ফরহাদ হোসেনের কাছেই জেনে নিন প্রবাস জীবনের দিনের কথা……অনেক কষ্ট করে মা বাবার কাছে থেকে টাকাটা দিয়ে বলেছিলেন তারাতারি ফিররাই আইস। ফিরতে পারিনি দেশে। একটা জেদ চেপেছে, পিআর (পারমানেন্ট রেসিডেন্ট)নিয়েই ফিরবো। তবে গেল দশ বছরেও হয়ে উঠেনি সে কাজ। এদেশে এসেই ঝামেলায় পড়েছি তামিলদের সাথে। কাজ হারিয়ে বেকারও হয়েছি আবার দালালের হাত ধরে কাজ পেয়েছি।

এরমাঝে জেলখেটেছি ছয়মাস। সব কথাই যেনো গল্প ছবির মতো। প্রথম বেকার হওয়ার পর আর হাতে কোনও কাজ ছিল না। পারমিট জোগার করতে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছি হাতে জমানো পঁচিশ, শ রিঙ্গীত। এর পরও অবৈধ অনু-প্রবেশের অভিযোগে ধরা পড়তে হয়েছে মালাই (মালোয়েশিয়ার)পুলিশের হাতে। তিন মাস জেলখাটার পর এক মালে সহকর্মীর সহযোগীতায় ছাড়া পেয়েছি। এ ঘটনা শুরুর দিকের। আজ মনে পড়লেও গা শিউরে উঠে। কাকে বলবো এসব কথা। শোনার কি কেউ আছেন। বছর সাতেক আগে একবার এটিএন বাংলার কেরামত উল্লাহ বিপ্লব ভাই আমাদের কথা শুনেছিলেন, রির্পোটও হয়েছিল শুনেছি। তবে এর ফলাফল পাইনি। কেএল(কুয়ালালামপুর ) এসেছিলাম ফ্যক্ট্রি ভিসায় দু,হাজার চার সালে। মোট ছয়লাখ টাকা খরচ করে। আনস্কিল লেবার হিসেবে এসে ভালই আয় হচ্ছিল। কিন্তু পথে বের হলেই সমস্যা হতো। সাথে পাসপোর্ট না থাকলে পুলিশ হয়রানী করতো। এমন করে গা ঢাকা দিয়ে অনেক দিন এক জায়গায় থেকেছি।

বছরখানেক পর থেকে ভাষাটা আয়ত্বে আসার পর মালেদের সহায়তায় কেএল এর কেলানতাং, পুত্রজায়া,কোটারায়া, সুবাং এমনকি স্লেঙগরের বাইরে জোহরবারু কোটাকিনাবালু সহ অনেক জায়গায় কাজ কারার অভিজ্ঞতা ঝুলিতে ভরেছি। তবে মালেদের চেয়ে চীনারা অনেক ভাল। এরা অবৈধ শ্রমিকদের কাজ দেয় কম পারিশ্রমিকে। পছন্দ হলে স্থায়ী কাজেরও ব্যবস্থা করে। কিন্তু এ সুযোগও নষ্ট করেছে এক শ্রেনির দালাল। এদেশে বাংলাদেশিদের যে অবর্ননীয় কষ্ট তা বলে শেষ করা যাবে না। তবে এদেশে এসে তেমন কোনও সুবিধা করা যায় না। নিত্যপন্যর দাম আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। পাসামালাম এ বাজার করে যে সাশ্রয় হতো সময়ের কারণে তা আর পারা যায় না। তাই জীবন যাপন অনেক বদলে গেছে। এগিয়ে গেছে মালয়েশিয়া আর আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। ভারতীয় পাকিস্তানি ইন্দোনেশিয়ান থাইল্যন্ডি শ্রমিকদের সুপারভাইসর পদে কাজ পাওয়ায় আমাদরে উপর কাজের চাপ বেড়ে গেছে বহুগুন। আর এতে মালিক পক্ষ বেজায় খুশি ওদের ওপর। এরসাথে যোগ হয়েছে ওদের বৈদিশিক যোগাযোগ যা আমাদের সরকারী পর্যায়ে ওই তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের দেশ থেকে যত শ্রমিক অবৈধ ভাবে যায় তার মাত্রা যে কোনও দেশের তুলনায় বেশ কম হলেও কেন জানিনা ওরা আমাদের উপর বেশ অসন্তুষ্ট। ওদের সাথে আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে না পারলেও মালে ভাষা রপ্ত করতে সময় নেইনি। কিন্তু ওদের ভাষায় কথা বললেও কেমন যেনও নাক-সিটকানো ভাব দেখায়। কোথাও কোনও বাংলাদেশি বিপদে পড়লে তাকে দেখার জন্য এদেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা শিল্পপতি বা ব্যাবসায়ীরা এগিয়ে আসে না। অথচ অন্য যে কোনো দেশের কেউ এমন সমস্যায় পড়লে সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়ে উদ্ধারের জন্য। আমাদের দুঃখের কথা শুনবে কে? সরকারী পর্যায়ে কতবার শুনেছি আমাদের দেশ থেকে শ্রমিকদের একটা তালিকা করে পুর্নবাসনের উদ্যাগ নেয়া হবে। আজও তার কোনো বাস্তবায়ন দেখিনি।

বছর দুই আগে যখন ভিসা দেয়ার কথা শুনেছিলাম, তখন কারখানার মালিকরা আমাদের বলেছিলÑ তোদের দেশ থেকে শ্রমিক আনতে পারলে বেতন বাড়িয়ে দেবো। এমনকি নতুন কতজন শ্রমিক লাগবে তারও হিসেব পুরোনো শ্রমিকদের সাথে আলোচনাও করেছিল। অথচ আমাদের কপালে তা জোটেনি। আমি এবার দেশে ফিরে যাবো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলায় অন্যরা আমায় বাধা দিলো। কেন যাবো তার চাইতে আরো বছর পাচেক থেকে গেলে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ মিলবে। তাই আমার মনে হলো এদেশে আসার আগে শতবার ভেবে নেবেন। কেনো আসবেন, আর কিই বা পাবেন। এসে দেখবেন এরচেয়ে দেশে বসে পানবিড়ির দোকান করা অনেক ভালো। রাজধানী বা বন্দর শহরে গিয়ে কুলিগিরি করে খাওয়া অনেক সম্মানের।

বিজনেস আওয়ার/ঢাকা ০৯ নভেম্বর/এন/আই