ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬


তিন মাসেও পাল্টায়নি পুরান ঢাকার চিত্র

২০১৯ মে ২৭ ১০:৩৯:০০

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল বিস্ফোরণে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ৭০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম অপসারণে অভিযান শুরু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

এসব কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে কেরানীগঞ্জে নির্মাণাধীন কেমিক্যাল পল্লিতে স্থানান্তরের কথা থাকলেও ৩ মাসে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পুরান ঢাকার বংশাল, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, আরমানিটোলাসহ আশপাশের এলাকার বিভিন্ন ভবনে রয়েছে কেমিক্যাল গুদাম।

বংশালের মাহুতটুলি এলাকার প্রতিটি ভবনের বাইরে কেমিক্যালের দোকান ও ভেতরে গুদাম দেখা গেছে। আরমানিটোলার শাবিস্তান হল গলি ও মিডফোর্ড রোডে গিয়ে দেখা গেছে অসংখ্য কেমিক্যালের গুদাম।

স্থানীয়রা জানান, রাত ১১টার পর এখানে বড় বড় কন্টেইনারে করে কেমিক্যাল আনা হয়। ভোরের আগেই ভবনে কেমিক্যাল ঢুকিয়ে ঘরবাড়ি তালা দিয়ে দেওয়া হয়।

বংশালের মাহুতটুলির ৭৫ নম্বর বাড়ির নিচে কেমিক্যালের দোকান ও বাড়ির ভেতর গুদাম পাওয়া গেছে। পাশের গলির ভেতর ৭৬ ও ৭৭ নম্বর বাড়ি দুটিতে প্রায় ৫০ জন বাসিন্দা থাকেন। এই ভবনের নিচতলায় একটি গুদাম রয়েছে।

৭৯ নম্বর বাড়ির পেছন দিয়ে গুদামে যাওয়ার জন্য আলাদা দরজা রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝবে না এসব বাড়িতে এখনও কেমিক্যাল গুদাম রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাহুতটুলির এক স্থায়ী বাসিন্দা বলেন, প্রতিদিন রাতে এসব বাসায় কেমিক্যাল রাখা হয়। কেমিক্যাল রাখার ফলে ক্ষতিকারক সাদা পাউডার আশপাশের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, এলাকার যেসব বাসায় কেমিক্যাল গুদাম রয়েছে তাদের একাধিকবার অনুরোধ করার পরও তারা গুদাম সরায় না। পুলিশ কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আসলে বাসায় ঢুকতে দেয় না।

তিনি আরওবলেন, চকবাজারের আগুনের পর আমরা আতঙ্ক নিয়ে এই ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। অবিলম্বে কেমিক্যাল গুদাম না সরালে চুড়িহাট্টার মতো আরও ট্র্যাজিডি হতে পারে।

বংশাল এলাকায় কেমিক্যাল থাকার কথা অস্বীকার করে বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাহিদুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে কেমিক্যাল গুদামগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে বংশাল থানা এলাকায় কেমিক্যাল গুদাম নেই।

পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, আরমানিটোলা বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল বিক্রির বড় বাজার। বাংলাদেশের সব গার্মেন্টস শিল্প ও কল-কারখানায় ব্যবহৃত কেমিক্যাল এই বাজারেই কেনা-বেচা হয়। তবে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর এসব গুদাম থেকে দাহ্য কেমিক্যাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, কেরানীগঞ্জ কেমিক্যাল পল্লি এখনও প্রস্তুত হয়নি। তবু প্রসাশন ও সিটি কর্পোরেশনের অনুরোধে আরমানিটোলা ও মিডফোর্ড এলাকা থেকে দাহ্য কেমিক্যাল সরিয়ে শ্যামপুরে অবস্থিত ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে আরমানিটোলায় গুদামগুলোতে গার্মেন্টস আইটেম, ফুড আইটেম, ফার্মাসিটিক্যাল আইটেম ও পারফিউমারি আইটেমের কেমিক্যাল রাখা হয়েছে। এগুলো দাহ্য কেমিক্যাল নয়।

আরমানিটোলা এলাকার মিডফোর্ড রোডের দিদার পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যালের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজ বলেন, আরমানিটোলা এলাকায় এখন আর কোনও দাহ্য কেমিক্যাল গুদাম নেই। এখানে যা আছে সব মৌলিক কেমিক্যাল, এগুলো দাহ্য পদার্থ না।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী আব্দুল জলিল বলেন, আরমানিটোলা এলাকায় বর্তমানে কোনও দাহ্য কেমিক্যাল নেই। এখানে যেসব গুদাম রয়েছে তার সবই সাধারণ কেমিক্যাল। এগুলো দাহ্য কেমিক্যাল নয়।

এদিকে ডিএসসিসি দাবিও করছে, বর্তমানে পুরান ঢাকার কোথাও কোনও কেমিক্যাল গুদাম নেই। আর বিস্ফোরক পরিদফতর বলছে, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ এপ্রিল পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম অপসারণের কাজ পরিচালিত হয়েছে।

এই অভিযানের মাধ্যমে অনেক কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণ করা হয়েছে। গোপনে কেউ এখনও পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গুদাম রেখেছে কিনা, সেটি অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনে আবারও অভিযান চালানো হবে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গুদাম অপসারণে গঠিত টাস্কফোর্সের অভিযানে মোট ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ২৭টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়। সময় দেওয়া হয় ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে। সেইসঙ্গে জরিমানা করা হয় মোট ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।

ডিএসসিসির নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিস্ফোরক পরিদফতরের ঘোষিত ৩৬টি অতিদাহ্য কেমিক্যাল আইটেম বর্তমানে পুরান ঢাকায় নেই। আরমানিটোলায় গুদামগুলোতে যেসব কেমিক্যাল বিক্রি করা বা রাখা হচ্ছে, সেগুলো দাহ্য নয়। সেগুলোর অনুমতি রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল পল্লি নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটি নির্মাণ হলে পুরান ঢাকার আরমানিটোলা থেকে সব কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নেওয়া হবে।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা এলাকায় কোনও কেমিক্যাল গুদামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে প্লাস্টিক দানার অসংখ্য গুদাম রয়েছে, যা দাহ্য পদার্থের অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিজনেস আওয়ার/২৭ মে, ২০১৯/এ

উপরে