ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬


রাফি ও তাঁর মাকে ভয় দেখানো হয়েছিল

২০১৯ এপ্রিল ২১ ১৩:৫৬:৩৭

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : শ্লীলতাহানির মামলা করার পর স্থানীয় প্রশাসন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান ও তাঁর পরিবারকে ভয় দেখিয়েছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি কমিটির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে নুসরাতের মা শিরিন আখতার অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করার পর তাঁরা ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি তাঁদের কথা শোনেননি। বরং তাঁদের মানহানির মামলা মোকাবিলা করতে হতে পারে বলে ভয় দেখিয়েছিলেন তিনি।

৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় হাত-পা বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালান মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার অনুগতরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অসহযোগিতার অভিযোগ ছিল। দায়দায়িত্ব খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দপ্তর পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির একটি সূত্র নিশ্চিত করে, নুসরাতের মা তাঁর বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আনেন।

পুলিশের গঠিত এই কমিটির প্রধান উপমহাপরিদর্শক রুহুল আমিনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলেছেন পরে যানাবেন বিস্তারিত।

তবে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যাঁর বিরুদ্ধে নুসরাতের মায়ের অভিযোগ, ফেনীর সেই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিম সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। আর ওই মাদ্রাসারই অধ্যক্ষ ছিলেন সিরাজ উদদৌলা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এর আগেও মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও অর্থ তছরুপের অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগ নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেননি।

নুসরাতকে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের কোনো ভুলত্রুটি ছিল কি না, খতিয়ে দেখতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, পি কে এনামুল করিম ওই কমিটিরও প্রধান।

এ ব্যাপারে পি কে এনামুল করিম বলেন, নুসরাত ও তাঁর পরিবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, এটা সত্য। আমি তাঁদের বলেছি, অধ্যক্ষের স্বভাব খারাপ। মামলা করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এই পরিবারটি এখন কেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে, সেটা বুঝতে পারছি না।

শিরিন আখতার পুলিশের কমিটির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, নুসরাতকে মাদ্রাসার ভেতরে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার দুদিন আগে ৪ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে তিনি নুসরাত ও তাঁর এক ছেলেকে নিয়ে এনামুল করিমের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে দেখা করতে যান। তিনি তাঁদের কথা শুনতে চাননি।

ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, এখন কেন এসেছেন? আপনারা তো মামলা করে ফেলেছেন। মামলা করার আগে আসতেন, তাহলে দেখতাম কী করা যায়। এখন মামলায় যা হবে, তাই। নুসরাত তখন বলেছিলেন, আপনি আমার বাবার মতো। আপনি আমার কথাগুলো শোনেন।

নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষের ব্যাপারে অভিযোগ জানানোর চেষ্টা করলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, প্রিন্সিপাল খারাপ তো সবাই জানে, তুমি তাঁর কাছে গেছ কেন?’ নুসরাত বলেন, তিনি ইচ্ছে করে যাননি। তাঁকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জবাবে পি কে এনামুল করিম বলেন, যখন গেছ, হজম করতে পারলে না কেন? তোমার বাবাকে মাদ্রাসায় বসানোর জন্য এ রকম নাটক সাজিয়েছ। আপনারা যে মামলা করেছেন, তা প্রমাণ করতে না পারলে আপনাদের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষ ও তাঁর লোকজন ৫০ লাখ টাকার মানহানির মামলা করবেন।

সূত্রগুলো বলছে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আগেও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, উপবৃত্তির তালিকায় নাম তোলার কথা বলে আলিম দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে গত বছরের ৩ অক্টোবর অধ্যক্ষ তাঁর কক্ষে ডেকে হয়রানি করেন।

ওই শিক্ষার্থীর বাবা লিখিত অভিযোগে জানান, ওই দিন অফিস সহকারী ও আয়া অধ্যক্ষের কক্ষে মেয়ের কান্নার শব্দ পেয়ে উদ্ধার করেন। মেয়ে বাড়ি ফিরে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

নুসরাতের বাবা মৌখিকভাবে পরিচালনা পর্ষদের তিনজন শিক্ষক প্রতিনিধিকে বিষয়টি জানান। পাঁচ দিন পর তিনি লিখিতভাবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি জানান। ওই চিঠির অনুলিপি তিনি সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে দেন।

পি কে এনামুল করিম দাবি করেন, অধ্যক্ষের বিষয়ে অন্য যেসব অভিযোগের কথা এখন শোনা যাচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। কোনো লিখিত অভিযোগ তাঁদের কাছে করা হয়নি।

শিরিন আখতার পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, নুসরাতকে অধ্যক্ষ শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছেন, এই অভিযোগ তিনি তাঁর ছোট ছেলের মুখে শুনতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁকে নিয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে কৈফিয়ত চান।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ তাঁকে বলেন, ‘তুমি কোন সাহসে এখানে ঢুকেছ? এটা অফিস।’ এ কথা বলেই অধ্যক্ষ কোথাও ফোন করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সোনাগাজী থানার উপপরিদর্শক ইকবাল হোসেন হাজির হন। অধ্যক্ষ পুলিশকে বলেন, ‘ওরা হাঙ্গামা করছে নাটক সাজিয়ে।’

এরপর উপপরিদর্শক নুসরাতকে উল্টাপাল্টা জেরা করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে নুসরাত অজ্ঞান হয়ে যান। তখন পুলিশের উপপরিদর্শক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে বেহুঁশ হয়ে যেতে হবে।

বিজনেস আওয়ার/২১ এপ্রিল, ২০১৯/এ

উপরে