ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫


হঠাৎ আলোচনায় প্লেসমেন্ট

২০১৯ মার্চ ১৪ ১১:১২:৫৯

রেজোয়ান আহমেদ : ২০০৯-১০ সালে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের অন্যতম কারন বলেও মনে করা হয় ওই সময়ের অনিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট বাণিজ্যকে। এছাড়া ২০১০ সালের ধসের কারন অনুসন্ধানে ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনেও প্লেসমেন্টের বিষয়টি উঠে আসে। ঠিক ৮ বছর পরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে প্লেসমেন্ট। গত কয়েকদিন ধরে শেয়ারবাজারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্লেসমেন্ট। এই পদ্ধতিতে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে শেয়ার বেচাকেনা হচ্ছে। যা শেয়ারবাজারকে আরেকটি মহাধসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া চলমান প্লেসমেন্টের ভয়াবহতা নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেও সমালোচনা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

প্লেসমেন্ট নিয়ে গত কয়েকদিনের আলোচনাকে পূর্ণতা দিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়শন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভীর এক ফেসবুক স্ট্যাটাস। গত মঙ্গলবার তিনি এক স্ট্যাটাসে প্লেসমেন্টের বর্তমান অবস্থা ও শেয়ারবাজারের ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অনেক অযোগ্য কোম্পানি প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করছে। এছাড়া প্রিমিয়ামে প্লেসমেন্ট বিক্রি করে অনেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রিমিয়ামের অংশটুকু কিছু ব্যক্তি ও ইস্যুয়ার কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা নিজেদের পকেটে নিচ্ছেন। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াও প্লেসমেন্ট বিক্রির মতো ঘটনা ঘটছে। আর এই অনৈতিক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে একটি গ্রুপ বিভিন্নভাবে বিনিয়োগকারীদেরকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।

বর্তমানে কেমিকো ফার্মা নামের একটি কোম্পানি প্রতিটি ২০ টাকা করে ১০০ কোটি টাকার প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করছে। এরমধ্যে অভিহিত মূল্যের ৫০ কোটি টাকা কোম্পানিতে ও প্রিমিয়ামের বাকি ৫০ কোটি টাকা নিয়ে যাবে এই চক্রটি। অথচ এর আগে একই গ্রুপের উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ারবাজারে আসা ২টি কোম্পানির মধ্যে একটি তালিকাচ্যুত ও একটি ওটিসি মার্কেটে রয়েছে। কোম্পানি দুটি হলো এক্সেল সু ও বেঙ্গল বিস্কুট। একইভাবে কেমিকো ফার্মার ন্যায় আরও অনেক কোম্পানির নামে কিছু ব্যক্তি অনৈতিকভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

শেয়ারবাজারে চলমান মন্দার প্রধান কারণ হিসেবে বেপরোয়া প্লেসমেন্ট বিক্রিকে দায়ী করে ফেসবুক স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন শাকিল রিজভী। তিনি মনে করেন, প্লেসমেন্টের জন্য প্রতিনিয়ত বাজার থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্লেসমেন্টধারীরা কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ২-৩ গুণ লাভে শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছে। অন্যদিকে তাদের এই লাভ দেখে অন্য অনেক বিনিয়োগকারী সেকেন্ডারি বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়ে প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনছে।

আরও পড়ুন......

অনৈতিক প্লেসমেন্টের সমালোচনায় ডিএসইর পর্ষদ

তিনি বলেন, চলমান প্লেসমেন্টে একটি চক্র কৌশলে প্রতিটি শেয়ারে ৫ থেকে ১০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা ১০ টাকার শেয়ার ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করছে। কিন্তু তার কোন রেকর্ড নাই। আর এই রেকর্ডহীন প্রিমিয়ামের অর্থ কোম্পানিতে ঢুকছে না। এই ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল টাকা নিয়ে কেঁটে পরছে চক্রটি।

ডিবিএ সভাপতি বলেন, আইপিও পূর্ব প্রাইভেট প্লেসমেন্ট একটি স্বাভাবিক পক্রিয়া। যা বন্ধের পক্ষে আমরা নই। অনেক সময় ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য জরুরি প্রয়োজনে উদ্যোক্তারা প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহ করতেই পারেন। কারণ আইপিওতে মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে প্লেসমেন্ট হচ্ছে, তা ব্যবসা সম্প্রসারণে নয় বরং অসাধু উদ্দেশ্যেই হচ্ছে।

তথাকথিত প্লেসমেন্টের কারণে সাধারণ অনেক মানুষ লোভের বশে ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়ছে বলে জানান শাকিল রিজভী। ১০০ কোম্পানির প্লেসমেন্ট হয়ে থাকলে তাদের মধ্য থেকে মাত্র ১৫/২০টি আইপিওতে আসতে পারে। বাকিগুলো আটকে যাবে। কারণ এসব কোম্পানির মান এত খারাপ যে, হিসাবে কারসাজি করেও এগুলোকে আইপিওতে আনার উপযোগী করা যাবে না। ফলে এসব প্লেসমেন্টে বিনিয়োগকারীরা সর্বোস্ব হারাবেন।

ডিএসইর অন্যতম পরিচালক শরীফ আতাউর রহমান বলেন, ২০১০ সালের ধসের চেয়েও খারাপের দিকে যাচ্ছে শেয়ারবাজার। এর পেছনে একটিই কারন প্লেসমেন্ট বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের কারনে স্রোতের মতো প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে প্লেসমেন্টে ১ বছরের পরিবর্তে ৩ বছর লক ইন করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ডিএসইর আরেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বিজনেস আওয়ারকে বলেন, শেয়ারবাজারে এখন প্রধান সমস্যা হচ্ছে অনৈতিকভাবে প্লেসমেন্ট বেচাকেনা। এখন যেভাবে প্লেসমেন্ট হচ্ছে, তাতে শেয়ারবাজার ধসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্লেসমেন্টের অনৈতিক বাণিজ্য চলছে। এক্ষেত্রে কোন নিয়ম কানুন মানা হচ্ছে না। এছাড়া আইপিও’র তুলনায় প্লেসমেন্টে বেশি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। একইসঙ্গে যেনোতেনো কোম্পানিও প্লেসমেন্টে টাকা সংগ্রহ করছে। যার মধ্য থেকে অনেক কোম্পানিই নিশ্চিতভাবে আইপিও অনুমোদন পাবে না। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের টাকা আজীবনের জন্য আটকে যাবে। এমতাবস্থায় যারা প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে, তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার।

প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় প্রায় হাজার কোটি টাকা রয়েছে বলে জানান ডিএসইর এই পরিচালক। যেগুলো আইপিওতে আসার ১ বছরের মধ্যেই কয়েকগুণ করে লাভসহ বের করে নেওয়া হবে। এতে সেকেন্ডারি মার্কেটে অর্থ সংকট হবে। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে প্লেসমেন্ট শেয়ারে ৩ বছর লক ইন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। যে বিষয়ে ডিএসইর পর্ষদ সভায় এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামিতে প্রত্যেকটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে শর্ত হিসাবে প্লেসমেন্ট শেয়ারে ৩ বছর লক ইনের জন্য বিএসইসিতে সুপারিশ করা হবে। এছাড়া প্লেসমেন্টের শেয়ারের উপর ঘোষিত বোনাস শেয়ারেও ৩ বছরের লক ইনের সুপারিশ করা হবে।

ডিএসইর পরিচালক হানিফ ভূইয়া বিজনেস আওয়ারকে বলেন, সেকেন্ডারি বাজারের বাহিরে প্লেসমেন্ট বাজার ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বাজারে প্রিমিয়াম নামক বাণিজ্য গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানির জন্য প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু নয়, প্রিমিয়ামে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়িঁয়েছে। যা প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা রাখা দরকার।

তিনি আরও বলেন, একটি সাধারন মানের কোম্পানির আইপিওতে ২০-৩০ গুণ আবেদন জমা পড়ে। এ থেকেই বোঝা যায় আইপিওতে চাহিদার অভাব নেই। এমতাবস্থায় প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যুর দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। আর একান্তই প্রয়োজন হলে ৩ বছরের লক ইন শর্তে প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু করার অনুমোদন দেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।

ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বিজনেস আওয়ারকে বলেন, প্লেসমেন্ট নিয়ে কোম্পানির সঙ্গে কয়েকজন অনৈতিক বাণিজ্য শুরু করেছে। যারা বিএসইসির অনুমোদন ছাড়াই প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করছে। এছাড়া ১০ টাকার শেয়ার ২৫ টাকায়ও বিক্রি করছে। শেয়ারবাজারের স্বার্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এসব বিষয়গুলো দেখা উচিত।

তিনি বলেন, অযোগ্য কোম্পানি যেনো প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু করতে না পারে, সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আইপিও’র ন্যায় প্লেসমেন্ট অনুমোদন দেওয়ার আগেও ভালোভাবে যাছাই করতে হবে। এছাড়া প্লেসেমেন্টে সংগৃহিত ফান্ডের সঠিক ব্যবহারে নিরীক্ষকের সনদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্লেসমেন্টে কোম্পানিগুলোর আগ্রহী হয়ে উঠার প্রধান কারন হিসাবে আইপিও অনুমোদনে দীর্ঘ সময়কে দায়ী করেন মাহবুব এইচ মজুমদার। ফান্ড এখন দরকার পড়লেও কোম্পানিগুলোকে আইপিওতে সেই ফান্ড পেতে অপেক্ষা করতে হয় ২-৩ বছর। এই দীর্ঘ সময়কে কমিয়ে আনতে হবে।

বিজনেস আওয়ার/১৪ মার্চ, ২০১৯/আরএ

উপরে