ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬


রানা-সেতুকে হারানোর এক যুগ আজ

২০১৯ মার্চ ১৬ ১০:৫৯:০০

স্পোর্টস ডেস্ক : আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে, ১৬ মার্চ ২০০৭ তারিখে ঘরে ফেরা হয়নি দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা প্রতিভা মানজারুল ইসলাম রানা ও সাজ্জাদুল হাসান সেতুর।

দিনটি ছিলো ১৬ই মার্চ, শুক্রবার। ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজে। পরের দিন নিজেদের প্রথম ম্যাচের জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার দল।

হঠাৎই দেশ থেকে একটি ফোনকল পেলো দল। সেই ফোনকলে পাওয়া খবরে মুষড়ে পড়লো পুরো দল। ড্রেসিংরুমে জড়ো হওয়া সকল খেলোয়াড়দের মধ্যে তখন নিশ্চুপ নীরবতা।

২০০৭ বিশ্বকাপের ঘোষিত স্কোয়াডে জায়গা হয়নি বাঁহাতি স্পিনিং অলরাউন্ডার মানজারুল ইসলাম রানার। তাই দেশে বসেই নিজ শহর খুলনাতেই নিজের নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।

বাইকপ্রিয় রানা নিজের প্রিয় মোটরবাইকে করেই অনুশীলনে যাওয়া আসা করতেন। ১৬ই মার্চের দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অনুশীলন শেষে বাইকে চেপে বসেন মানজারুল ইসলাম রানা। পেছনে চাপিয়ে নিলেন জাতীয় লিগে তাঁর সতীর্থ খেলোয়াড় সাজ্জাদুল হাসান সেতুকে।

যাচ্ছিলেন দুজন শহরের অদূরে প্রিয় এক হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে।কিন্তু তাঁদের বাইকটি খুলনার বালিয়াখালি ব্রিজের কাছে আসতেই বিপরীত দিক থেকে আসা এক অ্যাম্বুলেন্সের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

ঘটনাস্থলে ইন্তেকাল করেন জাতীয় দলের অন্যতম নিয়মিত সদস্য মানজারুল ইসলাম রানা। গুরুতর আহত সেতুকে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালীন সময়ে রানার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিন। যার ফলে সর্বকণিষ্ঠ প্রয়াত টেস্ট ক্রিকেটারের জায়গায় বসে যায় মানজারুল ইসলাম রানার নাম।

দুর্ঘটনার খবর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই খবর পেতে দেরী হয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় দলের। দলের অন্যতম নিয়মিত একজন সদস্যের এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো দলে তখন শোকের ছায়া। কেউ কথা বলার পর্যন্ত সাহস পাচ্ছিলেন না।

ঠিক পরের দিনই আবার নামতে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে। রানার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, নিজের ভাইসম মাশরাফি বিন মুর্তজা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না কি হলো আসলে। ঘটনার আকস্মিকতায় শোকবিহ্বল হয়ে গেলেন তিনি। গায়ে তখন প্রচণ্ড জ্বর।

অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এসে জিজ্ঞেস করলেন, মাশরাফি, খেলতে পারবি? এমন প্রশ্ন শুনে যেনো ক্ষেপে গেলেন মাশরাফি, তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, কী কলেন সুমন ভাই? খেলতে পারবো না কেন? রানার জন্য খেলতে হবে।

পরদিন রানার শোককে শক্তিতে পরিণত করে শক্তিশালী ভারতকে ঠিকই হারিয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশ দল। করেছিল বিশ্বকাপের শুভসূচনা। সে ম্যাচে বল হাতে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছিলেন রানার জন্য খেলতে নামা মাশরাফি বিন মর্তুজা।

সদা হাস্যোজ্জ্বল রানা ছোটো দুষ্টামিতে মাতিয়ে রাখতেন পুরো ড্রেসিংরুম। ২০০৩ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া মানজারুল ইসলাম রানা চার বছরে খেলেছিলেন ৬ টি টেস্ট এবং ২৫টি ওয়ানডে ম্যাচ।

এর মধ্যে ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ০-২তে পিছিয়ে থাকা সিরিজে তাঁর অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সে ৩-২ তে জিতে যায় বাংলাদেশ দল। সিরিজটিতে খাদের কিনারায় থাকা বাংলাদেশ দলকে একা হাতে জিতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

একই দিনে মৃত্যুবরণ করা অন্য ক্রিকেটার সাজ্জাদুল হাসান সেতু কখনো জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ না পেলেও, নিয়মিতই খেলতেন জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট।

জাতীয় দলের তৎকালীন কোচ ডেভ হোয়াটমোরের প্রিয় শিষ্য ছিলেন রানা। তাই ডেভ হোয়াটমোর বাংলাদেশে আসলে সুযোগ পেলে চলে যান রানার বাড়িতে। দেখে আসেন প্রিয় শিষ্যের স্মৃতিগুলোকে।

রানার স্মৃতিকে ধরে রাখতে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ডের নাম রাখা হয়েছে 'মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ড'।

বিজনেস আওয়ার/১৬ মার্চ, ২০১৯/এমএএস

উপরে