তাদের আশা, এমনটা করলে সু চি রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থানে যাবেন এবং এতে করে অন্তত দেশটি আবারও সেনাশাসনে ফিরে যাওয়া থেকে রেহাই পাবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে ইতোমধ্যে মিয়ানমারে পৌঁছেছেন রোমান ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস।মঙ্গলবার সু চির সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে পোপের।

রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে নীরব থাকা ও পরে সেনাবাহিনীর পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দিত নোবেল বিজয়ী সু চির সঙ্গে পোপ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, মিয়ানমারে পুরোটা সময় পোপ নৈতিক মর্যাদা ধরে রাখার পাশাপাশি খেয়াল রাখবেন যেন মিয়ানমারের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী তার কোনো আচরণে বিপদের মুখে না পড়ে।

মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো কোনো পোপ সফর করছেন। সোমবার মিয়ানমারে পৌঁছেই ওইদিন সন্ধ্যায় ইয়াংগুনে দেশটির সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দেখা করেন পোপ ফ্রান্সিস। এই সেনাপ্রধানের অধীনে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।রোহিঙ্গা-মিয়ানমার-অং সান সু চি-পোপ ফ্রান্সিস

মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কখনোই তাদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ‘রোহিঙ্গা’ নামে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি দেশটির বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর তালিকায়ও নেই রোহিঙ্গারা। বরাবরই তাদেরকে ‘মিয়ানমারের মুসলিম অধিবাসী’, ‘অবৈধ জনগোষ্ঠী’ এবং অনেক সময় ‘বাঙালি’ বলেও পরিচয় দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বও নেই।

এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে সফরে এসে মিয়ানমার সফরকালে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কথা বলতে গিয়ে পোপ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেন কিনা, সবার দৃষ্টি রয়েছে সেদিকেই। যদিও পোপ রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা নামে সম্বোধন করবেন – এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, তিনি ‘রোহিঙ্গা’ নামটি ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একই আশঙ্কায় রোমান ক্যাথলিক চার্চও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে পোপকে।

মিয়ানমার সফর শেষে এরপর বাংলাদেশও সফর করবেন পোপ। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছোট একটি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।

৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।রোহিঙ্গা-মিয়ানমার-অং সান সু চি-পোপ ফ্রান্সিস

সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

সেনাবাহিনীর হামলা ও সহিংসতার মাত্রার ভয়াবহতার কারণে জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে যোগ করার মতো জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে একে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ‘জাতিগত নিধন কর্মসূচি’ বলে বর্ণনা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

বিজনেস আওয়ার / অ.মা