঁকি রয়েছে। এটা থাকবে। এটা থেকে নিরাপদ থাকতে শেয়ারবাজারের প্রতি সম্পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। না বুঝে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। যেখান থেকেই তথ্য আসুক, সেটাকে যাচাই-বাছাই করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্লেষণ করে তারপর শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক কথায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে বিনিয়োগ শিক্ষা নিয়ে নিজেকে পরিপক্ক করে শেয়ারবাজারে লেনদেন করতে হবে।


বিজনেস আওয়ার : ফাইন্যান্সিয়ার লিটারেসি সম্পর্কে বলুন?

মো. মোশাররফ হোসেন : বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজার বিনিয়োগে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ‘ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম’। এ প্রোগ্রাম থেকে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে জানতে পারবে। জানতে পারবে শেয়ারবাজারের ঝুঁকির খাতগুলো। সহজেই বুঝবে কোন খাতে বিনিয়োগ করলে তারা বেশি মুনাফা পাবে। তাই এক কথায় ফাইন্যান্সিয়ার লিটারেসি গ্রহনে ভাল শেয়ার সম্বন্ধে নিজেরাই বিচার বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে। আবার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগে এক ধরনের পেশাদারিত্ব হবে।


বিজনেস আওয়ার/১০ ডিসেম্বর, ২০১৭/এমএজেড

উপরে