ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৫


শেয়ারবাজার থেকে কোম্পানির অর্থ সংগ্রহে ধস

২০১৮ ডিসেম্বর ২৩ ১০:৩৪:২৩

রেজোয়ান আহমেদ : ২০১৭ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনে ধসের কারনে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সমালোচনার মূখে পড়ে। ওইসময় আইপিও কমলেও রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বৃদ্ধিকে যুক্তি হিসাবে উপস্থাপন করে কমিশন। তবে চলতি বছরে শেয়ারবাজার থেকে রাইট ইস্যুসহ সর্বোপরি অর্থ সংগ্রহে ধস নেমেছে। যা বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

২০১৭ সালে ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। যা শেয়ারবাজারের উন্নয়নের অন্তরায় বলে বিভিন্ন মহলে বিএসইসির সমালোচনা করা হয়। এরআলোকে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বিএমবিএ’র এক সেমিনারে বলেছিলেন, শুধু আইপিও দিয়ে বিবেচনা করাটা ঠিক না। এক্ষেত্রে রাইট শেয়ারকেও বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৭ সালে আইপিও কমলেও রাইট শেয়ার ইস্যু বেড়েছে। তবে ২০১৮ সালে এসে বিএসইসি চেয়ারম্যানের সেই ব্যাখ্যা বা যুক্তি দেখানোর রাস্তাও নেই।

২০১৮ সালে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে ধসের পেছনে প্রধান কারন হিসাবে রয়েছে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনে পতন। আগের বছর ৫টি কোম্পানির রাইট ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হলেও ২০১৮ সালে তা ১টিতে নেমে এসেছে। যাতে রাইট ইস্যুর মাধ্যমে আগের বছরের ১২৭৩ কোটি টাকা এ বছর ১০৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। যদিও রাইট শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের মনস্তাত্তিক সমস্যাকে সবসময় দায়ী করে আসছেন ইস্যু ম্যানেজাররা। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হওয়ায়, এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চান না।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিজনেস আওয়ারকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু দেশের শেয়ারবাজার সেভাবে এগোচ্ছে না। এই সমস্যা কাটিয়ে তুলতে শেয়ারবাজারের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে বেশি বেশি করে ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আনতে হবে।

বিএসইসির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বিজনেস আওয়ারকে বলেন, শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপন একটি বড় বাধা। কিন্তু কোন ডায়নামিক উদ্যোক্তা শেয়ারবাজার থেকে ফান্ড সংগ্রহের জন্য ২ বছর অপেক্ষা করবে না। তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ দেওয়ার জন্য বসে রয়েছে। এমতাবস্থায় তারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে কোম্পানিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার জন্য এই সমস্যার বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তার প্রয়োজন।

দেখা গেছে, বিগত ১০ বছরের মধ্যে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে সর্বনিম্ন অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এ বছরে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে ৬৫৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। যার পরিমাণ ২০১৭ সালেও ছিল ১ হাজার ৪৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে বছরের ব্যবধানে শেয়ারবাজার থেকে অর্থসংগ্রহ কমেছে ৭৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা ৫৫ শতাংশ।

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র ১টি কোম্পানি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে। কোম্পানিটিকে ১০৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়। আর জাহিন স্পিনিংয়ের রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়েছে।

চলতি বছরে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ১১টি কোম্পানি ২৬৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। আর বুক বিল্ডিংয়ে ২টি কোম্পানি ২৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এই ২ পদ্ধতিতে ১৩টি কোম্পানি মোট ৫৪৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।

নিম্নে শেয়ারবাজার থেকে বিগত ১০ বছরে বিভিন্ন কোম্পানির অর্থ সংগ্রহের তথ্য তুলে ধরা হল-

সাল

আইপিও (কোটি টাকা)

রাইট (কোটি টাকা)

মোট (কোটি টাকা)

ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতি

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি

২০১৮

২৬৬

২৮০

১০৯.৪০

৬৫৫.৪০

২০১৭

১১৩

৫৬.২৫

১২৭৩.১৪

১৪৪২.৩৯

২০১৬

১৭৪.৭০

৪০৯.৬০

৩৬৫.৮২

৯৫০.১২

২০১৫

৪৩৮.১২

২৩৭.৬০

৬৭৫.৭২

২০১৪

১২০০.৮৪

২০৬৩.০৪

৩২৬৩.৮৮

২০১৩

৭৩০.৫০

১৮০.৩০

৯১০.৮০

২০১২

১১৩৬.৬৭

৭০৬.৩০

১৮৪২.৯৭

২০১১

১২৫.৪১

৭৬৬.৬৮

২৩৪১.৫৬

৩২৩৩.৬৫

২০১০

৪২৭.৬৪

১৬৫.৬৪

২৭৯৭.০৫

৩৩৯০.৩৩

২০০৯

৬২৯.২৩

২৮৮.৬২

৯১৭.৮৫

সূত্র- বিএসইসি

বিগত ১০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষে ২০১০ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই বছরে মোট ৩ হাজার ৩৯০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। এরপরের অবস্থানে থাকা ২০১১ সালে ৩ হাজার ২৩৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশে ট্রেক রেকর্ড ভালো এমন ১ শত’র বেশি কোম্পানি আছে। এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশের ৯৫ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। আর শেয়ারবাজার থেকে এর সংখ্যা মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ শেয়ারবাজার থেকে টাকা নিলে ফেরত দিতে হয় না। আর লোকসান করলেও ঋণ ও সুদ ফেরত দিতে হয়। এছাড়া শেয়ারবাজারে আসলে ১০ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যায়। তারপরেও কোম্পানিগুলো কেনো শেয়ারবাজারে আসছে না, তা খুজেঁ বের করা দরকার।

বিজনেসআওয়ার/২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮/আরএ

উপরে