ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬


খেলাপি ঋণ পর্যালোচনায় টাস্কফোর্স গঠন হচ্ছে না

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ২৬ ০৯:৪২:৪৪



বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : খেলাপি ও অবলোপন ঋণ পর্যালোচনায় টাস্কফোর্স গঠন থেকে সরে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কেননা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে এ ধরনের একটি কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি ভালো ঋণগ্রহীতাদের বর্ধিত হারে সুদ রেয়াত দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে সায় দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা সম্পর্কিত একটি বিধান কার্যকর আছে। টানা ৩ বছর যেসব গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করছেন, তারা ঋণের হিসাবের বিপরীতে তিন বছর শেষে আদায়কৃত সুদ বা মুনাফার ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ রিবেট পাচ্ছেন। ভালো গ্রাহক চিহ্নিত হওয়ায় পরের বছর শেষে তিনি একই সুবিধা পাচ্ছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) ফজলুল হক বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কেন বাড়ছে, এ পর্যন্ত কত দাঁড়িয়েছে, এর পরিমাণ ও খেলাপি কমানোর পদ্ধতি জানতে চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। মতামত পাওয়ার পর কৌশল ঠিক করা হবে।

তিনি বলেন, খেলাপিদের কারণে অনেক টাকা নষ্ট হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুদ মওকুফ করা হলে লোকসান হবে না। কারণ তাদের মাধ্যমে ব্যাংকের মুনাফা হচ্ছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিন্তা হচ্ছে ভালো ঋণগ্রহীতারা বিদ্যমান যে সুবিধা পাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি দেয়ার।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ঋণখেলাপিদের কারণে ব্যাংকের ক্ষতি হয়। কিন্তু ভালো ঋণগ্রহীতাদের কারণে তা হয় না। তাই অন্য ঋণগ্রহীতাদের চেয়ে ভালোদের কমপক্ষে ১ শতাংশ কম সুদে ঋণ দেয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর আগে এ ধরনের উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে প্রচলন ছিল। ওই সময় গ্রাহক সমাবেশ করে ১০০ থেকে ২০০ জনকে একসঙ্গে অ্যাওয়ার্ড দেয়া হতো। তারা ‘সেরা ব্যাংক কাস্টমার’ হিসেবে পরিচিত হতেন। পরবর্তী সময়ে তারা নানাভাবে লাভবান হতেন। ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেয়া হলে ভালো হবে। এতে ঋণখেলাপিরাও চোখের সামনে তা দেখে সচেতন হবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

ওই সময় তিনি খেলাপি ঋণ ও অবলোপন ঋণ পর্যালোচনায় শক্তিশালী কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, কমিটি প্রতিটি কেইস আলাদা পর্যালোচনা করে দেখবে কী কারণে ঋণখেলাপি হচ্ছে। ওইসময়ই তিনি ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলেন।

পরে করণীয় নির্ধারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একাধিক বৈঠক করে বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে। সেখান থেকে বেশকিছু সুপারিশ উঠে আসে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টাস্কফোর্স গঠনের চিন্তা এখন আর করা হচ্ছে না। এ ধরনের কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিনিধির নামও চাওয়া হয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই কাজ। যে কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন থেকে সরে আসছে।

তবে ভালো ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য নেয়া সুপারিশগুলোর ওপর মতামত চাওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সুপারিশের মধ্যে 'ভালো ঋণগ্রহীতাকে' বিদ্যমান ঋণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণের সুদহার নির্ণয়ে বিশেষ সুবিধা দেয়া, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্প শুরুর সময় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগে অগ্রাধিকার দেয়া, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের বিশেষ সুবিধা (রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ডিসকাউন্ট সুবিধা) দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

নৈতিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে- ভাল ঋণগ্রহীতাকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া, সরকারি পরিবহন ব্যবহারে বিশেষ ছাড়, ভালো ঋণগ্রহীতার সনদ বা বিশেষ কার্ড প্রদান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) তাদের জন্য ‘স্ট্যান্ডার্ট গুড বরোয়ার’ হিসেবে আলাদা রিপোর্ট করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি ভালো। তবে বর্ধিত হারে সুদ রেয়াত সুবিধা দেয়ার পক্ষে ভিন্নমত দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেয়ার বিধান কার্যকর রয়েছে।

কোনো ঋণগ্রহীতা প্রথম তিন বছর অশ্রেণীকৃত স্ট্যান্ডার্ড অবস্থায় থাকলে এবং লেনদেন সন্তোষজনক হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ভালো গ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। টানা তিন বছর ঋণ পরিশোধের পর তিনি সুদ বা মুনাফার ন্যূনতম ১০ শতাংশ রিবেট পাচ্ছেন। পরের বছরও গ্রাহককে একই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে বর্ধিত সুবিধা দেয়া যেতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি ‘ডায়নামিক কাস্টমার ক্রেডিট স্কোর সিস্টেম’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতাদের জন্য অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট রিস্কস রেটিং সিস্টেম চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

যে কারণে ব্যাংকগুলোর সুযোগ রয়েছে একটি ‘ডায়নামিক কাস্টমার ক্রেডিট স্কোর সিস্টেম’ চালুর। এর যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে ‘লাইভল্যান্ড টেকনোলজি’ বা অনুরূপ সফটওয়্যার অ্যাপলাই করা যেতে পারে।

বিজনেস আওয়ার/২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯/এমএএস

উপরে