পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা ইয়াওয়ার সায়ীদের আর্থিক খাতে ৩৫ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এরই আলোকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিশেষত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তার সঙ্গে আলাপচারিতা হয় বিজনেস আওয়ার টোয়েন্টিফোর ডটকম এর স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদের। সেই আলাপচারিতার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

বিজনেস আওয়ার : বর্তমান মিউচ্যুয়াল ফান্ড সেক্টরের পরিস্থিতিকে কিভাবে দেখছেন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :বর্তমানে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সেক্টরটি এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধসের সঙ্গে সঙ্গে এই খাতটিতে ধস নেমেছিল। যার অন্যতম কারণ ছিল গতানুগতিক ধারায় বিনিয়োগ করা।

বিজনেস আওয়ার : ওই সময়ের ধসের কারণ হিসেবে ফান্ড ব্যবস্থাপকদের অদক্ষতা নিয়ে প্রায় সমালোচনা শোনা যায়। আপনি কি মনে করেন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ: আসলে সবাইতো আর অদক্ষ ছিল না। তাই ঢালাওভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সেক্টরটিকে অদক্ষ না বলে, অদক্ষদের অদক্ষ বলতে হবে। মূলত কিছু ফান্ডের অদক্ষতার কারণে সবাই এই সেক্টরটিকেই অদক্ষ হিসেবে মূল্যায়ন করে। যা ঠিক না।

বিজনেস আওয়ার:অন্যান্য দেশে বিনিয়োগকারীরা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করলেও বাংলাদেশে এই খাতে অনীহা। এর কারণ কি বলে মনে করেন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :আপনারা যাদেরকে বিনিয়োগকারী বলেন, তারা আসলে বিনিয়োগকারী না। তারা প্রকৃতপক্ষে স্পেকুলেটর (ফটকাবাজ)। বিনিয়োগকারী বলতে বুঝায়, যারা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে। আর মিউচ্যুয়াল ফান্ড হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য। তাই এই খাতটি স্পেকুলেটরদের তথা আপনাদের দাবিকৃত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই।

বিজনেস আওয়ার :মিউচ্যুয়াল ফান্ডে অনীহার কি শুধুমাত্র এটিই কারণ?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :প্রায় সব মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বৈশিষ্ট একই রকম। যা এই খাতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের অনীহার আরেকটি অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈশিষ্টের ফান্ড শেয়ারবাজারে আনা যেতে পারে। যেমন প্রতিবছরের পরিবর্তে মেয়াদ শেষে ফান্ড অবসায়নের মাধ্যমে বিতরন করা হবে ইত্যাদি।

বিজনেস আওয়ার :শেয়ারবাজারের আকারের তুলনায় এই খাতটি অনেক ছোট এবং প্রসারের দরকার বলে মনে করা হয়। আপনি কি মনে করেন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ:প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ মিউচ্যুয়াল ফান্ড সেক্টরটি অবহেলিত। যাতে শেয়ারবাজারে এই খাতটির অংশগ্রহণও নগণ্য। শেয়ারবাজারে সাধারন গতি আনতে ও বজায় রাখতে এই খাতটি আরও বড় করা উচিত। একইসঙ্গে পরিচর্যা করা দরকার।

বিজনেস আওয়ার :২০০৯-১০ সালে শেয়ারবাজারে উত্থানের সময় যে হারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, পরবর্তীতে তা কমে এসেছে। বিষয়টি কতটা যৌক্তিক?

ইয়াওয়ার সায়ীদ : আসলে আমরা হুজুগে বাঙালি। তাই উর্ধ্বমূখী বাজারে ঝাপিয়ে পড়ি, আবার পতনে সড়ে পড়ি। ওই সময় মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।

বিজনেস আওয়ার :সাধারন বিনিয়োগকারীদের তুলনায় মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে দক্ষ টিম হিসেবে দেখা হয়। এক্ষেত্রে কোনো মিউচ্যুয়াল ফান্ডের হুজুগে বাঙালি হওয়া কতটা যৌক্তিক?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :শেয়ারবাজারে কারও হুজুগে বিনিয়োগ করার সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ২০০৯-১০ সালে অনেক মিউচ্যুয়াল ফান্ড সঠিক আচরণ করেনি। যাতে কয়েক বছর লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এমনকি অনেক ফান্ড ঝড়ে পড়ে।

বিজনেস আওয়ার :বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এরই মধ্যে পাবলিক ইস্যু রুলসসহ অনেক আইন-কানুনে রিফরমস (সংশোধন) করেছে। প্রকৃতপক্ষে বাজারের জন্য কতটা কার্যকরি রিফরমস করতে পেরেছে?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ রিফরমস করা হয়েছে স্পেকুলেটরদেরকে বিবেচনায় নিয়ে। যা বাজারের জন্য সঠিক না।

বিজনেস আওয়ার :বর্তমান পেক্ষাপটে বাংলাদেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সম্ভাবনা কেমন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :এই খাতের সম্ভাবনা আছে। শুধু অন্তরায় হিসেবে রয়েছে স্পেকুলেটর। খাতটিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা। একইসঙ্গে বিভিন্ন বৈচিত্রের ফান্ড আনা।

বিজনেস আওয়ার :একই সম্পদ ব্যবস্থাপকের অধীনে এক স্কীম অন্য স্কীমে বিনিয়োগ করতে পারবে না বলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে করছে। এটাকে কিভাবে দেখছেন?

ইয়াওয়ার সায়ীদ :আসলে আইনে থাকলেও তার কার্যকরিতা নাই। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা/পরিচালক আলাদা হওয়ায় করা যাবে বলে মনে করে কমিশন। তাই এক্ষেত্রে কিছু বলার থাকে না। তবে এতে করে আইনটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে একই সম্পদ ব্যবস্থাপকের অধীনে থাকা ফান্ডগুলোর ইউনিট দর বাড়ানো-কমানো নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ থাকে।

বিজনেস আওয়ার :সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ইয়াওয়ার সায়ীদ :আপনাকেও ধন্যবাদ।