ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬


'৪৮ ঘণ্টা' শেষ হয়নি ৭ বছরেও!

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ১১ ০৮:২৩:০৬

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হলো আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। এই দীর্ঘ সময়েও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। ৬২ বার তদন্ত প্রতিবেদনের দিন পেছানো হয়েছে।

এ পর্যন্ত ছয়জন কর্মকর্তা মামলা তদন্ত করেছেন। কিন্তু দৃশ্যত কোনো ফলাফল আসেনি। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য আছে।

বহুল আলোচিত এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে।

এর কয়েক দিন পর পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল 'মোটিভ' নিশ্চিত হওয়া গেছে। ৪৮ ঘণ্টার বদলে সাত বছরেও খুনিরা গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্তে অগ্রগতির তথ্য বা 'মোটিভ' ও জনসমক্ষে আসেনি এই সময়ে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) দুই মাসের তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখাতে না পারায় র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছিলেন আদালত। ছয় বছর ১০ মাসে কোনো সফলতা দৃশ্যমান করতে পারেনি র‌্যাবও।

এই সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে ৬৩ বার সময় প্রার্থনা করেন র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা। নির্ধারিত তারিখে বারবার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে 'গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে' বলে জানানো হয়েছে আদালতকে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) পরীক্ষায় ঘটনাস্থলে 'অচেনা' দুই ব্যক্তির উপস্থিতির আলামত পাওয়া গিয়েছিল চার বছর আগে। সাগর-রুনির স্বজনসহ অনেকের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে যাচাই করেও কোনো মিল পায়নি র‌্যাব।

সন্দেহভাজন হিসেবে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের কারোর সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। নিহত দুজনের বাসা থেকে খোয়া যাওয়া ল্যাপটপটিও উদ্ধার করতে পারেনি র‌্যাব। এদিকে দীর্ঘ সাত বছরেও খুনের রহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাগর-রুনির স্বজন ও সহকর্মীরা।

তাঁরা বলছেন, প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবেই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে না। বিচারের দাবিতে আজ সোমবারও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) চত্বরে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবেন সাংবাদিকরা।

নিহত সাংবাদিক সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, বারবার তদন্ত পেছাচ্ছে। এত বড় হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা হবে না, কিভাবে মানব? মনে হয়, আর জীবদ্দশায় হয়তো বিচার দেখে যেতে পারব না।

রুনির ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান বলেন, কী বলব? এখন আর কিছু বলার নেই আমাদের। কী তদন্ত হচ্ছে তাও আমাদের জানা নেই।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ।

ওই সময় বাসায় ছিল তাঁদের একমাত্র সন্তান পাঁচ বছর বয়সী মাহির সরওয়ার মেঘ। মেঘের বয়স এখন ১২ বছর। ইন্দিরা রোডে নানার বাসায় মামার সঙ্গে থাকছে সে। গুলশানে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটরিয়াল (বিআইটি) স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে মেঘ।

স্বজনরা জানান, চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁরা মেঘকে মা-বাবার স্মৃতি আঁকড়ে থাকতে দেন না। সে স্বাভাবিকভাবে অন্য শিশুদের মতোই বেড়ে উঠছে। তবে ডানপিটে মেঘ মাঝেমধ্যেই মা-বাবার কথা মনে করে চুপ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৬৩টি অগ্রগতি প্রতিবেদনেই ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় দুই শ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সন্দিগ্ধ আসামিদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের নাম ও ঠিকানা যাচাই এবং পূর্ব ইতিহাস জানার জন্য গতিবিধি, চালচলন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়।

ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার কথা বলা হলেও চুরি যাওয়া ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগর-রুনির পরনের কাপড়, সাগরের হাত-পা যে কাপড় দিয়ে বাঁধা হয়েছিল সেই কাপড় এবং রুনির পরনের টি-শার্ট পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে।

২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা এক প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টগুলো পাওয়া গেছে। সে রিপোর্ট ও ক্রাইম সিন রিপোর্ট বা অপরাধস্থলের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দুজন পুরুষের ডিএনএর পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তার করা আট আসামি, নিহত দুজন এবং স্বজন মিলে ২১ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। ওই সব পরীক্ষায় সন্দেহভাজন খুনি শনাক্ত হয়নি। ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা আটজনের মধ্যে পাঁচজন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণচন্দ্র রায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

ওই পাঁচজন হলো রফিকুল, বকুল, সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান ওরফে অরুন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার দেখানো হয় পারিবারিক বন্ধু তানভীর এবং বাসার নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও হুমায়ূন কবীরকে। এদের মধ্যে তানভীর, মিন্টু ও পলাশ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে। বাকিরা কারাগারে আছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত চলছে। আদালতে সময়মতো অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী তদন্তকাজ চলছে।

বিভিন্ন সময় সাগর-রুনি হত্যার ব্যাপারে নানা ‘তত্ত্ব’ সামনে এলেও শেষে কোনোটিরও সুরাহা হয়নি। ‘চোরতত্ত্ব’ ও ভুক্তভোগীদের স্বজনদের ‘সন্দেহে’ রাখার বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল আদালতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছিল প্রথম তদন্ত সংস্থা ডিবি।

এরপর আদালতের নির্দেশে র‌্যাবের কাছে তদন্তের দায়িত্ব স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরের ২৬ এপ্রিল ভিসেরা আলামতের জন্য সাগর-রুনির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করেছিল র‌্যাব। সেই ভিসেরা পরীক্ষায় বিষক্রিয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এদিকে চার দফায় তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করেছে র‌্যাবও।

বিজনেস আওয়ার/১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮/এমএএস

উপরে