ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬


৩৫ মিউচ্যুয়াল ফান্ড এখন বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা

২০১৯ এপ্রিল ১৪ ১৭:৪৯:৩৬

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক:এক সময়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে উৎপাদনশীল কোম্পানির মতো মনে করা হতো। পরবর্তীকালে সেই ভাবনার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। এখন আর মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে উৎপাদনশীল কোম্পানির মতো ভাবা হয় না। বরং পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসাবে মনে করা হলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে এখন গলার কাঁটা মনে করা হয়। এখানে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ রাখার বদলে উল্টো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এ কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমাগত নেতিবাচক অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইরের দেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যারা পুঁজিবাজার ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারেন না তারা সাধারণত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেন। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপদে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

একদিকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো বিনিয়োগকারীদের ভালো মুনাফা দিতে পারছে না, অন্যদিকে বাজার সাপোর্টের ক্ষেত্রেও কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে আস্থাহীনতা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক পুঁজিবাজারেও।

তারা বলছেন, ফান্ড ম্যানেজারদের ব্যর্থতার কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এ অবস্থা। ফান্ড ম্যানেজারের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের অধিকাংশই অদক্ষ। পোর্টফোলিও তৈরির ক্ষেত্রে তারা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেন না। অবার কিছু কিছু ফান্ড ম্যানেজারের সততারও অভাব রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কথা চিন্তা না করে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা অনৈতিকভাবে ব্যক্তিগত ঋণ দিচ্ছেন।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুঁজিবাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড রয়েছে ৩৮টি। এর মধ্যে ৩৫টি ইউনিটের বাজারমূল্য অভিহিত মূল্যের নিচে। অভিহিত মূল্যের ওপরে থাকা তিনটি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে গ্রামীণ স্কিম টু’র ১২ টাকা ৮০ পয়সা, এনএলআই ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ১২ টাকা ৮০ পয়সা এবং এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ডের ১০ টাকা ইউনিটপ্রতি মূল্য দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মূল্য অভিহিত মূল্যের নিচে নামার প্রধান কারণ হতে পরে, তারা বিনিয়োগকারীদের ঠিক মতো মুনাফা দিতে পারছে না। ঠিক মতো মুনাফা দিতে না পারায় নতুন বিনিয়োগকারীরা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন না।’

তিনি বলেন, ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এ অবস্থার জন্য ফান্ড ম্যানেজারদের ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের উদ্দেশ্য হলো তারা একটি পোর্টফোলিও তৈরি করবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমে যাবে। কিন্তু তাদের পোর্টফোলিও নির্বাচন যদি সঠিক না হয়, তাহলে তো বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দিতে পারবে না।’

‘এছাড়া আমাদের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা হুজুগে মাতে। এখানে রয়েছে ৩৮টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, সংখ্যায় অনেক বেশি। এতো মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দারকার ছিল না। যেসব মিউচ্যুয়াল ফান্ড দেয়া হয়েছে, তাদের ব্যবসায়িক ভলিউম কম। যে কারণে তারা যথাযথ বিনিয়োগ করতে পারছেন না’- যোগ করেন এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর পোর্টফোলিও দেখলে দেখা যাবে, তারা আজেবাজে শেয়ার কিনে বসে আছে। অথচ ভারতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড একেবারে জমজমাট। আর আমাদের মিউচ্যুয়াল ফান্ডের খবর নেই। কেউ মুরগির খোয়াড়, কেউ গরুর খোয়াড়, কেউ পারসোনাল লেভেলে লোন দিয়ে বসে আছেন। তাহলে এসব মিউচ্যুয়াল ফান্ড তো অবশ্যই নিচে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ম্যানেজারদের মধ্যে এখনও প্রফেশনালিজম আসেনি। কোনো স্বচ্ছতা নেই। ফান্ড ম্যানেজারদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। এমনকি তাদের সততা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড ম্যানেজারদের অবশ্যই সততা থাকতে হবে। তাদের লক্ষ্য হতে হবে বাজারকে সাপোর্ট দেয়া।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বখতিয়ার হাসান বলেন, ‘ফান্ড ম্যানেজাররা চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। যে কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। তাদের মধ্যে এখনও পেশাদারিত্ব তৈরি হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ফান্ড ম্যানেজারদের ব্যর্থতার কারণে আমাদের শেয়ারবাজারে মার্কেটের রিটার্ন থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের রিটার্ন কম। ফলে বিনিয়োগকারীরা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কিন্তু বাইরের উন্নত শেয়ারবাজারে দেখা যায়, মিউচ্যুয়াল ফান্ড খুব ভালো রিটার্ন দেয়। বাজারের রিটার্ন থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের রিটার্ন অনেক বেশি থাকে।’

বিজনেস আওয়ার/এসএম

উপরে