ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬


নতুন আইনে ভ্যাট ও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য সুখবর

২০১৯ জুন ১০ ১৩:১৭:৩৩

শামসুর রহমান বিপ্লবঃ

আমাদের দেশে এখনও ততটা কর দেয়ার অ্ভ্যাস গড়ে ওঠেনি বললেই চলে। সরকারের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে সহজবোধ্য ও আস্থার জায়গায় জনগনের মাঝে আনতে। যারা কর্পোরেট সংষ্কৃতি চর্চা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তাদের মাঝেই দেখা গেছে কর দেয়া নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই। তবে আম-জনতার মাঝে এ কর যেনো একটা বোঝা হয়ে থাক

ছে। সাধারণ মানুষের দাবী, আমরা কর দেয়ার পরও সে সুবিধাটুকু পাচ্ছি না যা পাওয়ার কথা ছিল।

দেশে আইন আছে তবে তার যথাযোগ্য প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। উদাহরণ টেনে বিএসটিআইর সাম্প্রতিক ৫২টিপন্য নিয়ে চলা কার্য্যত্রমের কথা বলছেন। এ পন্য গুলো মানহীন হয়েই বাজার বেশ কিছুদিন থেকেছে। তারা মনে করছেন সরাসরি উৎপাদনকারীর কাছে এ চাপ না পৌছে আগেই বিক্রেতার উপর চাপ দেয়া হয়ে গেছে।পন্য কিনে মজুদ করলেও সে পন্যর হিসাব তো উৎপাদনকারীর কাছে আছে। তাকে কেন বাধ্য করা হলোনা পন্য গুলো ফেরত নিতে। উৎপাদনকারীর উপর চাপ না দিয়ে বিক্রেতার উপর যে খঢ়গ চাপানও হয় তাও যুক্তি সংঙ্গত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা দাবী জানিয়েছেন। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষ কর দেয়ার প্রতি কতটা আগ্রহী হবে সেটাও পর্যবেক্ষন করার বিষয়।এনিয়ে সরাকারের চেষ্টার অন্ত নেই্। এবার নতুন ভ্যাট আইন ও পরীক্ষামুলক বাস্তবায়নের বিশেষ উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। যদিও নতুন ও পুরোনো আইনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। প্যাকেজ ভ্যাট ছাড়া প্রায় সবই বহাল থাকছে। একাধিক ভ্যাট হার, টার্নওভার কর থাকবে। বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক হারও বহাল রাখার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ।


বিদ্যমান পুরোনো আইনে ২, ৩, ৪.৫, ৫, ৭, ১০ ও ১৫—এই সাতটি ভ্যাট হার আছে। নতুন আইনে ভ্যাট হার হচ্ছে পাঁচটি। এগুলো হলো ২, ৫, ৭.৫, ১০ ও ১৫। এনবিআর সূত্রে জানিয়েছে, পণ্য বা সেবা আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ, উৎপাদনে ১০ শতাংশ, পাইকারি পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ এবং খুচরায় ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হবে।


প্রথমে চারটি ভ্যাট হার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখন আরেকটি নতুন হার করা হচ্ছে। এত দিন যেসব পণ্য বা সেবায় ট্যারিফ মূল্য ও সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের ওপর ভ্যাট দিত, সেখানে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা হচ্ছে।


এ ছাড়া মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন সেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবা—এসব ক্ষেত্রে মুসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় ১ হাজার ৯৮৩টি পণ্য ও সেবা আছে।

এনবিআর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে নতুন আইন বাস্তবায়ন শুরু হলেও আইনটি বাস্তবায়নে আপাতত কঠোর অবস্থানে যাবে না এনবিআর। ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব-নিকাশ, ভ্যাট রিটার্নই মেনে নেবে। অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের মতো করে নতুন আইনটি চালু হবে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য সব ব্যবসায়ী সংগঠনে বিশেষ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হচ্ছে।


ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে পুরোনো আইনের আদলেই নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইন হচ্ছে। নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে একক হার থাকছে না। পুরোনো আইনের সাতটি হারের পরিবর্তে নতুন আইনে সব মিলিয়ে পাঁচটি ভ্যাট হার হচ্ছে। এই হারগুলো হলো ২, ৫, ৭.৫, ১০ ও ১৫। নতুন ভ্যাট আইনটি সংশোধন করে আরও বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালের মূল আইনে বলা হয়েছিল, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন ৩০ লাখ টাকার কম হলে কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। এখন তা বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে। টার্নওভার করের সীমা ন্যূনতম বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এখন থেকে ৮০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা বার্ষিক লেনদেন হলে টার্নওভার কর দিতে হবে। টার্নওভার করহার ৩ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ করা হচ্ছে।আবার পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থাও পুরোপুরি হবে না। হিসাব–নিকাশ ব্যবস্থাও আগের মতোই খাতা–কলমে রাখা যাবে। সীমিত পরিসরে অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট রিটার্ন জমা, ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দিয়ে আপাতত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু হবে।নতুন আইনে একাধিক ভ্যাট হার হওয়ায় রেয়াত নেওয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। রেয়াত নেওয়ার কৌশল পরিষ্কার করেনি এনবিআর। এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ১৫ শতাংশ ছাড়া অন্য ভ্যাট হারের ক্ষেত্রে রেয়াত নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।


২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে নতুন ভ্যাট আইন চালু হওয়ার কথা ছিল। ওই বছর বাজেট ঘোষণার পরও একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের পরিবর্তে একাধিক ভ্যাট হারের দাবিতে ব্যবসায়ীরা অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত চালু হওয়ার দুই দিন আগে আইনটি দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। দুই বছর আগেই এফবিসিসিআই নতুন আইনের প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য সমীক্ষা করার দাবি করেছিল। এনবিআর সেটি করতে পারেনি। নতুন আইনের হিসাব–নিকাশ করার জন্য সফটওয়্যার ব্যবহারে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। এনবিআর ১১টি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবে এখনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ওই সব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সফটওয়্যার তৈরি করেনি। উল্লেখ্য, বার্ষিক ৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।এনবিআর দুই বছর আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিজেদের বেচাকেনার হিসাব রাখার জন্য কেনা দামে ৫০ হাজার ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন দেবে এনবিআর। সেটাও দিতে পারেনি সংস্থাটি।আগামী বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য সুখবর আসতে পারে। করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে। বিনিয়োগে কর রেয়াতের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সরকারের নির্দিষ্ট কিছু খাতে (যেমন-সঞ্চয়পত্র) বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়। এখন আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়া যায়। এটি এবার এককভাবে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। এতে যাঁরা বেশি আয় করেন, তাঁরা বেশি কর রেয়াত সুবিধা পাবেন।সংশ্লিষ্টদের দাবী আমাদের দেশের করদেয়ার ব্যাবস্থা আরো সহজ ও গ্রহনযোগ্য করা হোক যাতে সরকার আরো বেশী কর সংগ্রহ করতে পারে। সেই সাথে জবাবদিহীতার জায়গাটাও আরও প্রসস্ত করা হোক জনগনের জন্য। তাহলেই দেশে কর প্রদানের আগ্রহ বাড়বে ও সাধারণ মানুষ ঝুকবে এদিকে।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

উপরে