ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫


৭১'র জীবননগর আজকের জীবননগর

২০১৮ ডিসেম্বর ২৩ ১২:২৩:১৬

ষোলই ডিসেম্বর মানেই বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সবুজ অনুভুতিতে রাঙানো বিজয়ের দিন। দীর্ঘ ন'মাস হানাদার পাকিবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করে বাঙালি তার কাঙ্খিত স্বাধীনতার সুর্য উদিত হতে দেখেছে। হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি এদিন বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সীমারেখা আকঁতে সমর্থ হয়। এদিন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বাঙালি নিজেকে স্বাধীনতার আলোয় রাঙিয়েছিলো। 'সাতকোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করেনি'- সেই বাঙালি আজ নিজেদেরকে মানুষ হিসাবে তার বিজয় গাথা বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিন ছিলো বাঙালির বিজয় দিবস। আজকের ষোলই ডিসেম্বর।

এই স্বাধীনতার সুর্যকে যারা আনতে গিয়েছিলেন তাদের অনেকেই সেদিন স্বাধীন বাংলার মাটিতে শেষ শয্যায় শায়িত। নিজের জীবন দিয়ে তারা আমাদের গর্বের স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন। আজকের এই দিনে আমরা তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। সেই সাথে তাদের আত্মত্যাগে পাওয়া স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষার শপথ নিই।

সেদিনের জীবননগর:
সীমান্তবর্তী জেলা হিসাবে কুষ্টিয়ার এই অঞ্চলটি এমাসের গোড়ার দিকেই শত্রুমুক্ত হয়। কষাই ক্যাপ্টেন আনিস বিপদ বুঝতে পেরেই জীবননগর ত্যাগ করে। মুক্তিপাগল মানুষের কাফেলা বিজয়গর্বে জীবননগরের দখল নেন। ঠিক তার আগের দিন বিবিসির তৎকালীন সংবাদদাতা মার্ক টালি যখন রিপোর্ট পাঠালেন- 'জীবননগর থানা এখন পাকি হানাদার মুক্ত। শহরের উপকণ্ঠে বাঁকায় তুমুল লড়াই চলছে।' এসংবাদ রবীন্দ্রনাথের সেই গানের মতো ছড়িয়ে গেল' তুমি যে সুরের আগুন ছড়িয়ে দিলে মোর প্রাণে/ সে আগুন ছড়িয়ে গেলো- সে আগুণ ছড়িয়ে গেলো- সবখানে সবখানে.... সেদিন মার্ক টালির সেই রিপোর্ট জীবননগরবাসীর মনে নতুন করে মুক্তির বাতাস ছড়িয়ে দিল। পিঞ্জরে আটকে থাকা বাঙালি স্বাধীন দেশের মুক্ত আকাশে প্রথম বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলো। জয়বাংলা রণধ্বণিতে জীবননগরের আকাশ বাতাস মুখরিত করে সাধারণ মানুষ স্বাধীনতায় উজ্জিবীত হলো। আমরা স্বাধীন। আজ থেকে সত্যিই আমরা স্বাধীন। কবির ভাষায়, স্বাধীনতা হীণতায় কে বাঁচিতে চায়/ পরাধীন শৃঙ্খল কে পরিবে পায় রে কে পরিবে পায়। মন্ত্র ছিলো জাতির জনকের সেই উক্তি 'আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আর আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।'

এদিকে মুক্তিবাহিনীর জোয়ানেরা মিত্রবাহিনীকে সাথে নিয়ে বীরের বেশে জীবননগরে প্রবেশ করেন। রাইফেলের গুলি উর্দ্ধাকাশে ছুড়ে বাঙালি তাদের সে বিজয় উৎযাপন করে। সেদিন যারা এই মুক্তিবাহিনীর সাথে এই স্বাধীন দেশে প্রবেশ করেন তাদের অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আবার অনেকেই হয়তো নানাবিধ জটিল রোগে রোগাক্রান্ত। আজ থেকে ৪৮ বছর আগের সেই ঘটনার স্মৃতি পাতায় ধুলো জমেছে। অনেকেরই নাম ঝাপসা থেকে আরো ঝাপসা হয়ে হারিয়ে গেছে। স্মৃতি হাতড়ে তার কোনো নিশানা স্মৃতিতে জাগ্রত নেই। ধুলো জমে তা মলিন হয়ে গেছে।

তাই অনেকেরই নাম উলোটপালট হয়ে যাচ্ছে। তবে আজ দুজনার কথা বড় বেশি করে মনে পড়ছে। যাদের একজন ‘দুখে’ আর অন্যজন ‘ধনে’। দুখে যার বাড়ি গয়েশপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে যিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। নিজে মাঠ শ্রমিক হয়ে দেশমাতৃকার টানে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে বীরের বেশে ফিরে এসে আবার ফিরে যান বাপদাদার পেশায়। সেই মাঠই হয়ে ওঠে তার সোনালি গর্ব।শক্তজমিনে নাঙ্গল চালিয়ে তার থেকে বের করে আনেন সোনালী ফসল। নচিকেতার সেই গাণের মতো ..হাজার কবিতা মিছে সব ই তা, তার কথা কেউ মনে রাখে না । দুখে যেমন স্মৃতির অন্তরালে চলে গেছেন তেমনি চলে গেছেন অনেকেই।

এমনি আরেকজন কষাই ধনে। যার বাড়ি দৌলৎগঞ্জ। তিনিও গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে- সময়ের দাবি মেটাতে। তাকেও ভুলে গেছে। জানা গেছে, সেদিনের সেই সাহসী বীর যক্ষায় ধুকে ধুকে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। আবার ধনে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নামহীন একজন। কত অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধার লেবাস দেওয়া হয়েছে তারপরেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ঠাঁই হয়নি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। আবার অনেকেই আছেন যারা যুদ্ধকালীন সময়ে দেশে এসে রাজাকার মামার দয়ায় পাকিবাহিনীর কাছে স্যারান্ডার করেছিলো। তারাও কিন্তু এখন দাপুটে মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু ধনেরা রয়ে গেছেন তালিকার বাইরে।

সেদিনের জীবননগরে যারা স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলতে সাহায্য করেছিলেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে যারা মুক্তির স্বপ্নে বিভোর থেকে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়েছিলেন, আজ তাদের কথা স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না / জ্ঞাণী আর গুণিদের ভিড়ে/....তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তি সেনা, তোমাদের এই ঋণ কোনদিন শোধ হবে না। আজকের এই দিনে হারিয়ে যাওয়া এসমস্ত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সংগ্রামী সালাম। জীবননগরের মুক্তিসংগ্রামের বীর সেপাহসালার- তোমাদের প্রতি রইলো স্যালুট ও অভিবাদন ।

লেখক: মারুফ মালেক, সাংবাদিক, জীবনগর, চুয়াডাঙ্গা।

উপরে