ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

ধরা ছোঁয়ার বাইরে ১৬ আসামি

২০১৯ আগস্ট ২১ ০৯:৫৮:০৯


বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : এখনও অধরা ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার ১৬ আসামি। পলাতক আসামিদের গ্রেফতার এবং বিদেশে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেয়া হলেও সে কার্যক্রম চলছে কচ্ছপগতিতে।

পলাতক আসামিদের গ্রেফতার বা বিদেশে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছেন না। তবে আশার বাণী শুনিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামিদের লোকেশন আমরা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জোর চেষ্টা চলছে।

এক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতাও রয়েছে। এসব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। শিগগিরই আমরা এর সুফল দেখতে পাব।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পলাতক আসামিদের প্রায় সবাই দেশের বাইরে আছেন। কয়েকজনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যও রয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন হারিছ চৌধুরী, মোহাম্মদ হানিফ, মাওলানা তাজউদ্দিন মিয়া ও রাতুল আহমেদ বাবুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের নোটিশ রয়েছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে।

তদন্তে উঠে আসে, তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইন্ধনে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশসহ (হুজি) তিনটি জঙ্গি সংগঠন ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় ইতিহাসের ভয়াবহতম নৃশংস ও বর্বরোচিত ওই হামলার ঘটনা ঘটে।

এতে দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েকশ’ নেতাকর্মী। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এদিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের পৃথক দুটি মামলায় বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণা হলেও চূড়ান্ত বিচার এখনও শেষ হয়নি।

এ বছরের ১৩ জানুয়ারি দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

বর্তমানে এটি কার্য তালিকায় আসার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। দুই মামলার রায়সহ প্রায় ৩৭ হাজার ৩৮৫ পাতার নথি ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছে। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে এসব নথি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়।

ভয়াবহ সেই ঘটনার ১৪ বছর ১ মাস ২০ দিন পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর মামলা দুটির রায় ঘোষণা হয়। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে স্থাপিত আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। হত্যা মামলায় ১৪টি এবং বিস্ফোরক আইনের মামলায় ১২টি বিষয় বিবেচনা করা হয়।

রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমসহ ১৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামির মধ্যে দুজন এবং যাবজ্জীবন দণ্ডিত ১৯ জনের মধ্যে ১২ জন পলাতক। এছাড়া রায়ে আনসার ও ভিডিপির সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, সাবেক তিন আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরীসহ ১১ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডও দেয়া হয়।

রায়ে ৪৯ আসামির সবারই সাজা হয়। যদিও মামলার আসামি ছিল ৫২ জন। এর মধ্যে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামি ৪৯ জন।

রায় ঘোষণার সময় মোট ১৮ আসামি পলাতক থাকলেও রায় ঘোষণার পর গত ২৮ জানুয়ারি দুই পলাতক আসামি সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খান বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত ওইদিনই তাদের জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরোর (এনসিবি) এআইজি মহিউল ইসলাম বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৮ জন পলাতক ছিল। তাদের মধ্যে পুলিশের সাবেক দুই কর্মকর্তা খান সাঈদ হাসান ও ওবায়দুর রহমান খান অনেক আগেই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন।

পলাতক ১৬ জনের মধ্যে ১০ জনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড় করছে মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি। সেসব কাগজপত্র এনসিবিকে দিলে ইন্টারপোলে রেড নোটিশের জন্য জমা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বাকি ৬ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ করা ছিল। তারা হচ্ছেন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মোহাম্মদ হানিফ, মাওলানা তাজউদ্দিন মিয়া ও রাতুল আহমেদ বাবু। এদের মধ্যে ৪ জনের রেড নোটিশ বহাল আছে। তারেক রহমান ও কায়কোবাদের নাম আপাতত রেড নোটিশে নেই।

বিদেশি আইনজীবী দিয়ে তৎপরতা চালিয়ে এই দুজন তাদের নাম বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, সবার কাগজপত্র নিয়ে ইন্টারপোল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

পলাতকরা কোথায় অবস্থান করছেন এ প্রসঙ্গে মহিউল ইসলাম বলেন, আমরা ১৯৪টি দেশের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরো কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। সিআইডি-ও কিছু দেশের কথা বলেছিল। সেসব দেশকে আমরা আলাদাভাবে চিঠি দিয়েছি। এর মধ্যে কেউ সাড়া দিয়েছে, কেউ দেয়নি

পলাতকদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে। তারাই এগুলো করে থাকেন। আমরা শুধু তাদের বিভিন্ন ডকুমেন্টস সরবরাহ করে থাকি। পলাতকদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তৎপরতার কোনও ঘাটতি নেই।

বিজনেস আওয়ার/২১ আগস্ট, ২০১৯/এ

উপরে