ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬

পেছনের খেলোয়াড়েরা স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় ব্যর্থ

‘আমাদের চাকরীর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই’

২০১৯ জুলাই ৩১ ১৮:২১:৩৫

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেছেন, আমাদেরকে চাকরীর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী করে এসেছি। তবে সামনের দিনগুলো স্টেকহোল্ডারদের জন্য কঠিন হবে। এটা শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদেরকে বুঝতে হবে। আর সেটা যদি সত্যিকারভাবে আমাদের রেগুলেটর হিসাবে আবির্ভূত হতে হয়, তাহলে হবে দূর্ভাগ্যজনক।

বুধবার (৩১ জুলাই) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, শেয়ারবাজারে ১৯৯৬ ও ২০১০ ধস নামার সুযোগ নেই। সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শেয়ারবাজারের পেছনে যারা খেলছেন, তারা অর্থনীতির বেগবান চান না। তারা একটি স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করতেও ব্যর্থ হচ্ছেন। আপনাদের প্রত্যাশার উদ্দীপক স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা হচ্ছে না। স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এমন ব্যর্থতার মুখে স্টক এক্সচেঞ্জের এমডিকেও বিদায় নিতে হয়েছে। আমরা ডিমিউচ্যুয়ালাইজড করেছি, স্টক ডিলারদের স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য নয়। বোর্ড মিটিংয়ে ব্রোকার ডিলারদের উপর নির্ভর হয়ে যাওয়ার জন্য নয়। ভারপ্রাপ্ত এমডি আছেন, সেগুলো যেনো মনে থাকে।

তিনি বলেন, কমিশন হয়তো আপনাদের মতো রিঅ্যাক্ট করবে না, তবে কমিশন ঠিকই নিজেদের মতো কাজ করবে। আমাদেরকে চাকরীর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী করে এসেছি। আমরা সংস্কার করতে এসেছি। আমরা সব জায়গায় সংস্কার করেছি। কিন্তু ডিএসই পরিপূর্ণভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য তার ব্যবস্থাপনা গত ৫ বছরে কোন একটি উদ্যোগ কি নিতে পেরেছে। সুতরাং মানসিক অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। মানুষকে মোটিভেশনাল অ্যাপ্রোচে কাজ করাতে হবে। সেই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান যদি ডেভোলপ করতে না পারে, তাহলে কমিশনকে বিকল্প এক্সচেঞ্জের চিন্তা করতে হবে। এবং এটি শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন..

নেপথ্য নায়কেরা বিনিয়োগকারীদের রাস্তায় নামিয়েছে

আমার ব্রোকারস যদি বলে আইপিও রুলস এমন হবে, বিনিয়োগকারী যদি বলে বাই ব্যাক করতে হবে- এগুলো হাস্যকর। বাই ব্যাক যদি করতে হয়, আপনি মাখন নেবেন, আর দাম কমে গেলে কোম্পানিকে বাই ব্যাক করতে হবে। তাহলে তো কল অপশন থাকতে হবে। আমাদের কল অপশন নেই। এছাড়া বাই ব্যাক আইন নেই। এখন এসব যদি মিছিলকারীদের বক্তব্য হয়, শেয়ারবাজারের নীতিনির্ধারক যদি মিছিলকারীরা হয়- তাহলে কেমনে হবে। শেয়ারবাজারে আপনাদের ভূমিকা কি, আপনাদের রোল কি? এগুলো পরিস্কার করতে হবে। জানান এই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

নিজামী বলেন, কিছুদিন আগে পত্রিকায় কোন একটি কোম্পানির ফাইন্যান্সের সঙ্গে ডিএসইর মিল নেই বলে অনেক কিছু হয়েছে। আপনারা যদি এতই ফাইন্যান্সিয়াল বুঝেন, তাহলে বিনিয়োগকারীদেরকে রাস্তায় নামতে হয় কেনো? ফেসবুক ১ ডলারে লিস্টেড হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ৩৬ ডলারে হয়। এ নিয়ে সেখানে কেউ মিছিল করেনি। এছাড়া শেয়ারটির দর ২-৩ ডলারে নামলেও মিছিল করেনি।

তিনি বলেন, আমাদের বাচ্চাদের পেছনে অনেকগুলো বই দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের হাতে কোন খাতা নেই। আজকে আমাদের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাটা এমন। আপনি চাইলেন ইস্যুয়ারকে আউট করে দিয়েছি। আর বিনিয়োগকারীদেরকে রাস্তায় নামিয়েছি। কিন্তু শেয়ার কেনা-বেচা করার জায়গা ব্রোকারেজ হাউজে মিছিল করার কথা। তাহলে লক্ষ্যভ্রষ্ট। এর উদ্দেশ্য কি?

নিজামী বলেন, আমরা স্টক এক্সচেঞ্জকে সাবলম্বী করার জন্য ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনে সুপারিশ করার ক্ষমতা দিয়েছিলাম। যেকোন আইপিওর আগে কোন ব্যত্যয় থাকলে জানাবেন। স্টক এক্সচেঞ্জের পজিটিভ সুপারিশ আসার পরে সেই আইপিওর অনুমোদন দেব। সেই জায়গাতেও কাঙ্খিত ফলাফল আসেনি। সুপারিশ করার পরেই তারা আবার পর্যবেক্ষনে ফিরে গেছে। এজন্য স্টক এক্সচেঞ্জের এখনকার পরিচালক ও অতিতের সভাপতিকে ২০১২ সালে শোকজ করা হয়েছিল। কিন্তু উনি পর্ষদে থাকাকালীন আবার একই ভুলটা হয়েছে। এটাকে ভুল বলব না, ইচ্ছাকৃত বলব।

আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে কমিশন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় যাছাই-বাছাই করার সুযোগ থাকে। কিন্তু রেগুলেটরের সিদ্ধান্তের পরে স্টক এক্সচেঞ্জ যদি মনে করে সেটি রিভিউ করবে, সেই ক্ষমতা কোন আইনে স্টক এক্সচেঞ্জকে দেওয়া হয়নি। এই আত্ম বাক্যটি যারা বুঝতে পারে না, তারা কি স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করার সামর্থ্য রাখে। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদেরকে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। কারন এই স্টক এক্সচেঞ্জ দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন আসবে না। তাই ভাবতে হচ্ছে আপনার কাছে কি সুপারিশের ক্ষমতা থাকবে, নাকি পর্যবেক্ষনের ক্ষমতা চর্চা করবেন। লজ্জা! আবারও বলছি, স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ক্ষমতা থাকবে, নাকি পর্যবেক্ষনের ক্ষমতা চর্চা করবেন।

এই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমরা রেগুলেটররা আগেই বলেছি, স্পেস নেই না। যে স্পেস পেলেই কথা বলে যাবো। আমরা কাজেই প্রমাণ করব, আসলে কি চাই। আমাদের নৈতিক অবক্ষয় হলে, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু শেয়ারবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে এমন কিছুকে বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেওয়া হবে না। এবং যেতে দেওয়া হয়নি। আমরা রেগুলেটর হিসাবে ভূমিকা পালন করেছি। কিন্তু এখন যদি সত্যিকারভাবে রেগুলেটর হিসাবে আবির্ভূত হতে হয়, তাহলে সেটা দূর্ভাগ্যজনক হবে।

তিনি বলেন, আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করেছেন, বাজারের এই মুহুর্তে কি করতে পারি। আমি তাকে বললাম মিছিল করতে পারেন। মিছিলের বিরুদ্ধে মিছিল করতে পারেন। বলে দেন যে রেগুলেটরকে দায়ী করা যাবে না। রেগুলেটরের কোন সিদ্ধান্তের কারনে গত ২ মাসে বাজারে সূচক পড়েনি। এ বিষয়ে আপনাদের বলতে দ্বিধা কেনো? এ বিষয়ে আপনাদের প্রেস কনফারেন্স করতে দ্বিধা কেনো? কেনো আপনারা বলছেন না, যে রেগুলেটরের কেনো সিদ্ধান্তের কারনে গত ২ মাসে সূচক পড়েনি। এটি আমাদেরকে দৃশ্যমান হতে হবে। তা না হলে আমাদের নিয়ন্ত্রনের পলিসি পরিবর্তন করতে বাধ্য হব। আপনাদেরকে পছন্দ করি, ভালোবাসি বলেই এই কথাগুলো বলছি। কিন্তু আপনারা অন্যায্য দায় চাপিয়ে দেবেন, সেটির ভার বহন করার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমরা যে সংস্কার করে গেছি, ইতিহাস তা যুগ যুগ মনে রাখবে।

নিজামী বলেন, বোকারেজ হাউজ আপনাদের। বিনিয়োগকারী আপনাদের। সেখান থেকেই গুজব ছড়ায়। কিন্তু সেই ব্রোকারেজ হাউজের বিরুদ্ধে মিছিল দেখি না। মিছিল হচ্ছে রেগুলেটরের বিরুদ্ধে। এটির উদ্দেশ্য কি? এটি আপনাদেরকে পরিস্কার করে বলতে হবে। আমাদেরকে বোঝাতে হবে। এজন্য আপনাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে আহবান করছি। সামনের দিনগুলো কিন্তু অনেক কঠিন হবে। এটা আপনাদেরকে বুঝতে হবে। আমরা হয়তো এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে যাবো, আমরা পরিস্কার ভাষায় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জানাবো, এসবের কোন কিছুর জন্যই আমাদেরকে দায়ী করা যাবে না। যদি না আমাদের কোন সিদ্ধান্তের কারনে বাজার পড়ে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের প্রধান আকর্ষন হচ্ছে প্রাইমারী মার্কেট। কমিশনের স্পিরিটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যু ম্যানেজার ও ব্রোকারেজ হাউজ চলতে পারছে না। অথচ তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট। আমরাতো আমলাতান্ত্রিক চরিত্রের লোক। আমাদের সাথেই আপনারা হাটতে পারছেন না। কি করে শেয়ারবাজার বিকশিত করবেন। তাহলে মিছিল তো আপনাদের বিরুদ্ধে হওয়ার কথা। যে শেয়ারবাজারের বেহাল হচ্ছে আপনাদের ব্যর্থতার কারনে। হাজার হাজার মানুষের সামনে এই কথা বলতে পারলে খুব ভালো লাগতো। সাধারন বিনিয়োগকারীদের সামনে বলতে পারলে খুব ভালো লাগতো। একটি আয়োজন করেন সেভাবে। আমরা কয়েকজন মানুষ সেখানে সাহসের সঙ্গে কথা বলি। নেতৃত্ব দিতে হলেতো সাহস লাগে।

সবশেষে নিজামী বলেন, অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য প্রাইমারি মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। অর্থনীতিকে বেগবান করার জন্য বড় বড় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার দায়িত্ব নিতে হবে। তবে এই দায়দায়িত্ব যেনো মিছিলকারী বিনিয়োগকারীদের উপর না যায়। এই দায়িত্ব নিতে হবে ইস্যু ম্যানেজারদেরকে। সেকেন্ডারি মার্কেট হচ্ছে বাহির হওয়ার রাস্তা। কিন্তু প্রাইমারি মার্কেটের মুখ বন্ধ রেখে, সেকেন্ডারি মার্কেট দিয়ে শেয়ারবাজারের উন্নতি চাচ্ছি। আর সূচকের দিকে তাকিয়ে আছি। এই হল আমাদের অবস্থা। আশা করি আপনার আমার আজকের বক্তেব্যর পরে অনেক সচেতন ও দায়িত্ববান হবেন।

বিজনেস আওয়ার/৩১ জুলাই, ২০১৯/আরএ

উপরে