sristymultimedia.com

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬


পুরোনো মহামারী নতুন রুপে

০২:০৯পিএম, ০১ আগস্ট ২০১৯

বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক কালজয়ী উপন্যাস গৃহদাহ। ঔপন্যাসিক তার গল্পের শেষটা করেছিলেন মহামারী প্লেগ দিয়ে। যেখানে প্রেমিক, দাম্ভিক, ও আত্ম-অহংকারী সুরেশের মৃত্যু হয় প্লেগ নামক এক ব্যাধিতে। শুধু তার-ই নই, বরং বৃহৎ একটা অঞ্চলে, এই ব্যাধি ভয়াবহ রুপ নিয়ে তার থাবায় সমস্ত অঞ্চল প্রাণহীন করে দেয়।

ঔপন্যাসিক তার যে চরিত্রকে প্রথমে এত উচ্চ ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, পরবর্তীতে তারই মৃত্যু একটা সামান্য ব্যাধিতে হতে পারে এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। কেমন জানি মনে হচ্ছিল, বিষয়টির মাঝে কোনো সংগতি নেই।

এখন আসি আসল কথায়, ডেঙ্গুও আমার কাছে প্রথমে ঠিক সামান্য একটা ব্যাধিই মনে হয়েছিল। প্রথম যখন শুনলাম বা জানতে পারলাম যে ডেঙ্গু মহামারী ধারণ করেছে, তখনই মনে হয়েছিল সেই বিখ্যাত ''গৃহদাহর'' কথা। এই প্রথম আমার ভুল ভাংগে, ইঁদুর বা মশার জন্য মানুষের মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়।

তবে বার্ট্রান্ড রাসেল যেমন অভিযোগ করেছিলেন মানুষের আয়ুকাল কচ্ছপের সাথে তুলনা করে, আমারো এ ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ আছে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে, যখন সামান্য ইঁদুর বা মশার জন্য জীবন চলে যায়, সেটা মানতে কষ্ট হলেও, স্বীকার না করে উপায় নেই। যে সমস্ত ভয়ংকর ব্যাধি, একসময় সর্বগ্রাসী ছিল, এবং পৃথিবী থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে, তার মধ্যে এই প্লেগ অন্যতম। শুধু আমাদের এই ভূখন্ডে নই, ইউরোপেও এই প্লেগ ছিল আতংকের নাম।

আমাদের মোট ভুখন্ডের প্রায় ৯৫ ভাগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত যা বর্তমানে ৬০ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বৃদ্ধির এই সংখ্যা এক দিনের ব্যবধানে ১০ টি বেড়ে গেছে। স্রোত যেমন কোন কিছুতে বাধা না পড়লে তার তীব্রতা আমরা খালি চোখে দেখতে পারিনা, ঠিক তেমনি ডেঙ্গুরো প্রকোপটা বুঝতে পারি একটু দেরি করে।

যখন সিলেটের সিভিল সার্জনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটলো তখনই এর প্রকোপ সম্পর্কে কিছুটা অবগত হতে পেরেছিলাম। তারপরের সব কিছুই যেনো, কোন হানাদার বাহিনী দ্বারা দেশকে প্রান হীন করার অপচেষ্টা। কোন দেশ বা বাহিনী দ্বারা যদি আমরা হামলার স্বীকার হতাম যেমন আতংক ছড়িয়ে পড়তো, এই আতংক তার চেয়ে কম নই।

ছোটবেলায় নিয়মিত জ্বর হত। জ্বরে ভুল বকতাম, এখনও মাঝে মাঝে জ্বরের তীব্রতা প্রকোপ হলে ভুল বকি। এর অন্যতম কারণ এক আমাদের স্নায়ুর অবস্থা স্বাভাবিক থাকে না এবং আতংকেও ভুল বকি। দেশ ও জাতির এমন বিশাল বিপদে, আমাদের রক্ষকরা, আমাদের চেয়েও বেশি আতংকিত।

তারা শপথ নিয়েছেন জীবন দিয়ে হলেও আমাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু নন্দলালের মত করে, সামান্য এই ডেঙ্গু প্রতিহত করতে গিয়ে যদি তিনাদের কিছু হয়, তাহলে অভাগা দেশকে কে রক্ষা করবে, কে দেখবে। ডেঙ্গুতে তো আর আমরা সবাই নিঃশেষ হয়ে যাবো না, যে ক'জন থাকবে তাদেরকে নিয়েতো দেশ চালাতে হবে। তাই আপনাদের দেশের ক্রান্তিলগ্নে দেশের বাহিরে থাকাটাই জরুরী।

ডেঙ্গু গুজব, ডেঙ্গু রোহিঙ্গাদের মত মূর্খ, অসচেতন, কোনো বাচবিচার না করেই অবৈধভাবে বেড়েই চলছে, এটা আবার আগে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি থেকে উড়ে ঢাকা উত্তর সিটিতে গেলেও এখন উন্নয়নের মহাসড়কে করে সারা দেশে তাদের ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের ব্রাঞ্চ গুলো আবার শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোতে বেড়ে উঠেছে যেমন সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদি জায়গাতে।

শুধু মাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও দুই মেয়রকেই আমরা দোষ দিই। তাদের কি দোষ, তারা তো আর মশার বংশবৃদ্ধির জন্য মশাদেরকে কোনো প্রকার উত্তেজক সরবরাহ করছে না। কিংবা তাদের জন্য তো আর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না। আমরাও বাঙালি জাতি ওই মশা আর রোহিঙ্গাদের মতই মূর্খ ও কৃতঘ্ন। আমাদের রক্ষা করা থেকে শুরু করে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা, খাওয়া, থাকার সব ব্যবস্থাই যারা করে তাদেরই আমরা সুনাম নষ্ট করি।

তবে এই ডেঙ্গু প্রতিহত করতে একটা অভিনব পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। শরৎ চন্দ্রের বিলাসী গল্পে তিনি আমাদের মত মূর্খ জাতির জন্য এ ব্যবস্থা বাতলিয়ে গেছেন। মৃত্যুঞ্জয়ের শরীরে অনেক কিছু করেও যখন কাজ হয়নি, তখন সকল ওঝা মিলে শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করে বিষকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যার্থ চেষ্টা করে। তাদের ধারণা ছিল এতে বোধহয় কাজ হবে যদিও শেষ পর্যন্ত এ পন্থায় মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুই ঘটে।

তবু্ও আমরা যদি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একবার জাতীয় ভাবে এমন একটা কর্মসূচি পালন করি তবে কাজ হলেও হতে পারে। কারণ এছাড়াতো আমাদের কাছে আপাতত অন্য কোনো উপায় নাই। ডেঙ্গুর ঔষধ আবিষ্কার হয়েছে শুধু মাত্র মঙ্গল গ্রহে। সেখান থেকে আসতে স্বাভাবিক সময় লাগে ৬ মাস। যদিও আমরা ডিজিটাল কায়দায় সেটা ৪ মাসে আনতে সক্ষম হবো। ততদিন চলুক আমাদের এই আয়োজন ও কর্মসুচি।

লেখক- আব্দুল্লাহ আল মামুন, শিক্ষার্থী- ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজনেস আওয়ার/০১ আগস্ট, ২০১৯/এ

উপরে